রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যারা পূর্ব বাংলার সাধারাণ মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও দেবব্রত বিশ্বাসের নাম উল্লেখযোগ্য। কিশোরগঞ্জের মানুষ দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন রবীন্দ্রসংগীত গায়ক ও শিক্ষক। শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন শুদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত প্রচারের 'ভ্যানগার্ড'। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ১৯৩৪ সালে তিনি প্রথম রবীন্দ্রনাথের 'মম মন উপবনে' গানের স্বরলিপি তৈরি করেন।

৪ শ্রাবণ ১৩০৭ বঙ্গাব্দ অনুযায়ী ১৯ জুলাই ১৯০০ (পশ্চিম বাংলায় ২০ জুলাই) খ্রিষ্টাব্দে শৈলজারঞ্জন মজুমদার ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোনা মহকুমার মোহনগঞ্জ থানার বাহাম গ্রামে একটি কুলীন বর্ধিষ্ণু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নেত্রকোনা থেকে মেট্রিক পাসের পর তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন বাবা রমণী কিশোর দত্ত মজুমদার। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন, ১৯২৪-২৫ সালের দিকে। ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত; ১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতনে রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে কবিগুরুর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান। কবিগুরুর সান্নিধ্যে থেকে অনেক গান, নৃত্যনাট্য প্রভৃতির স্বরলিপি তৈরি করেন।  

রমণী কিশোর ছিলেন নেত্রকোনা মহকুমার ডাকসাইটে আইনজীবী। বাবা চাইতেন ছেলেও তার মতো আইন ব্যবসায় আসুক। সে কারণে শৈলজারঞ্জন মজুমদার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে নেত্রকোনা মহকুমা আইনজীবী সমিতিতে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবন দেবতা। কিছুদিন পর আইন পেশা ছেড়ে শান্তিনিকেতনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশাতেই শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে শান্তিনিকেতনের সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেন। শুরু হয় ভিন্ন এক পরিভ্রমণ।

শৈলজারঞ্জন মজুমদার কলকাতার বাইরে নেত্রকোনাতে ১৯৩২ সালে প্রথম কবিগুরুর জন্মদিন উদযাপন করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে এক পত্রে লিখেছিলেন- "কল্যাণীয়েষু, তোমাদের নেত্রকোনায় আমার জন্মদিনের উৎসব যেমন পরিপূর্ণ মাত্রায় সম্পন্ন হয়েছে, এমন আর কোথাও হয়নি। পুরীতে একবার আমাকে প্রত্যক্ষ সভায় নিয়ে সম্মান করা হয়েছিল। কিন্তু নেত্রকোনায় আমার সৃষ্টির মধ্যে অপ্রত্যক্ষ আমাকে রূপ দিয়ে আমার স্মৃতির যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, কবির পক্ষে সেই অভিনন্দন আরও অনেক বেশি সত্য। তুমি না থাকলে এই উপকরণ সংগ্রহ করত কে? এই উপলক্ষে বৎসরে বৎসরে তুমি আমার গানের অর্ঘ্য পৌঁছিয়ে দিচ্ছ তোমাদের পল্লীমন্দিরে। ভোগমণ্ডপে- এও কম কাজ হচ্ছে না ...।"

শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে আমাদের মাটিতে আমরা ধরে রাখতে পারিনি এ অঞ্চলের বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি শৈলজারঞ্জন মজুমদার কখনও তার জন্মভিটায় আসেননি। যদিও-বা তার মাতাপিতা এ দেশেই মৃত্যুবরণ করেন এবং এ দেশেই তাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। শৈলজারঞ্জনের বাহামের বাড়ি খাসজমিতে পরিণত হয়েছে দেশ বিভাগের বেশ আগে। সেখানে আসাম থেকে আসা কিছু উদ্বাস্তু পরিবার বাস করত। তবে তার স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা আমরা করে চলেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও চেয়েছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে দেশে ফিরিয়ে আনতে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় শৈলজারঞ্জন মজুমদার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন বঙ্গবন্ধু তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। বঙ্গবন্ধু শৈলজারঞ্জনকে উদ্দেশ করে বলেন, 'আপনারে আর ছাড়ুমই না।' শৈলজারঞ্জন মজুমদার তখন বলেন, 'আমার গ্রামের বাড়ি উদ্বাস্তুদের দখলে, শহরের বাড়িতে মসজিদ হয়েছে, থাকার জায়গা কোথায়?' উত্তরে বঙ্গবন্ধু জোর দিয়ে বলেন, 'ছাইড়্যা দেন। আমি আপনেরে বাড়ি দিমু, গাড়ি দিমু, ডোমিসিল দিমু। আপনার জায়গার অভাব হবে না।' জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এই আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন শৈলজারঞ্জন। তাই তিনি তার জীবনী সংক্রান্ত বই 'যাত্রাপথের আনন্দগান'-এ বঙ্গবন্ধুুর উদ্ধৃতিগুলো উল্লেখ করে নিজের অভিব্যক্তি এভাবে প্রকাশ করেছেন, 'সে আমিও আমার অন্তরের অন্তস্তলে উপলব্ধি করেছি।' 

শৈলজারঞ্জন মজুমদার (১৯০০-১৯৯২)


শৈলজারঞ্জন মজুমদার দ্বিতীয়বার এসেছিলেন ১৯৭৫ সালে। তখন তিনি আমার বাবার আতিথ্যে আমাদের মোহনগঞ্জের বাসা 'ছায়ানীড়ে' দুই-তিন রাত অবস্থান করেছিলেন। শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মতো মানুষের সঙ্গে আমাদের একটি পারিবারিক সম্পর্ক ছিল বা আছে এটি ভাবতে আমার খুবই আনন্দবোধ হয়, গর্ব হয়।

১৯৯২ সালের ২৪ মে ভোরে শৈলজারঞ্জন মজুমদার কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নেত্রকোনায় খবরটি পৌঁছাতে দুই-এক দিন সময় লাগে। তখনকার নেত্রকোনা পাবলিক হলে এক নাগরিক শোকসভার হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত মোহনগঞ্জের গুণী শিল্পী ও আমার বাল্যবন্ধু দুলাল চন্দ্র ধরের কাছে শুনেছি সেই শোকসভায় শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। আর শোকসভাটিতে সভাপতিত্ব করেছিলেন আমার বাবা ডা. আখ্‌লাকুল হোসাইন আহমেদ।

১৯৯১ সালের জুলাই মাসে পালিত হয়েছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের শেষ জন্মদিন। এর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় তার জীবনী নিয়ে লেখা সঞ্জয় সরকারের গ্রন্থে- ১৯৯১ সাল। শৈলজারঞ্জনের বয়স ৯১। তিনি প্রায় শয্যাশায়ী। ভক্তরা এবার পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর উপস্থিতিতে তার জন্মদিন উদযাপনের উদ্যোগ নিলেন। ভক্তদের আগ্রহে সানন্দে রাজি হলেন জ্যোতি বসু। অতিথিকে গেয়ে শোনানোর জন্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার নিজেই কয়েকটি গান বাছাই করে দিলেন। বাংলাদেশ থেকে চার-পাঁচজন কিশোর-কিশোরী রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার্থীকে নিয়ে হাজির হলেন ওয়াহিদুল হক। তৎকালীন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে সঙ্গে করে হাজির হলেন জ্যোতি বসু। এসেই শৈলজারঞ্জন মজুমদারের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। এরপর তার শয্যাপাশে বসে গান শুনলেন। চারটি গান দিয়ে ছোট্ট অনুষ্ঠান শেষ হলো। গানগুলো ছিল : 'কবে আমি বাহির হলেম', 'সুরের গুরু', 'তুমি খুশি থাক' ও 'কি পাইনি তারি হিসাব মিলাতে মন মোর নাহি রাজি।' অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু শৈলজারঞ্জনের দু'হাত ধরে বললেন, 'আপনার মতো খাঁটি মানুষের বেশ প্রয়োজন। আপনি অনেক অনেক দিন থাকুন।'

আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তুদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে অবশেষে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের বাড়িটি আমাদের চেষ্টায় সরকার উদ্ধার করেছে। বাড়িটিতে আমার ছোট ভাই সাজ্জাদুল হাসানসহ (সাবেক সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) সবার উদ্যোগে শৈলজারঞ্জন সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতি কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। প্রকল্পটি এ বছর জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে একটু প্রলম্বিত হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এ বছরেরই ডিসেম্বরে সংস্কৃতি কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হবে।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় গিয়েছিলাম স্ত্রীর চিকিৎসাজনিত কারণে। করোনাকালে বিদেশ ভ্রমণ বিড়ম্বনা ছাড়া কিছুই নয়। করোনার টেস্ট করে বিমান ভ্রমণ, ফেরার পথেও একই অবস্থা। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিদের জন্য নির্মিত গেস্টহাউস 'বিজন ভবন' সল্ট লেকের ৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পূর্বানুমোদনক্রমে বাংলাদেশের বিচারপতিরাও তাদের ভ্রমণকালে সেখানে থাকার সুযোগ পান। নজরুল তীর্থ এবং রবীন্দ্র তীর্থ- দুই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই গেস্টহাউসের বেশ কাছে। ইতোপূর্বে নজরুল তীর্থে গেলেও রবীন্দ্র তীর্থে কখনও যাওয়া হয়নি। স্ত্রীর চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্ট পেতে আরও এক দিন অপেক্ষা করতে হবে। তাই হাতে ছিল অফুরন্ত অবসর।

এই অবসরেই একদিন আমরা দু'জনেই গেলাম রবীন্দ্র তীর্থে। গাড়ি পার্ক করে তাদের প্রধান কার্যালয়ের দিকে যেতে যেতে বুঝতেই পারছিলাম না এখানে কোনো লোকজন আছে কিনা? অগত্যা একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে অফিস কক্ষের দিকে যাই। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে যে ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়, তার নাম অনুপ কুমার মতিলাল। ভারত সরকারের সাবেক সচিব, বর্তমানে রবীন্দ্র এবং নজরুল উভয় তীর্থের প্রধান কর্তাব্যক্তি। অত্যন্ত বিনয়ী ভদ্রলোক; আমার পরিচয় পেয়ে তিনি চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন- 'স্যার আপনি ঢাকা থেকে এসে আজ রবীন্দ্র তীর্থ দেখতে এসেছেন, বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের। কলকাতার মানুষদের আজকাল খুব একটা সময় নেই এখানে আসার। অনুষ্ঠান যখন থাকে তারা শুধু তখনই এখানে আসেন।'

অনুপ কুমার ঘুরে ঘুরে সমস্ত তীর্থস্থানটি দেখান। মিউজিয়ামসহ অন্যান্য অংশ আমাদের দেখান। কিছু স্যুভেনির আমাদের শুভেচ্ছা উপহার দেন। কথায় কথায় যখন শৈলজারঞ্জন মজুমদারের প্রসঙ্গটি আমি তুললাম, তখন লক্ষ্য করি তিনি অধীর আগ্রহে জানতে চান শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় কীভাবে হয়েছিল ইত্যাদি। উত্তরে বলেছিলাম- তার সঙ্গে আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের পরিচয়। বলেছিলাম এই মহান মানুষটির জন্মস্থান ও আমার জন্মস্থান একই জায়গায়, আমরা উভয়েই একই মাটির সন্তান। আমার মোবাইলে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সঙ্গে আমার ও আমার পরিবারের ছবি দেখে তিনি আপ্লুত হয়ে ওঠেন এবং আমাকে ছবিগুলো তাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি জানান তার স্ত্রী এবং তার পরিবারের অনেকেই শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সরাসরি ছাত্র। শৈলজারঞ্জন মজুমদারের নিয়ে অনুপ কুমারের আগ্রহ ও শ্রদ্ধামাখা উচ্ছ্বাস দেখে আমি নিজেও অভিভূত হয়ে পড়ি।

অনুপ কুমার মতিলাল আমাকে বলেছিলেন- 'শৈলজারঞ্জন মজুমদার সংস্কৃতি কেন্দ্র'টির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে তিনি এবং ওপার বাংলার রবীন্দ্রপ্রেমীদের অনেকেই এটি দেখতে আসবেন। বাংলাদেশের রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর, দক্ষিণডিহি, কুষ্টিয়ার ট্যাগোর লজ যেমন রবীন্দ্রপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয়, তেমনি রবির কিরণে সিক্ত ও তার আলোয় আলোকিত শৈলজারঞ্জন মজুমদারের প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি কেন্দ্রটিও একদিন উভয় বাংলার রবীন্দ্রপ্রেমীদের কাছে একটি দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠবে।

বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ, ঢাকা

মন্তব্য করুন