আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা বসবাসের অযোগ্য- চলতি বছর এমনই এক ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। বসবাসের অযোগ্য হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে 'দূষণ' ও 'যানজট' উল্লেখযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে দূষণ ও যানজট আন্তঃসম্পর্কিত। সড়কে দীর্ঘ যানজট বায়ুদূষণ বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ঢাকার মতো এত যানজট পৃথিবীর অন্য কোনো মেগাসিটিতে নেই। জনবহুল এই শহরে সকাল বেলায় এখন আর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে না। সে জায়গায় অবস্থান নিয়েছে গাড়ির হর্নের বিকট শব্দ। একটা সময় ঢাকা মসজিদের শহর নামে পরিচিত থাকলেও এখন সুধীজন ঢাকাকে গাড়ি আর যানজটের শহর বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'নামবিও' কর্তৃক প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯ এর তথ্য অনুযায়ী, যানজটের দিক দিয়ে ঢাকা প্রথম স্থানে রয়েছে। ২০১৮ সালে এর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। মাত্র তিন বছর আগেও ঢাকা তৃতীয় স্থানে ছিল। যানজটের মূল কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধিকে দায়ী করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী এই দূষণ আর যানজটের সমাধানের জন্য প্রতি বছর ২২ সেপ্টেম্বর নানা কর্মোদ্যোগ সামনে নিয়ে 'বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস' উদযাপিত হয়। শহরকে যানজটমুক্ত, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি করার লক্ষ্যে সবাইকে আহ্বান- সপ্তাহে বা মাসে এক দিন রাস্তাগুলোকে গাড়িমুক্ত করে সংস্কার কাজ ও খালি জায়গা তৈরি করে খেলাধুলা বা বিনোদনের ব্যবস্থা করা, যান্ত্রিকতা থেকে মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়া ইত্যাদি বিষয় সামনে নিয়ে আসাই এ দিবসের উদ্দেশ্য। আজ দেশে পালিত হবে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। করোনার কারণে এ বছর দিবসটি ভিন্নভাবে পালন করা হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- 'হাঁটা ও সাইকেলে ফিরি, বাসযোগ্য নগর গড়ি'। দেশের ৬০টি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হবে। এ উপলক্ষে গত সোমবার ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) থেকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের প্রয়াসে ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস নামে প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর সামনে একটি ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। করোনার কারণে গত এক বছর এ ইভেন্ট বন্ধ রয়েছে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে গণপরিবহন হতে পারত নাগরিকদের চলাচলের জন্য আদর্শ বাহন, সেখানে এখন ব্যক্তিগত গাড়ির অবস্থান। মানুষ দিন দিন ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছে। এর মূল কারণে রয়েছে গণপরিবহনের নানা সীমাবদ্ধতা। প্রথমত গণপরিবহনের অপ্রতুলতা। পরিস্থিতি এমন যে মূল লোকসমাগম স্থান থেকে কোনো রুটে পরিবহনের সংখ্যা বেশি আবার কোনো রুটে তুলনামূলক কম। যেমন, ফার্মগেট থেকে মিরপুরের গাড়ির সংখ্যা অন্যান্য রুটের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে টিকিট ব্যবস্থা না থাকা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নারীদের অনিরাপত্তা, পরিবহনে আরামদায়কতার অভাব ইত্যাদি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষ নিজের পছন্দকে প্রধান্য দেওয়া ও সামাজিক আধিপত্য দেখাতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে থাকে।

২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা শহরের ৬ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে রাস্তার ৭৬ শতাংশ দখল করে আছে। ৬ থেকে ৮ শতাংশ রাস্তা গণপরিবহনের দখলে, আর রাস্তার বাকি অংশ পার্কিং ও অবৈধ দখলে রয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। ব্যক্তিগত গাড়ির সঙ্গে গণপরিবহনের নানাভাবে তুলনা করলে দেখা যায়, ব্যক্তিগত গাড়ি কম কার্যোপযোগিতায় বেশি রাস্তা দখল করে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ সরেজমিন একটি জরিপ করে। এতে দেখা যায়, একটি ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় যতটুকু জায়গা দখল করে, সমপরিমাণ জায়গা একটি হিউম্যান হলার দখল করে। ব্যক্তিগত গাড়িতে সর্বোচ্চ ছয়জন আরোহণ করতে পারে। পক্ষান্তরে হিউম্যান হলারে ১৫ জন আরোহণ করতে পারে। অপরদিকে তিনটি ব্যক্তিগত গাড়ি ১৫ জন ব্যক্তি নিয়ে যে স্থান দখল করে, সেখানে ৩৬ জন থেকে ৪০ জন যাত্রী ধারণক্ষমতার একটি গণপরিবহন স্থান নিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আরও ভিন্নতা দেখা যায়। বিত্তশালী একটি পরিবারের কমপক্ষে দুই বা ততোধিক গাড়ি থাকে। ফলে মাত্র দুই থেকে চারজন লোকের জন্য যদি গড়ে দুটি গাড়ি রাস্তায় চলাচল করে, ওই পরিমাণ জায়গায় ১২টি বাইসাইকেল চলাচল করতে পারবে।

ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে জৈব জ্বালানির চাহিদা; বাড়ছে বায়ুদূষণ। বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) এবং রোড সেফটি ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'ঢাকা মহানগরীর যানজট :আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা' নামক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনা অনুযায়ী দীর্ঘ যানজটে বসে থেকে প্রতিদিন মানুষের ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে এর আর্থিক মূল্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা। হাঁটার গতির মতো ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নেমে এসেছে যানবাহনের গতি। অন্যদিকে বর্তমানে নতুন যানবাহন যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু সড়কের বেহাল দশা ও সংখ্যা থেকে যাচ্ছে সেই আগের মতোই। চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে যেসব পরিকল্পনা বা সুপারিশ গৃহীত হচ্ছে, তার বেশিরভাগই স্বল্পমেয়াদি। সমন্বিত পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান নয়। সারাদেশের যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে যাত্রীসেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বেড়েছে দুর্ঘটনা। এ ছাড়া যানজটে গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকলে সাধারণ ধোঁয়ার পাশাপাশি ক্ষতিকর 'আনবার্নড হাইড্রোকার্বন' নির্গত হয়। উপরন্তু জ্বালানি তেল বা গ্যাসের অপচয় হয়।

কভিড-১৯ এর লকডাউনের কারণে বছরের বেশিরভাগ সময়ে ঢাকার রাস্তায় যানবাহন কম ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজধানীর অফিস-আদালত খোলার সঙ্গে সঙ্গে যান চলাচল শুরু হয়। শেষ কয়েক মাস ধরে রাস্তায় গাড়ির উপস্থিতি দেখে করোনার অস্তিত্ব আর বোঝা যাচ্ছিল না। সেপ্টেম্বর মাসে স্কুল-কলেজ খোলার পর আবার অসহ্য যানজট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক কনজেশন ইনডেক্সে ঢাকা উঠে এসেছে ১ নম্বরে। কিন্তু করোনা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, কীভাবে ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানী চলাচল ও বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে। আর নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি ও যানজট না থাকলে ঢাকার এক স্থান থেকে আরেক স্থান যেন অনেক নিকটে চলে আসে। স্বল্পতম সময়ে পৌঁছা যায় গন্তব্যে। থাকে না বায়ু ও শব্দদূষণ। করোনার এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ যোগাযোগ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অল্প জায়গায় বেশি যাত্রী পরিবহন করা যায় এমন বাহনকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে বাসের সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। ঢাকায় প্রাইভেটকারের ব্যবহার অত্যধিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এর চলাচল নিরুৎসাহিত করতে পাবলিক বাস, হেঁটে ও সাইকেলে চলাচলের সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন। ফিটনেসবিহীন গাড়ি পরিহার করে ভালো মানের গাড়ি নামানো উচিত, যেন সব পর্যায়ের মানুষ গণপরিবহনে যাতায়াতে উৎসাহিত হয়। এসব সুবিধা না থাকায় ঢাকায় অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প খুঁজে পাচ্ছেন না এবং প্রাইভেটকার ব্যবহার করছেন। উন্নত বাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে প্রাইভেটকারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সম্ভব। এক দিন বেজোড় সংখ্যা এবং অন্যদিন জোড় সংখ্যার নাম্বারপ্লেট অনুযায়ী প্রাইভেট গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা যায়। সে ক্ষেত্রে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। মোটকথা, যানজট হ্রাসে অতি দ্রুত প্রাইভেটকার ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে বাসের যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধিতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

kamrul_sub@hotmail.com

মন্তব্য করুন