স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের লিগ্যাসি ও বিদ্যমান বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগগুলো কী ছিল? শুধু জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার উদ্যোগ ও কার্যক্রমগুলোর দিকে তাকানো যাক। একেবারেই শূন্য থেকে তিনি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন শুরু করেন। এর মধ্যে অন্যতম ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের নানা উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, এর তিন বছর আগে ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিস্কারের ফলে শুরু হয় ডিজিটাল বিপ্লব। ডিজিটাল বিপ্লবের পথ ধরে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক জাগরণ শুরু হয়। ১৯৭২ সালে নাসা মহাকাশে আর্থ-রিসোর্স টেকনোলজি স্যাটেলাইট (ইআরটিএস) পাঠায়। বঙ্গবন্ধু তা গভীরভাবে অবলোকন করেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আর্থ-সামাজিক জরিপ ও তথ্য আদান-প্রদানে ইআরটিএস স্যাটেলাইট প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন, বেতবুনিয়ায় স্যাটেলাইটের আর্থ-স্টেশন, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) প্রতিষ্ঠা করেন। রেডিও-টেলিভিশনের মতো প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনেরও নির্দেশ দেন তিনি।

ব্রিটিশ গার্ডিয়ান পত্রিকায় এস্তোনিয়ার ডিজিটাল রূপান্তর বা ই-এস্তোনিয়ায় পরিণত করায় দেশটির চতুর্থ প্রেসিডেন্ট টমাস হেনড্রিক ইলভসের পরিকল্পনার কথা পড়ছিলাম। ২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত 'ই-এস্তোনিয়া : দ্য কান্ট্রি ইউজিং টেক টু রিব্র্যান্ড ইটসেলফ অ্যাজ দ্য অ্যান্টি রাশিয়া' শীর্ষক নিবন্ধটির লেখক সাংবাদিক অ্যান্ড্রিউ কিন লিখেছেন, প্রযুক্তি এমন একটি সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে গণিত শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে- এ দুটি উপাদানই স্বাধীন এস্তোনিয়া উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি) সূত্রে পায়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতায় যদি ইলভসের মতোই নিজেকে 'হোয়াট ডু উই হ্যাভ'- প্রশ্ন করা হয়, এর উত্তর আসবে ধ্বংসস্তূপ, দারিদ্র্য (বিশ্বের ১০টি দরিদ্র দেশের একটি), ঔপনিবেশিক আমলের ঘুণে ধরা শিক্ষাব্যবস্থা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও পাকিস্তানি শাসকবর্গ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থাই বহাল রাখে, যা বাংলাদেশ পায় উত্তরাধিকার সূত্রে। ১৯৭৫ পরবর্তী ২১ বছরে সামরিক ও ছদ্মবেশী গণতন্ত্রী শাসকদের কাছ থেকেও বাংলাদেশ পায় সেই কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিবিরোধিতা।

বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী ও সুচিন্তিত অন্যতম সেরা উদ্যোগটি হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। কারণ এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে নবজীবন সৃষ্টির উজ্জ্বল সম্ভাবনা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের চাবিকাঠি। তাই তিনি শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রখ্যাত বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উদ্দীপনাময় ভাষণে কমিশনের সদস্যদের স্বাধীনভাবে সুচিন্তিত পরামর্শ দানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আমাদের সীমিত সম্পদের কথা স্মরণে রেখে কমিশন শিক্ষার এমন এক দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রণয়ন করবেন যা শিক্ষা ক্ষেত্রে সার্থক ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার সাধনে সাহায্য করবে।' (জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, মে, ১৯৭৪)। বঙ্গবন্ধু ছিলেন কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার বিপক্ষে। ১৯৭৩ সালের ২০ মার্চ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে স্নাতক ও ফ্যাকাল্টি সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে গড়ে ওঠা শিক্ষাব্যবস্থা যা পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলেও অব্যাহত থাকে, তা শুধু কেরানি তৈরি করেছে।' বঙ্গবন্ধু জাতীয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট দেখে খুশি হয়েছিলেন। কারণ এটি ছিল সমাজ ও জাতীয় জীবনের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কারের জন্য পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট। এতে বলা হয়, বর্তমানে সারাদেশে প্রথম ডিগ্রি (আন্ডার গ্রাজুয়েট পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার। এর মধ্যে বিজ্ঞানে প্রায় ৩৫ হাজার, বাণিজ্যে প্রায় ৩০ হাজার এবং অবশিষ্ট কলা বিভাগে শিক্ষারত। অথচ সমাজ ও জাতীয় জীবনের চাহিদার সঙ্গে এটা মোটেই সুসামঞ্জস্য নয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে এরূপ আত্মঘাতী অবস্থা যে কোনো সমাজের পক্ষে অপরিসীম দুশ্চিন্তার কারণ হতে বাধ্য। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দেশের মানুষ ও যুবক শ্রেণির চাকরি ও কাজের ব্যবস্থার জন্য প্রয়োগমুখী, কারিগরি ও প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিশনের রিপোর্টে একে আলাদা অধ্যায় হিসেবে সন্নিবেশিত করা হয়। রিপোর্টের অধ্যায় ১০-এ ডিপ্লোমা স্তরে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা যুক্ত করা হয়। ১৩.২২ ক্রমিকে বলা হয়, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি ব্যতীত পূর্ণাঙ্গ ও ফলপ্রসূ বিজ্ঞান শিক্ষা সম্ভব নয়।

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন মানুষের সৃজনশীলতা, বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতির মাধ্যমে উজ্জ্বলতর ভবিষ্যৎ রচনায়। তা প্রতিফলিত হয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে। বঙ্গবন্ধু একদিকে শিক্ষানীতি, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও পাঠ্যক্রমে অন্তুর্ভুক্ত করার জন্য আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন, অন্যদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বিকাশে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ডিজিটাল বিপ্লবের আবির্ভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক জাগরণে শামিল হয়ে তার স্বপ্টেম্নর সোনার বাংলা বিনির্মাণকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, এমনই একজন নেতাকে ১৯৭৫  সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেমে যায় দীর্ঘ ২১ বছর প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের সব উদ্যোগ। এর কারণ ছিল বাংলাদেশের সামরিক এবং তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনের কবলে নিপতিত হওয়া। এদের না ছিল কোনো ভিশন, না ছিল দেশ পরিচালনায় দক্ষতা। পঁচাত্তর পরবর্তী সরকার বঙ্গবন্ধু সরকারের জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল করে। আধুনিক প্রযুক্তি বরণে তাদের মধ্যে ছিল নেতিবাচক মানসিকতা। ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার সরকার বিনা অর্থে ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল সি-মি-উই-তে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। ইন্টারনেটে যুক্ত হলে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে এমন খোঁড়া যুক্তির কথা তখন শোনা গিয়েছিল। তবে প্রযুক্তিবিমুখ চিন্তা-চেতনার বিপরীতে ২১ বছর পর আধুনিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমনস্ক আরেক দূরদর্শী নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণ ডিজিটাল বিপ্লবে পথ চলার তোরণ আবারও উন্মোচিত হয়। তার সরকার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন মানুষের কাছে সহজলভ্য করে। ২০০৯ সাল থেকে 'রূপকল্প ২০২১' সামনে রেখে শুরু হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রা। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শ ও তদারকিতে বিগত বারো বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রম শুধু দেশে ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়ন, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়া, অনলাইনে সেবা প্রদানে সীমাবদ্ধ নেই, এর বিস্তৃতি ঘটেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হওয়া ডিজিটাল কার্যক্রমের পাঁচটি বেস্ট প্রাকটিস মডেল- ডিজিটাল সেন্টার, সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড, অ্যাম্পেথি ট্রেনিং, টিসিভি এবং এসডিজি ট্রেকার বাস্তবায়িত হচ্ছে সোমালিয়া, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ফিজি, ফিলিপাইন এবং প্যারাগুয়েসহ বিদেশের মাটিতেও। এর পরও ই-বাংলাদেশ বিনির্মাণ, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ২০৪১ সালে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশকে আরও কিছুটা পথ পাড়ি দিতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং গণিত শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে প্রোগ্রামিং শেখার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ষষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আইসিটি বিষয়ে এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসে কী পড়ানো হয় তা মনিটর করতে হবে। সর্বোপরি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শিক্ষা কারিকুলামে ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির ওপর কোর্স অন্তর্ভুক্তকরণ ও শিক্ষিত তরুণদের সেসব প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম করে তুলতে হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক

মন্তব্য করুন