সাতান্ন বছর পর টোকিওতে অলিম্পিক গেমস ফিরে এসেছে। এটি আধুনিক অলিম্পিক গেমসের ৩২তম আসর। সারা পৃথিবীর খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদ প্রতিনিধিরা এখন ক্রীড়া চত্বরগুলোতে নিস্কাম শৌর্যে শারীরিক শক্তি-সামর্থ্যের সাক্ষ্য দিচ্ছেন। মানব জাতির প্রগতির জন্য অতিক্রম করার চেষ্টা করছেন অনতিক্রম্য বাধা। এবারের অলিম্পিক বাংলাদেশের জন্যও গৌরব বয়ে এনেছে একটি বিশেষ কারণে। এবারের আসরে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস পুরস্কৃত হয়েছেন।

১৯৬৪ সালে টোকিওতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮তম অলিম্পিক গেমস। এশিয়া মহাদেশে প্রথম। টোকিও গেমস চিহ্নিত হয়েছিল 'খুশির অলিম্পিক হিসেবে। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে জাপানি সংগীতশিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে গেয়েছিলেন এক বিদায় সংগীত, যার শুরুটা ছিল সায়োনারা সায়োনারা (বিদায় বিদায়)। মধ্য ষাটের দশকে এই সংগীত বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত ও হতমান হয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান যেভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে গেমস অনুষ্ঠান করতে সক্ষম হয়েছে; এটি সব সময় স্মরণীয় হয়ে আছে। এরপর এশিয়া মহাদেশে ১৯৮৮ সালে সিউলে এবং ২০০৮ সালে বেইজিংয়ে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হচ্ছে টোকিওতে। এশিয়া মহাদেশে এটি চতুর্থ আসর। এবারের আসরটি আধুনিক অলিম্পিকের ইতিহাসে পুরোপুরি ব্যতিক্রমধর্মী।

এই অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির কারণে এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এখন সেটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে করোনা মহামারির মধ্যেই; জৈব সুরক্ষা বলয় তৈরি করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন ধরনের নিয়ম-কানুন ও বিধিনিষেধের মধ্যে।

টোকিও অলিম্পিক সামনে রেখে স্বাগতিক জাপান ছাড়াও চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান গত আট-নয় বছর ধরে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়েছে। মহাদেশীয় পরিবেশ এবং আবহাওয়ায় বিভিন্ন খেলায় পারফরম্যান্স প্রদর্শনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহাদেশীয় দেশগুলোর জন্য এটি বাড়তি সুবিধা। ২০১২ সালে লন্ডন এবং ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এশিয়ার দেশগুলো পরিকল্পনামাফিক লক্ষ্যের পথে কীভাবে হাঁটার চেষ্টা করেছে। এই সময়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেউ তো আর জানত না- এমন এক অনিশ্চিত মহামারি পৃথিবীতে আসবে, যা মানুষের জীবন প্রবাহকে পুরোপুরি পাল্টে দেবে। মানুষ সংঘবদ্ধভাবে একে অন্যের কাছে আবার কবে আসতে পারবে, কেউ জানে না।

টোকিও অলিম্পিক গেমসের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন খোদ জাপানের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, এ গেমস কার স্বার্থে? কাদের স্বার্থে? এই গেমস তো মানুষের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে এক ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। মানুষের জন্যই তো অলিম্পিক। দর্শকহীন স্টেডিয়ামে এটি কোন গেমস? অলিম্পিক দর্শন কী বলে? আইওসি কি বড় অঙ্কের অর্থ নিশ্চিত করতেই গেমসের সপক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে? শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কি গেমস পরিচালনা করা সম্ভব? অলিম্পিক তো অনেক বড় আয়োজন। গেমস ভেন্যুগুলোতে ক্রীড়াবিদ ও গেমস অফিসিয়াল ছাড়া আর কেউ নেই। তারাও নিয়ম-কানুন মেনে গেমস পরিচালনা করছেন। বিজয়ীরা 'ভিক্টরি স্ট্যান্ড'-এ দাঁড়িয়ে নিজেরাই মেডেল গলায় পরছেন। এদিকে গেমস শুরু হওয়ার আগে এবং শুরু হওয়ার পর করোনা পরীক্ষায় যারা 'পজিটিভ', তারা আছেন আইসোলেশনে ও হাসপাতালে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুষ্ঠুভাবে গেমসের সমাপ্তি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। জাপান সাধ্যমতো চেষ্টা করছে।

জাপান সরকার এবং অলিম্পিক অর্গানাইজিং কমিটি ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে আর্থিকভাবে। যার প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে আগামী দিনগুলোতে। জাপান এখন চাচ্ছে গেমস অনুষ্ঠিত করে বিশ্বসমাজে দেশের সম্মান ও ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে। অলিম্পিক তো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। চমক দেওয়ার মতো মর্যাদাপূর্ণ স্থান আর কোথাও নেই।

গেমস যদি অনুষ্ঠিত না হতো তাহলে কি অলিম্পিক আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হতো- এ প্রশ্নও এবার উঠেছে। সন্দেহ নেই, অলিম্পিক আন্দোলনের মূল উপাদান ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড়রা। একটি গেমস অনুষ্ঠিত না হওয়া মানেই তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। তাদের স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার অপমৃত্যু। আর তাই অলিম্পিক অলিম্পিকই। সারা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি এখন জাপানে নিবদ্ধ। খণ্ডিত বিশ্ব নয়; পুরো বিশ্ব এখন জাপানে। ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড়রা তাদের নিজ নিজ দেশের মানুষের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং আশা পূরণের জন্য প্রতিদিন লড়ছেন। সাড়ে তিনশ কোটির বেশি মানুষ প্রতিদিন দেখছেন জীবনের উৎসব টিভিতে। অলিম্পিক চত্বরে ক্রীড়াবিদদের মধ্যে লক্ষণীয়, একদিকে নীতির মহিমা আর একদিকে গতির কাব্য। শক্তি শৈলী বীরপনা- সবকিছু মিলে।

নিজ মহাদেশে অনুষ্ঠিত গেমসে জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া ভালো করবে অন্য যে কোনো বারের তুলনায়। অর্জিত মেডেলের সংখ্যা বাড়বে, এটাই প্রত্যাশিত। ২০০৮ সালে বেইজিং গেমসে চীন মেডেল তালিকায় শীর্ষ ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে। এর পর ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে চীন ২ নম্বরে নেমে যায়। যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের অবস্থান ছিল যথাক্রমে পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্থানে। গত রিও অলিম্পিকে (২০১৬) চীন ছিল তিন নম্বরে। জাপান ছিল ষষ্ঠ স্থানে আর দক্ষিণ কোরিয়া অষ্টম স্থানে। বিগত কয়েকটি অলিম্পিকে এই তিনটি দেশ মেডেল তালিকায় ভালো অবস্থানে ছিল। এবার নিজ মহাদেশে এ তিনটি দেশ আরও ভালো করবে বলে মনে করছি। স্বাগতিক জাপান কি পারবে মেডেল তালিকায় এবার চীনকে টপকাতে? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৮ আগস্ট, আর মাত্র কয়েক দিন পর। অলিম্পিক তো দেশের জন্য ক্রীড়াবিদদের উদ্বুদ্ধ করে! অলিম্পিকের অনেক কিছুই আবার হৃদয়ের বিষয়।

আগেই বলেছি, টোকিও অলিম্পিক ২০২০ বাংলাদেশের জন্যও বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) ২৩ জুলাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অলিম্পিক লরেল পুরস্কারে সম্মানিত করেছে। এটা দেশের মানুষের জন্য আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। মার্চপাস্ট শুরু হওয়ার আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি ভিডিওর মাধ্যমে যুক্ত হন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার হাতে ছিল তখন অলিম্পিক লরেল ট্রফি। ভিডিও বার্তায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস টোকিও অলিম্পিকের জন্য শুভ কামনা জানান। খেলাধুলায় অবদানের জন্য প্রথম অলিম্পিক লরেল দেওয়া হয় ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিক গেমসে। প্রথমবার নিজের দেশে শিশুনিবাস, স্কুল ও অ্যাথলেটদের জন্য অনুশীলন কেন্দ্র খুলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রত্যক্ষভাবে অবদান রাখার জন্য সম্মানিত হন কেনিয়ার সাবেক অলিম্পিয়ান অ্যাথলেট কিপ কেইনো। দ্বিতীয়বারের মতো পেলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। টোকিও থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জেনেছি ইউনূসকে কেন লরেল দেওয়া হলো। সেটি এক বিবৃতিতে ব্যাখ্যা করেছে আইওসি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খেলাধুলার মাধ্যমে উন্নয়ন কাজ করার স্বীকৃতি এটি। তার প্রতিষ্ঠান ইউনূস স্পোর্টস হাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলাধুলার মাধ্যমে উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে থাকে।

নতুন স্বপ্ন নিয়ে চলমান টোকিও অলিম্পিকে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছেন ছয়জন অ্যাথলেট। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের পুরুষ বিভাগে অংশ নেবেন আব্দুল্লাহ হেল বাকি। নারী ও পুরুষের ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে অংশ নেবেন যথাক্রমে জুনায়না আহমেদ ও আরিফুল ইসলাম। আর্চারিতে নারী একক ও পুরুষ এককে খেলতে যাচ্ছেন যথাক্রমে দিয়া সিদ্দিকী ও রোমান সানা। পুরুষ বিভাগের ৪০০ মিটার দৌড়ে অংশ নেবেন মোহাম্মদ জহির রায়হান। এর মধ্যে শুধু আর্চার রোমান সানা যোগ্যতা অর্জন করে অংশ নিয়েছেন। অন্যরা ওয়াইল্ড কার্ডের অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। দুজন আর্চারের দিকে এবার পুরো দেশ তাকিয়ে আছে। ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলাদেশে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করছে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেটি ষোলো কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও অলিম্পিকে তেমন কিছুই করতে পারেনি।

- কলাম লেখক ও বিশ্নেষক

মন্তব্য করুন