এটি সর্বজনবিদিত যে, আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় মানুষের সমাজবদ্ধ হওয়ার মৌলিক অনুষঙ্গ হচ্ছে পরিবার। জন্মের পর স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় সৃজন-মনন-ন্যায়পরায়ণতা-মানবিক আচরণের শিক্ষা প্রদানে পরিবারই প্রণিধানযোগ্য ভূমিকা পালন করে। বস্তুতপক্ষে যেসব প্রতিষ্ঠান সমাজ কাঠামোকে পরিশুদ্ধ করে; প্রচলিত আচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বিবাহ ও পরিবারই হলো এদের মধ্যে সর্বাধিক প্রাচীন এবং সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও পুরুষের পরিশীলিত দাম্পত্য জীবন পরিচর্যায় বংশবিস্তার এবং সাবলীল জীবনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে বরাবরই পরিবারের অবদান ছিল মুখ্য। বেঁচে থাকার অকৃত্রিম তাগিদ থেকেই পরিবার গঠনের প্রবৃত্তি এবং শিশুর লালনপালন পরিবারের কর্মপরিধিকে নানামুখী প্রসারিত ও সঞ্চারিত করেছে।

আইনসিদ্ধ রীতিনীতি-সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতি কর্তৃক স্বীকৃত চুক্তিনির্ভর স্বামী-স্ত্রীর অটুট পবিত্র বন্ধনকে কেন্দ্র করেই সমাজ আজকের উন্নত অবস্থানে উপনীত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক বিশেষ করে করোনাকালীন দুঃসময়ে বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যান সচেতন মহলে নিগূঢ় আশঙ্কা প্রতিভাত করছে। এটি কোনোভাবেই সমাজ অগ্রগতি-প্রগতির অনুশাসনকে এগিয়ে নেওয়ার সহায়ক দৃশ্যপট নয়। সমাজ-পরিবার-সরকার এবং ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সচল মূল্যবোধের সক্রিয়তাকে কার্যকর করা না গেলে এর পরিণতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। সন্তান-সন্ততির বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় অসংলগ্ন-অসংযত-বিভ্রান্তির আচ্ছাদনে সঠিক-প্রত্যাশিত পন্থায় প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আশানুরূপ সুফল বয়ে আনতে পারে না- নিঃসন্দেহে তা বলা যায়। এতে শুধু সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিফলিত হবে না; চলমান আদর্শ ও দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে জীবনপ্রবাহের অবিচ্ছেদ্য গতিধারার প্রচণ্ড অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

সাধারণত দীর্ঘকাল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অসদ্ভাব বা মনোমালিন্যের পরিসমাপ্তি ঘটে বিবাহবিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। ক্ষেত্রবিশেষে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের তিক্ততার অতিমাত্রায়ও বিবাহবিচ্ছেদ হয় না। ফলে বিবাহবিচ্ছেদের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সত্যিই দুরূহ ব্যাপার।

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক-মানসিক চাপের ফলে উদ্ভূত পারিবারিক কলহ এবং করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল, পারস্পরিক বোঝাপড়া না হওয়াকেও তারা বিবাহবিচ্ছেদের জন্য দায়ী করছেন। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, শুধু ঢাকাতেই দিনে ৩৮টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রতি মাসে ৯৯টি বিচ্ছেদ বেড়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, ৭৫ শতাংশ ডিভোর্সই দিচ্ছে নারীরা। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে চার হাজার ৫৬৫টি বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে, অর্থাৎ মাসে এক হাজার ১৪১টি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪২টি। ঢাকার পাশাপাশি সারাদেশে এর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ১৭ শতাংশ বিবাহবিচ্ছেদ বেড়েছে। মহামারিকালে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে বিবিএসের আশঙ্কা। সংস্থার ২০২০ সালের প্রতিবেদনে জানা যায়, মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রতি হাজারে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী ও ১ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ বিবাহবিচ্ছেদ করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে, যারা কম বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় বা বাল্যবিবাহ করে।

ইউএনএফপিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০-১১ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তাদের ১৮তম জন্মদিনের আগেই বিবাহিত। স্থানভেদে বাল্যবিবাহের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। সমগ্র বিশ্বে শহরাঞ্চলের মেয়েদের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মেয়েদের বাল্যবিবাহের প্রবণতা প্রায় দ্বিগুণ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার তিন দেশে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৭০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে নাইজারে বাল্যবিবাহের হার সর্বোচ্চ। ২০-২৪ বছর বয়সী নাইজেরিয়ান নারীদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ নারী ১৮ বছরের আগে ও ২৮ শতাংশ নারী ১৫ বছরের আগে বিয়ে করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালে অর্ধেকের বেশি বাল্যবিবাহ হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আফগানিস্তান ও তুরস্কে ১৮ বছরের আগে বিবাহিত নারীর হার যথাক্রমে ৫৩ শতাংশ ও ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। ইয়েমেনে বিয়ের বয়স ১৫ বা ১৮ করার প্রচেষ্টাকে ইয়েমেন সরকারের শরিয়াহ আইন বিভাগ ইসলামবিরোধী ঘোষণা দিয়ে বাধাগ্রস্ত করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পাহাড়ি উপজাতিদের মধ্যে মেয়েদের কম বয়সে বিয়ের প্রবণতা বেশি। বার্মিজ কারেন উপজাতিরা বাচ্চার জন্মের আগে তাদের বিয়ে ঠিক করে রাখে।

বিশ্বব্যাপী বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হারের দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। ২০০৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সে সময়ের ২৫-২৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগে। 'বিশ্বজুড়ে শিশুদের অবস্থা-২০০৯'-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ৬৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। বাংলাদেশে মেয়েদের বিবাহের সর্বনিম্ন ১৮ ও ছেলেদের ২১ বছর হলেও ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধক বিল পাসের মাধ্যমে ক্ষেত্রবিশেষে আদালতের অনুমতিতে ১৮ বছরের নিচে বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ২ এপ্রিল প্রকাশিত বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় বাল্যবিবাহের মাত্রা নিয়ে পরিচালিত জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, যেসব শিশু বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে, তাদের ৫০ দশমিক ৬ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ১৭ বছর, ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছর এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ১২ বছর। ওই সময়ে উল্লেখ্য জেলাগুলোয় অন্তত ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে বলে সংস্থাটি প্রকাশ করেছে। উল্লিখিত প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এটি সুস্পষ্ট যে, বাল্যবিবাহ ও সংশ্নিষ্ট বিবাহবিচ্ছেদ দ্রুততর সময়ের মধ্যে প্রতিরোধ করার প্রকৃষ্ট পদক্ষেপ ও পরিকল্পিত কর্মকৌশল বাস্তবায়ন করা না হলে এটি সুদৃঢ়ভাবে বলা যায় যে, জাতি অচিরেই দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।

সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন