বাংলাদেশে কভিড-১৯ সংক্রান্ত যেসব পরীক্ষা করা হয় তার সংখ্যা দৈনিক কত হওয়া উচিত, সে বিষয়ে এক সময় আমরা বিভিন্ন মতামত দেখেছি। যে সংখ্যাটা আমরা প্রায়ই শুনতে পেতাম সেটা হলো ২০,০০০। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ২০,০০০ কেন? কেন ১৯,০০০ নয় বা কেন ২১,০০০ নয়? কেউ কেউ দাবি করতেন দৈনিক ৫০,০০০ পরীক্ষার। কেউ কেউ চাইতেন, তা যেন দৈনিক পাঁচ লাখ থেকে ১০ লাখ হয়! কীসের ভিত্তিতে এত নির্দিষ্ট করে এই সংখ্যাগুলোর প্রস্তাবনা করা হতো, জানি না। তাদের যুক্তি, যত বেশি পরীক্ষা হবে তত বেশি কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ তাদের মতে, যত বেশি রোগী শনাক্ত হবে, তত বেশি তাদের সংগনিরোধ করা যাবে এবং তাদের সংসর্গে যারা এসেছেন তত বেশি তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা যাবে। কিন্তু ভুললে চলবে না আরটি-পিসিআর পরীক্ষা, যা কভিড-১৯ নির্ণয়ের স্বর্ণ মানদণ্ড। তা আসলে প্রচলিত প্রক্রিয়ায় ৬৭ শতাংশ মানুষকে চিহ্নিত করতে পারে। অর্থাৎ এটা ৩৩ শতাংশ রোগীকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারে না। এই ৩৩ শতাংশ কিন্তু সবার সন্দেহের ঊর্ধ্বে রোগের বিস্তার ঘটাবে। আরটি-পিসিআর পরীক্ষার প্রক্রিয়া কতগুলো পৌনঃপুনিক পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সাধিত হয়। এই পুনরাবৃত্তি ২০ থেকে ২৪ বারের বেশি হওয়া উচিত নয়। কারণ তা না হলে পরীক্ষাটি মাত্র একটা ভাইরাস কণা থাকলে সেটাকেই ভাইরাসটির ধনাত্মক উপস্থিতি হিসেবে দেখাবে। যেটাকে আমরা রোগতাত্ত্ব্বিকভাবে বলব ভুল (ফলস পজিটিভ)। কারণ শুধু একটা ভাইরাস দিয়ে কেউ রোগগ্রস্ত হন না এবং কারও মধ্যে সংক্রমণও ঘটান না।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ২৮ জুলাই বাংলাদেশে সর্বাধিক সংখ্যক কভিড-১৯ শনাক্ত হয়, যা ছিল ১৬,২৩০ ও ৫৩,৮৭৭টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ছিল ৩০ দশমিক ১২ শতাংশ। একভাবে বলা যায়, ৩৭,৬৪৭টি পরীক্ষা ছিল অকারণ। অর্থাৎ কম করে হলেও একদিনে অন্তত ৩,৭৬,৪৭,০০০ টাকার বিপরীতে আমাদের ফলাফল ছিল শূন্য। উল্লেখ্য, প্রতি নমুনা পরীক্ষার হার প্রথম বছর ছিল প্রায় ২,৭০০ টাকা। পরীক্ষার হার অর্থহীনভাবে বৃদ্ধি করে দেশের কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় কি প্রজ্ঞার পরিচায়ক?

তার পরের প্রশ্নটা হলো, যে ১৬,২৩০ জনকে শনাক্ত করা হলো, তারা তো নিজেরাই এগিয়ে এসেছিলেন পরীক্ষা করার জন্য। যারা রোগগ্রস্ত হয়েও পরীক্ষার জন্য আসেননি, তারা কি রোগ ছড়াননি? এই ১৬,২৩০ শনাক্ত রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন কতজন? তাদের সবাইকে কি পরীক্ষা করা সম্ভব? এই ১৬,২৩০ জন যেসব জায়গায় গিয়েছেন, যাদের সঙ্গে মিশেছেন, তাদের সবাইকে কি খুঁজে বের করা যাবে দোকান, বাজার বা যানবাহন থেকে? যারা সংক্রমিত হয়েছেন কিন্তু রোগগ্রস্ত হননি, তাদের তো পরীক্ষাই করা হয়নি। তারা কি রোগ সংক্রমণ করেননি? কথা হলো, পরীক্ষা যদি বাড়াতে হয়, কাদের মধ্যে বাড়ানো হবে? যারা সংক্রমিত হয়েছেন কিন্তু রোগগ্রস্ত হননি, তাদের তো পরীক্ষার আগে চিহ্নিত করার কথা নয়। তাহলে চোখ বন্ধ করে সবাইকে তো পরীক্ষা করা যাবে না। কারণ এর ফলে শূন্য ফলের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। আর এতে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হবে, সেটা কি গ্রহণযোগ্য?

তারপরও কথা থাকে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে কীভাবে সংগনিরোধ এবং সন্দেহকৃত সংক্রমিতদের বিচ্ছিন্ন করা হবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি শনাক্ত রোগীর জন্য ১০ থেকে ৩০ জনকে পরীক্ষা করার অবাস্তব পরামর্শ যদি মানতে হয় (যাতে বিশ্বের কোনো দেশ কর্ণপাত করেনি), তাহলে ১৬,২৩০ জন শনাক্তের বিপরীতে প্রতিদিন ১,৬২,২৩০ থেকে ৪,৮৬,৯০০ জনকে পরীক্ষা করতে হবে। যেহেতু কভিড-১৯-এ ৮০ শতাংশ সংক্রমিত ব্যক্তির কোনো অসুবিধাজনক উপসর্গ থাকে না; তাই তারা তাদের সংক্রমণ পরীক্ষা করাবে না বা করায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলে আশা করা যায়, ১,৬২,২৩০ বা ৪,৮৬,৯০০ জনের মধ্যে নতুন করে আরও ১,২৯,৭৮৪ থেকে ৩,৮৯,৫২০ জন সংক্রমিত শনাক্ত হবেন। প্রতিদিন যদি এই সংখ্যক সংক্রমিতকে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে চিন্তা করা যায়, তাদের সংগনিরোধ কীভাবে হবে? এটা কি আদৌ সম্ভব? এ জন্যই কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে এ কৌশল বিশ্বের কোথাও অনুসৃত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে কিছু স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শকে অবশ্যপালনীয় মনে করেন কোনো ধরনের নিজস্ব চিন্তা বা বিশ্নেষণ ছাড়াই।

এখানে আরেকটি তথ্যের অবতারণা গুরুত্বপূণ। বিশ্বের কোনো দেশে নমুনার সংখ্যা বাড়িয়ে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে- এ ধরনের প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবেন না। যখন মানুষের মধ্যে যথেষ্ট প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হয়েছে বা প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানুষ ব্যক্তিগত প্রতিরোধমূলক আচরণ বাস্তবায়ন করেছেন, তখনই রোগটি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

সংক্রমণ প্রতিরোধের কৌশল উদ্ভাবনে আমাদের কি কোনো সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ তথ্য এবং তার গভীর বিশ্নেষণ প্রয়োজন? প্রতিরোধের জন্য আসলে আমাদের জানতে হবে কীভাবে একটি রোগ সংক্রমিত হয় এবং মানুষকে তা জানাতে হবে, যাতে তারা সেই পথগুলো অতিক্রম করতে বিরত থাকে, যা সংক্রমণকে বিস্তারিত করে। কভিড-১৯ এর এই রোগতাত্ত্ব্বিক তথ্য কমবেশি আমরা জানি। রোগতত্ত্ববিদরা তাদের মৌলিক কোর্সে শেখেন, একটি রোগের সংক্রমণ রোধ করতে রোগের জীবাণুকে চিহ্নিত করার প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে এটা জানাই যথেষ্ট যে, রোগের বাহন বা ভেক্টর (যেমন কোনো পতঙ্গ) কী বা কে; যা জৈবিক, শারীরিক, যান্ত্রিক বা পরিবেশগতভাবে একক বা সংমিশ্রণে ক্রিয়া করতে পারে। ১৮৫৪ সালে লন্ডন শহরের পানি বিতরণ ব্যবস্থায় রানী মেরির অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট) জন স্নোর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে লন্ডনে কলেরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়েছিল তা মহামারি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি জ্বলন্ত শাস্ত্রীয় উদাহরণ হিসেবে উলেল্গখ করা হয়। অথচ কলেরার জীবাণু আবিস্কৃত হয়েছিল এরও ৩০ বছর পর, ১৮৮৪ সালে রবার্ট কচের মাধ্যমে।

রোগ প্রতিরোধের জন্য আমাদের জানতেই হবে- কতজন মানুষ সংক্রমিত হয়েছে এবং কারা, এমন কিন্তু নয়।

রোগতত্ত্ববিদ, বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কার্যকরী দলের সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ কার্যকরী দলের আহ্বায়ক, সোশ্যাল সেক্টর ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশনের অবৈতনিক নির্বাহী প্রধান

মন্তব্য করুন