লকডাউন শেষে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ঘোষণা নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য একটি আনন্দের সংবাদ। ছাত্রছাত্রীরা শ্রেণিতে আসবে, শিক্ষকরা তাদের পড়াবেন এবং টিফিন টাইমে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে তারা খেলা করবে- এ যেন এক বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ার।

দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকার ফলে তাদের আচার-আচরণ, আবেগ-অনুভূতি, প্রকাশভঙ্গি, জানার আগ্রহ, পড়ার প্রতি মনোনিবেশ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হতে পারে। তাই এসব ব্যাপারে একজন শিক্ষককে বেশি কৌশলী ভূমিকা রাখতে হবে।

সাইকোথেরাপিস্ট জেন ক্যারো শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রতিক্রিয়ার কয়েকটি লক্ষণ তুলে ধরেছেন, যা জানা থাকলে একজন শিক্ষক তাদের শ্রেণিকক্ষে সহায়তা করতে পারবেন।

এক. শিক্ষার্থীদের মেজাজে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, যা কয়েক দিনের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। লক্ষণগুলোর মধ্যে স্বল্প শক্তি থাকা, বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ থেকে সরে আসা, পাঠগুলোতে মনোনিবেশ না করা, অশ্রুসিক্ত হওয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দুই. শারীরিক ওজনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে- সেটি ওজন বৃদ্ধি হতে পারে বা হ্রাসও হতে পারে। কারণ প্যান্ডেমিকে প্রায়ই মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকাতে তারা ক্ষুধা আক্রান্ত হতে পারে। তিন. ক্লান্তিভাব বেশ কয়েক দিনের জন্য স্থায়ী হতে পারে। ক্লাসে ঘুম ঘুম ভাব, অলসতা প্রদর্শন, উদাসীনতা প্রভৃতি পরিলক্ষিত হতে পারে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উদ্বেগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। চার. পাঠদানকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অল্পতে রেগে যাওয়ার মানসিকতা পরিলক্ষিত হতে পারে, যা পাঠদান প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।

পাঁচ. শিক্ষকের চোখ ফাঁকি দিয়ে আড়ালে এমনভাবে অঙ্গভঙ্গি করা, যা শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যেমন- অযথা দেহ চুলকানো, নিজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন তৈরি করা ইত্যাদি।

মোটকথা, শিক্ষার্থীরা আগের মতো একই গতিতে শিখতে সক্ষম বোধ করতে নাও পারে এবং বিব্রতকর আচরণ দেখাতে পারে। শ্রেণিতে পাঠদানকালে শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগী করতে না পারা বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া শ্রেণিতে এসে শিক্ষার্থীরা হোম সিকনেস বা গৃহপীড়ায় আক্রান্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন বাসাবাড়িতে থাকার কারণে তারা পিতামাতা, দাদা-দাদি বা ভাইবোন থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আলাদা হওয়াতে তাদের মনের মধ্যে এক ধরনের বিরহ ব্যথা অনুভব হতে পারে। ফলে শিক্ষকরা তাদের পাঠদানে সংকট বোধ করতে পারেন, যা শিক্ষার সঠিক ফলাবর্তন নির্ণয়ে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।

করোনাকালে এমনও অনেক শিক্ষার্থী থাকতে পারে যাদের কেউ হয়তো মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন, যা তাদের মধ্যে এক ধরনের ট্রমা তৈরি করতে পারে। এসব শিক্ষার্থীকে শ্রেণিভিত্তিক পড়ালেখায় আত্মনিমগ্ন করা শিক্ষকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। এমতাবস্থায় তাদের প্রতি মানসিক যত্ন নেওয়ার জন্য শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের বিশেষ পরিবেশ তৈরি করা আবশ্যক হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর সমস্যা ও সংকট যাই হোক না কেন, শিক্ষকদের এমন কিছু উপায় অবলম্বন করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা মানসিক দিক থেকে সুস্থ থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে।

ক. করোনাকালে আমাদের সবার জীবন কীভাবে কেটেছে বা কার কী সমস্যা হয়েছে এ সম্পর্কে ছাত্রছাত্রীদের পরিস্কার করে বুঝিয়ে বলতে হবে। করোনা একটি ভাইরাসজনিত রোগমাত্র, যা স্বাস্থ্যসচেতন থেকে মোকাবিলা করতে হবে। জীবন থাকলে ঝুঁকি থাকবে- এ বিষয়টি পরিস্কার করে তাদের বোঝাতে হবে।

খ. শিক্ষার্থীদের ভাইরাস সম্পর্কে প্রচুর কৌতূহল এবং প্রশ্ন থাকতে পারে, বর্তমানে করোনার আপডেট কী, ভবিষ্যতে এর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে এবং এটি কীভাবে তাদের শিক্ষাকে প্রভাবিত করবে ইত্যাদি নানা বিষয়ে জানার আগ্রহ থাকতে পারে। শিক্ষকদের তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত হবে।

গ. দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা বাড়িতে থাকায় তাদের পরিবারে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে, যা সম্পর্কে শিক্ষক হয়তো জানেন না। হতে পারে সেটি প্যাথেটিক বা সিম্প্যাথেটিক- এ বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী শিশু এবং তরুণরা কথা বলতে শুরু করতে পারে, শিক্ষক হিসেবে তাদের এ অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সুযোগ দিতে হবে। তারা এ ধরনের বিষয়ে যত বলার সুযোগ পাবে, তারা ততই নিজেদের হালকা করে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারবে।

ঘ. শ্রেণিকক্ষে ফিরে এলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের অনেক খোলামেলা হতে হবে। দীর্ঘকাল পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কারণে শিক্ষার্থীরা একে অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করতে বা শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে শিক্ষার্থীদের মাঝে জড়তা কাজ করতে পারে। খোলামেলা বা ফ্রি হলে তারা দ্রুত শ্রেণিকক্ষে সবার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে এবং পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারবে। এজন্য শিক্ষকরা মাঝেমধ্যে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কথা বলার একটি আলাদা শিডিউলও করতে পারেন।

ঙ. শ্রেণিকক্ষে উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব রেখে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। করোনা নিয়ে বাড়িতে কে কীভাবে সময় কাটিয়েছে, এ বিষয়ে দলভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা যেতে পারে। তাহলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পাঠ গ্রহণের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।

চ. কভিড-উত্তর শ্রেণি কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের বেশি বেশি সৃজনশীল কাজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বহুদিন হোম স্কুলে থাকার কারণে তারা ক্লান্তশ্রান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। তাদের এ একঘেয়েমি ভাব কাটাতে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে এমন কিছু ক্রিয়াকলাপ চর্চা করতে হবে, যাতে তাদের মেধা বিকশিত হতে পারে এবং সৃষ্টিশীল মানসিকতা গড়ে ওঠে। যেমন পাঠদানের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের বাইরে এনে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার সুযোগ তৈরি করা, প্ল্যাকার্ড-পোস্টার বানানো, সংগীত, ভিজুয়াল আর্ট বা ড্রয়িংয়ের কাজ দেওয়া ইত্যাদি নানা ধরনের কাজ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তি দেওয়া যেতে পারে।

মোটকথা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর লকডাউন বা কভিড-উত্তর শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিতে পড়ালেখায় মনোযোগী করে তোলাই শিক্ষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রায় দেড় বছরব্যাপী স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলাহল থেকে দূরে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানাবিধ মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষাক্রমে ফিরে আসার পর শিক্ষকদের পুস্তকনির্ভর জ্ঞান প্রদানের আগে তাদের মানসিক বিকাশ সাধনের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পড়ার পাশাপাশি সৃজনশীলতার প্রতি আকৃষ্ট করে তাদের মেধা ও মনন চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলেই কেবল লকডাউন-পরবর্তী শিক্ষকদের সব সমস্যার দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে।

প্রিন্সিপাল, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা

মন্তব্য করুন