ব্যক্তির যেমন চরিত্র থাকে, তেমনি রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে। বিশেষ করে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যদি কোনো রাষ্ট্র অর্জিত হয় তাহলে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনীতির ধারাবাহিকতায় সেই রাষ্ট্রের একটি মতাদর্শিক চরিত্র গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রের ভিত্তি, গতি ও ভবিষ্যৎ সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। রাষ্ট্রীয় দর্শন ও রাজনীতির মূলধারা হয়ে ওঠে সেটাই যা উড়ে এসে জুড়ে বসা নয় বরং গণসংগ্রামের দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় নির্ধারিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরও একটি স্বাভাবিক স্বতঃস্ম্ফূর্ত চরিত্র গড়ে উঠেছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মানুষে মানুষে অসহনীয় বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে সমাজতন্ত্র গৃহীত হয়েছিল। স্বপ্ন ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র হবে আধুনিক, প্রগতিশীল, জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের দর্শন ও রাজনীতি, রাজনীতির মূলধারা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

যদি সবকিছু স্বাভাবিক থাকত, বাংলাদেশের রাজনীতি একটা স্বাভাবিক উত্তরাধিকার, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পেত। একজন ভিত্তি, একজন গতি, আরেকজন ভবিষ্যৎ। এদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও, তৈরি হয়ে ওঠায় নিজস্ব যোগ্যতাই প্রামাণ্য ছিল। কোনো স্বজনপ্রীতি নয়। মুজিব-মনি-কামাল ত্রয়ো বাংলাদেশের রাজনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল। প্রথমজন ভিত্তি, তার কথা বলা বাহুল্য মাত্র। দ্বিতীয়জন ২১ বছর বয়সে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন, ২২ বছর বয়সে আওয়ামী লীগ-কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ উদ্যোগে আইয়ুব খানবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান দুই সংগঠকের একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গভর্নর মোনায়েম খানকে প্রতিহত করতে গিয়ে নিজের সনদ হারিয়েছেন, কারাবন্দি হয়েছেন। ছয় দফা আন্দোলনের লড়াকু রূপের অন্যতম কৌশলী। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের। শুধু তরুণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না; লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ছিলেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এমন বুদ্ধিবৃত্তিক সমাহার খুব একটা নেই।

স্বাধীনতার পর বাংলার বাণীসহ একাধিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির যে মূলধারা- সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে জনগণের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন তিনি। স্বাধীন দেশের সরকারি কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙানোর নির্দেশের বিরোধিতা করে সম্পাদকীয় লিখেছেন- 'আইয়ুব খানের বদলে মুজিব খান দেখতে চাই না।' আওয়ামী লীগ রাজনীতির তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে তার মতো কেউ চিন্তা করেননি। শুধু যুবলীগ নয়, শিশু-কিশোর সংগঠন শাপলা কুঁড়ির আসরও তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। ১৯৭৪-এ ক্রেমলিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছে, একই সময় আমেরিকা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রামে। এই প্রোগ্রামে মনোনয়ন পাওয়া কয়েকটি নাম- মার্গারেট থ্যাচার, টনি ব্লেয়ার, মাহাথির মোহাম্মদ ও জুলিয়া গিলার্ড। আমেরিকা যাননি তিনি বরং 'আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নীতি'র বিরোধিতা করেছেন। বাকশাল সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি শেখ ফজলুল হক মনি, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম।

তৃতীয়জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী। কর্মীই। বাবার বিশাল ইমেজ ব্যবহার করে নেতা হয়ে ওঠেননি। রাজনৈতিক কর্মী যতটা, তার চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিককর্মী, ক্রীড়া সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পালিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন অফিসার হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে কমিশন লাভ করেন। প্রশিক্ষণকালীন সহকর্মীরা জানিয়েছেন, মাঠের যুদ্ধে কতটা উদগ্রীব ছিলেন তিনি। প্রধান সেনাপতি তাকে এডিসি হিসেবে সঙ্গে রেখেছিলেন। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র, আবারও রাজনীতি-সংস্কৃতি-ক্রীড়া সংগঠক। মঞ্চনাটকের প্রিয়মুখ ছিলেন। ব্যান্ড সংগীতের উচ্ছ্বাস, আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিষ্ঠাতা- বিপুল প্রাণের সমাহার। যুদ্ধফেরত প্রজন্মের অনেকেই যখন অস্ত্র ও অর্থের মোহে দিকভ্রান্ত হয়েছে, আদর্শিক মায়াজালে ভ্রান্ত; শেখ কামাল তখন সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা ও সুস্থ রাজনীতিকে তার পাথেয় করেন। নতুন রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মের জন্য এর চেয়ে উজ্জ্বল আদর্শ আর কী হতে পারে? কোনো সুবিধা নেওয়ার ইতিহাস নেই তার। তিনি শেখ কামালউদ্দিন, শেখ কামাল। আওয়ামী লীগের তৃতীয় প্রজন্মের সম্ভাবনা। পারিবারিক পরিচয়ের সুবিধা নিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাসনা ছিল না তার, বরং চেয়েছেন একেবারে তৃণমূল থেকে রাজনীতি শিখে আসতে। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. নুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন, শেখ কামালকে বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাঠাতে। বঙ্গবন্ধু জানিয়েছিলেন, ছেলেকে দেশের বাইরে পড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি নেই তার। ড. নুরুল ইসলাম পরে তার নিজের যোগাযোগে কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছিলেন। শেখ কামাল খুব বিনীতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিলেন, তিনি দেশেই থাকতে চান, দেশের জন্য কাজ করতে চান একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ফেনীর বিলোনিয়ায় তিনি গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবিএম মূসার নির্বাচনী প্রচারণায়। এবিএম মূসা তার স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন- রাস্তার দুই পাশে ছেলেবুড়ো, শিশুকোলে নারী, ধানক্ষেত থেকে চাষিরা উঠে এসেছিলেন। দীর্ঘ ২০ মাইল পথ কামাল শুধু মুগ্ধ জনতার সালাম নিয়েছেন, সালাম দিয়েছেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক ভাষণ দেননি, ভোট চাননি তবু হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিল কেবল এই তরুণকে দেখতে! শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য আবুল ফজলের লেখা দিনলিপি থেকে জানা যায়, শেখ কামাল নামের তরুণটি কতটুকু বিনয়ী ও সদাচারী ছিলেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোরে প্রথমে হত্যা করা হয় শেখ মনিকে। তারপর শেখ কামাল, তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গতি, ভবিষ্যৎ ও ভিত্তি- একে একে হত্যা করা হয়। শহীদ শেখ কামালকে হত্যার মাধ্যমে আমাদের মূলধারার রাজনীতির ভবিষ্যৎ হত্যা করা হয়েছিল। এ ক্ষতি পূরণ হয়নি আর।

শেখ কামালকে শারীরিকভাবে হত্যা করেই ছেড়ে দেওয়া হয়নি। শেখ কামালকে শিকার হতে হয়েছে চরিত্রহননের। চরিত্রহননের এই প্রকল্প ছিল মূলত রাজনৈতিক। শহীদ শেখ কামালের শক্তির জায়গা হয়তো এটাই। ৪৬ বছর আগে হত্যা করা ২৬ বছরের এই তরুণ এখনও প্রাসঙ্গিক, গণবিরোধী রাজনীতির জন্য এখনও হুমকি, ভবিষ্যৎমুখী উজ্জ্বল তারুণ্যের প্রেরণা।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

hasan_murshed@hotmail.com