সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ১৯৫৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। সাদামাটা, নিরহংকার জীবনযাপনে অভ্যস্ত, মানবিক গুণে গুণান্বিত সহজ সরল বাংলার মুখচ্ছবি আমাদের অতি প্রিয় এই মানুষটির ৬৭তম জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা। শেখ রেহানার ওপর অগাধ আস্থা ও ভরসা ছিল বলেই ছেলেমেয়ে সবাইকে লন্ডনে রেখে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা শত বিপদকে তুচ্ছ করে বাংলাদেশে এসে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে নিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেন। এর পেছনে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছার মতো অনুকরণীয়ভাবে পর্দার আড়ালে থেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন শেখ রেহানা।

শেখ রেহানা নীরবে-নিভৃতে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সংগ্রাম করে যাচ্ছেন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে। বছরের অনেকটা সময় দেশে থাকলেও যুক্তরাজ্যে কর্মজীবী হিসেবে সম্মানজনক জীবনযাপন করেন দেশের চারবারের প্রধানমন্ত্রীর বোন এবং শীর্ষ সম্মানিত পরিবারের সদস্য শেখ রেহানা। তার স্বামী ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক। তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়ের গর্বিত মা। তার বড় ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি বাংলাদেশের সিআরআইসহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করছেন। বড় মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটেনের লেবার পার্টির দুইবারের নির্বাচিত পার্লামেন্ট মেম্বার এবং ছোট মেয়ে আজমাইন সিদ্দিক লন্ডনে গ্লোবাল রিস্ক অ্যানালাইজার হিসেবে কাজ করছেন। তিনি শুধু নিজের ছেলেমেয়েদের দিকেই তাকাননি, বড় বোন শেখ হাসিনার ছেলেমেয়েদের মানুষ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে তার অসামান্য অবদান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ২১ দিন আগে শেখ রেহানা জার্মানিতে যান। শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া সে সময়ে জার্মানিতে কর্মরত থাকায় শেখ রেহানা বোনের বাসায় বেড়ানোর উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলেন। দেশে রেখে গিয়েছিলেন পুরো পরিবার। সে সময় তারা দেশে থাকলে হয়তো ইতিহাস ভিন্ন হতো। একাত্তরের পরাজিত শক্তির হাতে নিষ্পেষিত হতে থাকত এদেশের মানুষ।

জার্মানি থেকে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার সঙ্গে বেলজিয়াম গিয়েছিলেন শেখ রেহানা। ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায় অবস্থান করছিলেন তারা। রাষ্ট্রপতির কন্যা হিসেবে তারা সেখানে অত্যন্ত সমাদরে ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ সময় খুব ভোরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সেই রাষ্ট্রদূত তাদের বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য জার্মানিতে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীকে অনুরোধ জানান। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী বেলজিয়াম সীমান্তে গাড়ি পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে তার বাসায় নিয়ে আসেন।

এর পর শুরু হয় পিতৃ-মাতৃহীন দুই বোনের অনিশ্চিত কঠোর সংগ্রামী জীবন। দীর্ঘ শরণার্থী জীবন ভারতে; তারপর চলে গেলেন লন্ডনে নিজের জীবন গড়ার দৃঢ়প্রত্যয়ে। সর্বক্ষণ অন্তরে ছিল পিতৃহত্যার বিচার করার প্রতিজ্ঞা। সে যাত্রা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজের সূচনার সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ঘাতকদের শাস্তির বিষয়ে বিশ্বজনমত গড়ার লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন শেখ রেহানা। প্রবাসে সে আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে ছিলেন মূল চালিকাশক্তি।

পিতা-মাতাসহ পুরো পরিবার হারানোর নিষ্ঠুরতা ও পরবর্তী জীবনযুদ্ধ তাদের দুই বোনকে জীবনকে নির্মোহভাবে দেখতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে এই বাস্তবতা- জীবন পাল্টে যেতে পারে যে কোনো সময়। তাই তারা নির্মোহ-নির্লোভ, কিন্তু সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী। বুকের কষ্ট চেপে রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে যে কোনো সংকট মোকাবিলা করেন অবিচল চিত্তে। তাই আজ আসতে পেরেছেন বহুদূর। বঙ্গবন্ধুর রক্তের বাহক এবং বঙ্গমাতার সুশিক্ষায় শিক্ষিত কন্যা দুটি সেই একই সুশিক্ষায় গড়ে তুলেছেন পরবর্তী প্রজন্মকেও। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার ইস্পাতকঠিন দৃঢ় মনোবল আমাদের অভিভূত করে। অভিভূত করে তাদের সাহস, জীবন ও মানুষ সম্পর্কে নির্মোহ-স্বচ্ছ অন্তর্দৃষ্টি।

শেখ রেহানা নিজের কষ্টের কথা, নিজের অনেক ক্ষত উন্মোচন করেন মাঝেমধ্যে খুব সাধারণভাবে সাধারণ উচ্চারণে। কিন্তু চোখ দেখে বোঝা যায় ক্ষতের গভীরতা। তিনি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সেই তীক্ষষ্ট স্মৃতিশক্তি। ভোলেন না প্রায় কিছুই। সেটাই মাঝেমধ্যে মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনে আছে সব বিশ্বাসঘাতকতা, তাই চিনতে পারেন মুখোশের আড়ালে ঢাকা মানুষের মুখ। এই স্মৃতিশক্তিই তাকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে শেখায়।

যারা বঙ্গমাতাকে চিনতেন, তারা জানেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির দরজা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। বঙ্গমাতার আতিথেয়তা থেকে কেউ বঞ্চিত হতেন না। এই সহজাত আতিথেয়তা ও মাতৃরূপ আছে ছোট শেখ রেহানার ভেতরেও। আদর, মায়া ও ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতে পারেন প্রগাঢ়ভাবে। নিজে বহুকাল অনিরাপদ জীবনযাপন করার কারণে দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন সর্বক্ষণ।

১৯৮১ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ সহজ ছিল না। এ সময়ে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে শেখ রেহানা শেখ হাসিনাকে সাহস জুগিয়েছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। ১/১১-এর সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যে বিভক্তিকরণ দেখা দিয়েছিল, তা রুখতেও শেখ রেহানা বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সে সময় পর্দার আড়াল থেকে দলের ঐক্য বজায় রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

নিরহংকারের অন্যতম উদাহরণ শেখ রেহানা। পাবলিক গাড়িতে নিজের অফিসে যাওয়া-আসার খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি। কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে সততার এক বিরল দৃষ্টান্ত। শেখ রেহানাসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সব সদস্যই সবাইকে আপন করে নেওয়ার এক অসীম ক্ষমতার অধিকারী। তিনি রাজনীতির ফ্রন্টলাইনে না এলেও রাজনীতির অন্তর্নিহিত হালচাল ভালোভাবেই বোঝেন এবং বাবার মতোই এদেশের মানুষকে ভালোবাসেন।

শেখ রেহানা জাতির বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে তার বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আগলে রাখেন এবং সঠিক পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে থাকেন। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ শেখ হাসিনা যে বহুমাতৃক অবদানের ইতিহাস রচনা করে যাচ্ছেন, তার পেছনে শেখ রেহানার অবদান বঙ্গমাতার অন্য রূপে পর্দার আড়ালে আশীর্বাদ হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বহু গুণে গুণান্বিত বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে সুখে-দুঃখে এক হয়ে কাজ করেছেন এবং করে যাবেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে- এ প্রত্যাশা আজ প্রতিটি প্রগতিশীল বাঙালির মনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। শেখ রেহানার দেশপ্রেম, দেশের মানুষের মঙ্গল আকাঙ্ক্ষা, সংস্কৃতিমনা উদার হৃদয় আমাদের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। তার জন্মদিনে তাকে জানাই অভিবাদন।

সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব

মন্তব্য করুন