হাওর দেখার শখ সব সময়ই ছিল। বিয়ে হলো হাওর এলাকার মানুষের সঙ্গে; কিন্তু হাওর দেখা হয়নি। অবশেষে ২০০৯ সালে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে প্রথমবার হাওরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। জুন, জুলাই, আগস্ট মাস হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। সেপ্টেম্বর মাস থেকে পানি কমতে থাকে। হাওরের দৃশ্য আসলেই অপরূপ। চারদিকে সমুদ্রের মতো পানি। এপার-ওপার দেখা যায় না, শুধু থই থই পানি চারদিকে। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজারের কিয়দংশ নিয়েই প্রধানত আমাদের ভাটি বাংলা। এখানে অবারিত মাঠ ভরে ফসল উৎপাদিত হয় শুকনো মৌসুমে, আবার বর্ষাকালে এই অবারিত ধু-ধু মাঠ পানিতে টইটম্বুর হয়ে সাগরের আকার ধারণ করে। এর বাইরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাওর ও বিল দেখা যায়। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলেও কিছু বৃহৎ জলাশয় আছে। সেগুলোকেও হাওর বা বাঁওড় বলা হয়। মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর অঞ্চলেও বাঁওড় দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের দেশে হাওর-বাঁওড় শব্দ দুটি একসঙ্গে উচ্চারণ করা হয়। বাঁওড় শব্দটির একটি অর্থ বাংলা পুরোনো অভিধানে পাওয়া যায়। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে- 'নদীর বাঁক যেখানে স্রোতবদ্ধ হয়, সে জায়গাটিকেই বাঁওড় বলে।' কথিত আছে বাঁওড়ের আকার যখন অতি বিস্তৃত হয়, তখনই এই বাঁওড় হাওরে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের উত্তরে গারো পাহাড়। সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে হিমালয় বেশ কাছেই। ওখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। এই অতি উঁচু হিমালয় থেকে যখন বরফ গলা শুরু হয় এবং ভারতের মেঘালয় ও আসামে ভারি বর্ষণ হয়, তখন এই বর্ষণজনিত ঢলের পানি ও হিমালয়ের বরফ গলা পানি নেমে এসে বাংলাদেশের নদনদীগুলোতে প্রবেশ করে। নদীর বাঁক যেখানে স্রোতবদ্ধ হয়ে গেছে, সেখানে যখন পানি এসে জমা হতে থাকে, তখনই আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠ জলমগ্ন হয়ে থই থই করতে থাকে। এই বিশাল জলরাশি যখন আবদ্ধ থাকে বা দীর্ঘদিন জমে থাকে, তার চেহারা তখন (বর্ষাকালে) সাগরের রূপ নেয়। এই সাগররূপ জলরাশিই হাওর। বাংলাদেশের অগণিত হাওরের মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকির হাওর, দেখার হাওর, শনির হাওর, ডিঙ্গাপোতার হাওর প্র্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। উত্তরবঙ্গের চলনবিলও হাওর পর্যায়েরই জলাশয়। এগুলো আকারের দিক থেকে বিশাল আকৃতির। টাঙ্গুয়ার হাওর এখন পাখি এবং মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওর শুনেছি অপরূপ। অবশ্য আমার সেখানে কখনও যাওয়া হয়নি। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওরের অবস্থান। একবার কুলাউড়ায় চা বাগানে বেড়াতে গিয়ে হাকালুকি হাওর দেখে আসার সুযোগ হয়েছিল। শুনেছি চাঁদনি রাতে হাওরের রূপ খুব সুন্দর। তবে সেটা অবলোকন করার সুযোগ আমার কখনও হয়নি। একবার সপরিবারে জোছনা রাতে টাঙ্গুয়ার হাওর পরিদর্শন করার ইচ্ছা আছে। এ তো গেল হাওরের সুন্দর রূপের কথা, এর এক ভয়াল রূপও আছে। যা আমি নিজে একবার প্রত্যক্ষ করেছি। 

একবারের এক অভিজ্ঞতার কথা বলি। খালিয়াজুরী যাচ্ছিলাম। প্রবল বৃষ্টিতে স্পিডবোটটি চালাতে চালকের খুব কষ্ট হচ্ছিল। সে বার বার বলছিল- স্পিডবোট চালাতে তার কষ্ট হচ্ছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। আকাশ কালো মেঘে আচ্ছন্ন। বৃষ্টির দাপট ক্রমেই বাড়ছে। দমকা হাওয়ার দাপটে মনে হচ্ছিল বোটটি উল্টে যাবে। অনেক চেষ্টার পর মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর বাজারের ঘাটে এসে চালক স্পিডবোটটি থামাতে সক্ষম হন। ইতোমধ্যে ঝড়-বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে থাকে, প্রচণ্ড ঝড়। মোহনগঞ্জের ইউএনও এবং আমাদের সঙ্গে থাকা লোকজন গাগলাজুরে লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকে। তার পরও গাগলাজুর বাজারের অনেক মানুষ এগিয়ে আসেন আমাদের সাহায্যের জন্য। সম্ভবত তারা জানতে পেরেছেন এই স্পিডবোটে আমার স্বামী বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আমরা অনেকেই আছি। যারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই আমাদের তাদের বাড়িতে থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন। আমার সঙ্গে যে ননাস ছিলেন তার বড় বোনের শ্বশুরবাড়িও গাগলাজুর গ্রামে। খবর পেয়ে তারাও তাদের বাড়িতে আমাদের রাখার জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি কোনোদিন এ ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হইনি। আমার স্বামীর হয়তো কিছু ধারণা ছিল। ছেলেকে মনে হলো লেশহীন, সম্ভবত ভাটি এলাকার সন্তান বলে তার ভেতরে সহজাত ভাবেই সাহস জন্মেছে। কারণ সেও কখনও আগে এরকম পরিস্থিতির কবলে পড়েনি। আমার স্বামী ইউএনওকে বললেন, হাওর দিয়ে না গিয়ে নদীপথে মোহনগঞ্জ যাওয়া যায় কিনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাগলাজুরের স্থানীয় লোকজন একটি বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকার ব্যবস্থা করে দেন। সেই নৌকাটি সামনে থেকে একটি প্লাস্টিকের মোটা দড়ি দিয়ে এই বোটটি বেঁধে টেনে নিয়ে যান। সবাই স্বস্তিবোধ করছিলাম। আমরা যখন হাওর এলাকাটিতে ছিলাম, তখন বাতাসের ঝাপটা, ঝড়ের তাণ্ডব ও সমুদ্রের গর্জনের মতো ঢেউয়ের যে আওয়াজ অনুভব করছিলাম, নদীতে ঢোকার পর সেই তাণ্ডব আর তেমন অনুভব করিনি। লোকজন বলছিল নদী যেহেতু দু'দিকে পাড় দ্বারা বেষ্টিত এবং দুই পাড়েই কাছাকাছি গ্রাম ও গাছপালা আছে, তাই বাতাসের দাপট ছোট নদীতে এতটা অনুভব হয় না। আমরা ধর্মপাশার দিকে এগোতে থাকি। প্রায় চার ঘণ্টা নদীপথে স্পিডবোটটি টেনে নেওয়ার পর রাত প্রায় ১২টায় ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) উপজেলার মোহদীপুর ঘাটে এসে থামে। সেখানে অবস্থানরত আমাদের গাড়িতে করে রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোহনগঞ্জে নিজ বাসায় পৌঁছি। মোহদীপুর ঘাটে ধর্মপাশা এবং মোহনগঞ্জ উভয় থানার পুলিশ কর্মকর্তাসহ অনেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সবার চেষ্টায় বিশেষ করে নৌকার মাঝিদের অপরিসীম সাহসের কারণে সেদিন আমরা রাতে বাসায় পৌঁছাতে পেরেছিলাম। নইলে হয়তো ওই রাতে স্পিডবোটে অথবা গাগলাজুরে কারও বাড়িতে আমাদের থাকতে হতো। আমরা পরে জানতে পারি ওইদিন আবহাওয়া অফিস থেকে ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত ঘোষণা করা হয়েছিল যা আমরা জানতাম না। 

আমি খুব অভিভূত হয়েছিলাম ভাটি অঞ্চল তথা হাওর অঞ্চলের মানুষের সাহস ও তাদের আন্তরিকতা দেখে। এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে অগণিত মানুষ গাগলাজুর বাজারের পন্টুনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদের সাহায্য করার জন্য। তারা তাদের চেষ্টায় একটা নৌকা জোগাড় করে আমাদের মোহনগঞ্জে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এসব মানুষের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আমার স্বামী নৌকার মাঝিদের বকশিশ দিতে চাইলেও তারা কোনোভাবেই তা গ্রহণ করেননি। পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে নৌকা চালিয়ে যারা আমাদের মোহনগঞ্জ পৌঁছাতে সাহায্য করেছিলেন, তারা আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাদের চা-নাশতা খাওয়ানোর পর তারা শুধু আমার স্বামীর সঙ্গে একটি ছবি তুলতে চাইলেন। এটুকুই তাদের চাওয়া। কী অকৃত্রিম ভালোবাসা তাদের। আমার শ্বশুর ও স্বামীর কাছে শুনেছি ভাটি অঞ্চলের মানুষ সাধারণত উদার প্রকৃতির ও পরোপকারী হয়। আজ নিজেই তা দেখলাম। ভাটি অঞ্চলের মানুষের আন্তরিকতা, মায়া ও মমত্ববোধ আমার স্মৃতিপটে চির জাগরূক হয়ে থাকবে।
  সদস্য (অর্থ), নির্বাহী বোর্ড, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ

মন্তব্য করুন