মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদারের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৮ সালের ১৬ জুলাই এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জামালপুরের এই কীর্তিমান পুরুষ তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার আওনা ইউনিয়নের তালুকদার পরিবারে ১৯৩৪ সালের ১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার যমুনা নদীর কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা দৌলতপুর গ্রামের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা মতিয়ার রহমান সেই গ্রামেই ঘুমিয়ে আছেন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ আন্দোলনে মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র মতিয়র রহমান প্রভাবিত হয়েছিলেন। বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর উত্তাল রূপ, গ্রামের চিরায়ত সবুজের উদারতা আর প্রকৃতির বৈরী পরিবেশ থেকে সাহস আর শক্তি নিয়ে মতিয়র রহমান কলেজ জীবনে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের নানা বাঁক প্রত্যক্ষ করেছেন। কলেজ জীবনে মেধাবী ছাত্র মতিয়র রহমান ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভের সৃষ্টি হতে থাকে। সামরিক শাসনের সেই উত্তাল সময়ে মতিয়র রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ওই বছরই কৃতিত্বের সঙ্গে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিত্তবৈভবের মধ্যে বেড়ে ওঠা মতিয়র রহমান তালুকদার জামালপুরের দরিদ্র, অসহায় মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ার ইচ্ছা নিয়ে আইনজীবীকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মেধাবী আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা পেশ করার পর বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক সরকার আইয়ুব খানের নানা ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রহসনের বিচার শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ফুঁসে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালে দেশব্যাপী গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে জামালপুরের সাধারণ মানুষও সে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার আইন পেশা স্থগিত রেখে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং 'সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদে'র আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি জামালপুরে সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর তিনি জামালপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর (কামালপুর) মহেন্দ্রগঞ্জে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বিচারকের (ম্যাজিস্ট্রেসি) দায়িত্ব পালন করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ পুনর্গঠনে তিনি জামালপুরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলে অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিক্ষোভে যোগ দেন। দেশব্যাপী রাজনৈতিক দমন-পীড়ন শুরু হলে তাকেও কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তার ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সরে যেতে নানাভাবে চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অজেয় শক্তি ধারণ করেছিলেন বলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। দুর্বার সাহস আর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীক্ষা নিয়ে এগিয়ে গেছেন অবিচল।

সেই দুঃসময়ে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একাদশ সম্মেলনে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন দলের আহ্বায়ক হয়ে দলকে গোছানোর দায়িত্ব নিলে জামালপুর জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন পর পর তিনবার।

অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সততা আর অটল নীতির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আদর্শ বহন করে গেছেন আজীবন। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বর্ণাঢ্য জীবনে জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন ছয়বার এবং জাতীয় আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জামালপুর ল' কলেজ প্রতিষ্ঠা করে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। দুস্থ-অসহায় মানুষের সেবা দিতে জামালপুর অন্ধ কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জামালপুর জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন।

জনবান্ধব মানবতাবাদী এই মানুষটি সারাজীবন জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তার স্বপ্ন সফল হয়েছে। ২০১২ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা রেল সংযোগ (তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু) এবং অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার রেলস্টেশন উদ্বোধন করে এলাকার মানুষের আশা পূরণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০২০ সালের জানুয়ারির ২৬ তারিখে জামালপুরের জনগণের জন্য 'জামালপুর এক্সপ্রেস' নামে একটি অত্যাধুনিক আন্তঃনগর ট্রেন চালু করেছেন, যা এই সংযোগ লাইনে ঢাকা থেকে জামালপুর চলাচল করছে।

সমাজসেবক, কর্মবীর ও রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদারের প্রয়াণ দিবসে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

চেয়ারম্যান, সমাজকর্ম বিভাগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদালয়, জামালপুর; আহ্বায়ক, অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার স্মৃতি পরিষদ

মন্তব্য করুন