আজ সারাবিশ্ব এক মহামারির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সবার অভিযোগ, যাদের এই প্রণোদনা পাওয়া উচিত, তাদের অধিকাংশই বঞ্চিত হয়েছে। করোনাকালে স্কুল যখন বন্ধ, তখন কীভাবে বেতন আদায় হবে এবং যেখানে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন, তা হলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা কি বাতাস খেয়ে জীবন ধারণ করবেন? এ ব্যাপারে সরকার একেবারেই নির্বিকার। কাজেই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। পাকিস্তানি শাসনামল থেকেই যে গণমুখী অর্থাৎ সর্বজনীন শিক্ষার দাবি উচ্চকিত ছিল, তা আজ নিষ্ঠুরভাবে, অমানবিকভাবে শৃঙ্খলিত, পদদলিত। তাই সমাজে বেড়েছে খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতিসহ সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার, যা অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বক্তব্যে সামাজিক সংকট এবং যার উৎপত্তি শিক্ষার সংকট থেকেই। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষা ও শিক্ষকদের যতদিন কাজে লাগানো না যাবে, ততদিন এ সমাজ গলিত লাশে পরিণত হবে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিলাসবহুল হোটেল, মোটেল, চোখ ধাঁধানো গাড়ি কোনো কিছুই পচন ঠেকাতে পারবে না। আজ কেউ কারও কাছে নিরাপদ না। স্বামী স্ত্রীর কাছে, স্ত্রী স্বামীর কাছে, কন্যা পিতার কাছে, মাতার কাছে, বান্ধবী বন্ধুর কাছে, বন্ধু বান্ধবীর কাছে- এখন বুঝুন সমস্যা কোন গভীরে অবস্থান করছে!

তবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতো বলা যায়, 'তবু আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। আর ইতিহাসের শিক্ষাও এই যে, সমাজশক্তির বিন্যাস ও সংঘাতে অপ্রত্যাশিত মুহূর্তেও অনেক সময়ে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়।' যা তিনি লিখেছিলেন 'বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য' প্রবন্ধে। হয়তো-বা তাই। তবে প্রয়োজন সেই লক্ষ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া- হাত-পা গুটিয়ে নয়, এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষক সমাজকেই। সমাজের অনগ্রসর অংশকে সঙ্গে নিয়ে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে।

সবাই বলে 'গুণগতমানের শিক্ষা চাই'। আর তাই তো প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন। এই গুণগত পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুই জড়িত। প্রয়োজন প্রথমেই শিক্ষায় বিনিয়োগ। শিক্ষার ব্যয় হয় না, হয় বিনিয়োগ। এর ফল সুদূরপ্রসারী। শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে সমাজব্যবস্থার আয়না। তাই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সমাজের সার্বিক উন্নয়নই জড়িত। এমনকি ঢাকা শহরের রাস্তার যানজটও। রাস্তার যানজট হবে না, যদি এলাকায় শিশু-কিশোরদের উন্নতমানের স্কুল থাকে এবং শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চবিত্তের সন্তানরা প্রত্যেকে হেঁটে স্কুলে আসতে পারে। কোনো যানবাহন যেন প্রয়োজন না পড়ে। সকালের নির্মল বায়ু সেবনে শিক্ষার্থীদের দেহমন যেমন সতেজ থাকবে, তেমনি অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাধির হাত থেকেও তারা মুক্ত থাকবে। এলাকার শিক্ষার্থীরা এলাকায় পড়াশোনা করবে। বাবা-মাকে লোন করে গাড়ি কেনার চিন্তা করতে হবে না। আর সে কারণেই স্কুলে ভালো লেখাপড়া বা শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন মেধাবী, সৃজনশীল ও যোগ্যতাসম্পন্ন একদল শিক্ষক এবং সে কথা প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্রই সত্য।

বিশ্বব্যাপী শিক্ষাদানকে সৃজনশীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে, ভবিষ্যতের শিক্ষিত জনসম্পদের গুণাগুণ নির্ভর করে শিক্ষক সমাজের ওপরই। তাই শিক্ষার সব স্তর অর্থাৎ প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবচেয়ে মেধাবী, সৃজনশীল ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই শিক্ষকতায় নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন বলে শিক্ষাবিদরা মনে করেন এবং তারা এও মনে করেন, শিক্ষকতাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে উপযুক্ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টা সফল হতে পারে না।

উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক পর্যায়ে যারা শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত, তারা সমাজে কোনোভাবেই অবহেলিত নন। কিন্তু আমাদের দেশ আজও তাদের সেই সম্মান দিতে পারেনি। তাই প্রধান শিক্ষকের ১১তম স্কেলে মূল বেতন ১৩,১৩০ টাকা, বাসা ভাড়া ৪৫% ও ৪০% শহর ও গ্রামভেদে, চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ টাকা ও টিফিন ২০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ১৩তম স্কেলে ১১,৫৫০ টাকা, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও টিফিন একই। যদিও এই বেতন ও স্কেল বর্তমান সরকার আগের তুলনার বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এই স্কেলে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের রাখলে বর্তমানের ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেটের দেশে শিক্ষকদের মর্যাদা সম্মানজনক হয় না। তবে সরকারি ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে যেসব প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুল আছে শহরে-গ্রামে-গঞ্জে, সেসব শিক্ষকদের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। গণমুখী এবং সর্বজনীন শিক্ষার দাবি ছিল পাকিস্তানি শাসনামলেই। বঙ্গবন্ধু সেই ঘোষণাই দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে দেশ পরিচালনা করছে। তাই এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে তাদের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে এবং শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। মর্যাদা দিতে হবে। ইউনেস্কো প্রদত্ত শিক্ষকদের মর্যাদাবিষয়ক সুপারিশমালা তাদের ১৯৬৬ সালে প্যারিস বৈঠকে নির্ধারিত হয়ে পরে আরও সংশোধিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী তা স্বীকৃত এবং বাংলাদেশ তার স্বাক্ষরদাতা। এখানে উল্লেখ করা হলো প্রাথমিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদাদানের সামান্য একটু চিত্র।

আবার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ১৩টি নির্দেশনা মেনে যারা নিজেদের উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন ও ছয় বছর বেতন না চাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছেন এবং ছয় বছর পরে ২০১১ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে প্রতিবছর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এসে তাদের দাবি জানাচ্ছেন; ২০১৮ সালে প্রেস ক্লাবে মাসাধিককাল অবস্থান ধর্মঘট এবং আমরণ অনশন করেছেন আর প্রতিবছরই তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্লাসে পাঠানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার প্রতিবারই তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এর মধ্য দিয়ে কি সরকারের শিক্ষাবান্ধব নীতির প্রতিফলন ঘটছে? ইউনেস্কোর সুপারিশালার প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে?

আবার এমপিওপ্রাপ্তদেরও আছে নানা বঞ্চনার কাহিনি। সবুজ হাসান নামে একজন শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন, 'প্রতি মাসের বেতন বিলের সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অঙ্গীকারনামা দিতে হয়। এটি না দিলে ব্যাংক বিল জমা রাখে না।' একসময় সরকার বেসরকারি শিক্ষকদের ১০০ টাকা বাসা ভাড়া দিয়ে লিখে নিত- 'আমি আর অন্য কোথা থেকে বাসা ভাড়া নিই না।'

এখন তাদের বাসা ভাড়া এক হাজার টাকা, ঈদ বোনাস দুই ঈদেও অর্ধেক, এ ছাড়া আছে নানা ভোগান্তি। শিক্ষক যদি মনোকষ্টে থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন কীভাবে? তারা যখন নিজেরাই নিগ্রহের শিকার হবেন, তখন কীভাবেই-বা শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন? কাজেই শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি করতে চাইলে শিক্ষার সব স্তরের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই বাছাই করে নিতে হবে সর্বোচ্চ বেতন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়ে এবং তাদের সেই মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। কেননা শিক্ষার মান নির্ভরশীল শিক্ষকদের মানের ওপর। শিক্ষকদের কাছে জাতি যদি উন্নতমানের শিক্ষাদান প্রক্রিয়া আশা করে, তাহলে তা শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর হবে না। প্রয়োজন আরও অনেক কিছু। যেমন জাতির প্রতি শিক্ষক সমাজের কর্তব্য সম্পর্কে ধারণা, গঠনমূলক সহায়তার ইচ্ছা, প্রকৃতি-পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান, শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে পারার ক্ষমতা, শুধু বিদেশি নয়, বরং দেশীয় সহজলভ্য সরঞ্জাম দিয়ে শিক্ষাদানকে সহজ করার চিন্তাভাবনা থাকা ইত্যাদি। শিক্ষকদের এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্যই তাদের সেই যোগ্যতম স্থান দিতে হবে। শুধু দেশের তো নয়, বিশ্বের সব পেশার জ্ঞানীগুণী, উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সমাজসেবক, সমাজবিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিজ্ঞানী, কৃষিবিজ্ঞানী, কারিগর তৈরি হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই; শিক্ষকদের সততা, আদর্শবাদিতা ও মহৎ কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়েই।

প্রাক্তন অধ্যাপক, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা

বিষয় : সমকালীন প্রসঙ্গ এ. এন. রাশেদা

মন্তব্য করুন