স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শুধু স্বাস্থ্য পরিষেবা বিভাগ এবং এর এজেন্সিগুলোর কাছে স্বাস্থ্যের বিষয়াদি সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করি। স্বাস্থ্যসেবার মহাপরিচালক ছাড়া আরও যে সংশ্নিষ্ট মহাপরিচালকরা আছেন তারা হলেন চিকিৎসা শিক্ষার মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঔষধ প্রশাসনের মহাপরিচালক। ক্রয় ও সংগ্রহ সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো কেন্দ্রীয় ওষুধ ভান্ডার ও ডিপোর পরিচালকের পদ। এর মধ্যে কিছু দপ্তরের অযোগ্যতা এবং ক্রয় ও সংগ্রহ সম্পর্কিত স্বেচ্ছাকৃত দুস্কৃতি সাধারণ মানুষের নজরে আসে সহজে। অন্য পরিচালকরা ভাগ্যবান; তারা সাধারণত জনপ্রিয়তার স্ক্যানারের আওতায় আসেন না। কারণ তাদের কাজ জনগণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়।

ক্রয়ের ক্ষেত্রে নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা

এখানে এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি না যা স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রে ঘটে। আলোচনা শুধু স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখছি। লর্ড জন এডওয়ার্ড অ্যাক্টনের এক মন্তব্য- 'ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে এবং চরম ক্ষমতা চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে।' কিছু লোককে সহজেই কেনা যায়, যেহেতু তারা অর্থের জন্য তাদের প্রলোভনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দৃশ্যত যাদের সম্মান ও আত্মবিশ্বাসের পরিবেশে বড় করা হয়নি, তাদের কেনা তুলনামূলক সহজ। মাত্র কিছু মানুষ আছেন যারা টাকার কাছে মাথা নত করেন না; তাদের কোনোভাবেই কেনা যায় না।

এটা বিশ্বাস করা ভুল হবে, নির্মাণের কাজগুলো খুবই পবিত্র এবং লেনদেনের কলঙ্ক দ্বারা আবৃত নয়। নির্মাণকাজের লেনদেনে অনেক কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং কাজ সম্পর্কিত চুক্তির অনিশ্চয়তার ফাঁকে ক্রেতা বা ব্যবহারকারীকে বোকা বানানো সহজ হয়। কারণ তারা প্রকৌশলী নয় এবং নির্মাণের মাপজোক বা কাঁচামালে কোথায় ভুল হচ্ছে তা বোঝা ও অন্বেষণ করার দক্ষতা তাদের থাকার কথা নয়। নির্মাণকাজে স্থানীয়ভাবে খুব সহজে এবং বেশ দ্রুত একটি অপবিত্র সমঝোতা বিকশিত হয়। যাতে থাকে নির্মাণকাজের স্থানীয় পরোক্ষ ব্যবহারকারী, সরাসরি ব্যবহারকারী, ক্রেতা ও নির্মাণকারী।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) সম্পূর্ণরূপে একটি শিল্প সম্পর্কিত সংস্থা। এটি টিকা, ডায়াগনস্টিকসহ ওষুধ উৎপাদন, আমদানি এবং রপ্তানির অনুমোদন, লাইসেন্স প্রদান ও নিবন্ধন করে। মন্ত্রণালয়ের এ বিভাগের অসততা যদি থাকে, বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অনুমান করা কঠিন নয়। চিকিৎসাসেবার জন্য পণ্য আমদানি, সরবরাহ বা রপ্তানি করার জন্য নামহীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া সহজেই সেই ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু পরিবেশ নির্মাতাদের অনুকূল করার জন্য শীর্ষস্থান থেকে অযৌক্তিক চাপকে এড়ানো কর্তৃপক্ষের জন্য কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়। আমদানিনির্ভরতায় অতি আগ্রহ আমাদের সন্দিহান করে তোলে।

সাম্প্রতিক সময়ে কভিড-১৯ সংক্রমণের মাধ্যমে নয়, আর্থিকভাবে সংক্রমিত কেন্দ্রীয় ওষুধ ভান্ডার ও ডিপো (সিএমএসডি) হারিয়েছে এর একজন সামরিক কর্ণধার; যিনি তার বদলি ও মৃত্যুর আগে মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছিলেন; তার পূর্বতন দপ্তরের নিয়ম-কানুনবহির্ভূত কার্যক্রমের গোড়ায় কারা এবং কেন সে সম্পর্কে। এর পরিণতি কী হয়েছে বা হবে তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষায় আছি।

সরকারি ক্রয় ও সংগ্রহ পদ্ধতি

প্রথমে ব্যবহারকারী দপ্তর ক্রয়কারী সংস্থাকে (এইচইডি/ডিজিডিএ/সিএমএইচডি) নির্মাণ, সেবা বা পণ্যের ধরন, পরিমাণ এবং স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করে এসব সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করে। ক্রয়কারী সংস্থা নিজেরাও স্পেসিফিকেশনে আরও সূক্ষ্ণতা আনতে পারে। মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, অনুরোধকারী বা ব্যবহারকারী এবং প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্বসহ একটি ক্রয় কমিটি ক্রয়ের তালিকা চূড়ান্ত করে। একটি দরপত্র কমিটি তখন সম্ভাব্য দরদাতাদের বা সরবরাহকারীদের প্রথমে তাদের আগ্রহ প্রকাশের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তারপর যোগ্যতা যাচাই করে তাদের একটি তালিকা তৈরি করে। দরপত্র কমিটি সরাসরিও দরপত্র প্রদানের প্রস্তাবপত্রের আলোকে দরপত্রদাতাদের দরপত্র প্রদানের অনুরোধ করতে পারে। একটি মূল্যায়ন কমিটি তখন ওই প্রস্তাবপত্রের আলোকে দরদাতা চূড়ান্ত করে। মূল্যায়ন কমিটি সেবা, নির্মাণ বা পণ্যের বাজারমূল্যের সঙ্গে তুলনা করে নির্বাচিত সরবরাহকারীকে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের জন্য কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করে। ক্রয়কারী সংস্থা কার্যাদেশ দেওয়ার আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বাজারদরের আলোকে সেবা, পণ্য বা নির্মাণকাজ সরবরাহের অনুরোধ করতে পারে। সরবরাহকারী রাজি না থাকলে দরপত্র বাতিল করা যায়। অন্য একটি কমিটি প্রস্তাবিত স্পেসিফিকেশনের ওপর ভিত্তি করে সরবরাহকৃত সেবা, নির্মাণকাজ বা পণ্য পর্যালোচনা এবং তা গ্রহণের সুপারিশ করে। এসব কমিটির সদস্যদের একে অপরের থেকে স্বাধীন থাকার কথা, যাতে একটি কমিটি পরবর্তী স্তরের কমিটিকে প্রভাবিত করতে না পারে। এত ব্যবস্থা সত্ত্বেও ক্রয়কারী সংস্থাকে বিভিন্নভাবে বোকা বানানো হয়। প্রকৃতপক্ষে কিছু অসুস্থ উদ্দেশ্য প্রথম ধাপ থেকেই শুরু হতে পারে, যখন অনুরোধকারী বা ব্যবহারকারী দপ্তর একটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারী বা উৎপাদককে অনুগ্রহ করার চেষ্টা করে এবং পছন্দসই সরবরাহকারীর উপযোগী করার জন্য তার অনুরোধকৃত স্পেসিফিকেশন প্রস্তুত করে। এ ছাড়া বিভিন্ন কমিটির সদস্য বা সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য অন্য সদস্যদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। উচ্চতর দপ্তরের চাপও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভুল প্রক্রিয়াকরণের কিছু দৃষ্টান্ত

জেএমআইর এন-৯৫ মুখোশ সরবরাহের বিষয়টা আমাদের স্মৃতিতে এখনও তাজা। কিন্তু মানুষ যা খুব কমই জানে তা হলো, শুরুতে একই সরবরাহকারী কর্তৃক সার্স-সিওভি-২ নমুনা সংগ্রহ সামগ্রীর নিম্নমান। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরবরাহকারীদের নির্বাচন, বিভিন্ন কমিটি গঠন না করে এবং পণ্য গ্রহণ না করেই মূল্য প্রদান, অকল্পনীয় মূল্যে সেবা, পণ্য বা নির্মাণকাজ ক্রয় করার কল্পনাতীত অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফলাফল দেওয়া হয়েছিল পরীক্ষা না করে; লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালগুলো কভিড-১৯ পরিষেবার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল মন্ত্রী ও সচিবদের উপস্থিতিতে। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই চুক্তির শর্তের বাইরে অর্থ প্রদান হয়েছে কার ইঙ্গিতে, জানা যায়নি।

স্বাস্থ্য খাতে এ ধরনের অভিজ্ঞতার উৎপত্তি সম্ভবত বছর কুড়ি আগে থেকে। সেবা পর্যায়ে প্রয়োজন না থাকলেও যন্ত্রপাতি কেনা হয়। ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকলেও সেবা বা নির্মাণকাজ কেনা হয়। চাপের মুখে সেবাপ্রান্ত থেকে সেবা, নির্মাণ, পণ্যের প্রয়োজনীয়তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অন্যথায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অন্যত্র বদলির হুমকি বা অন্য কোনো কম গুরুত্বপূর্ণ ও কম সম্মানজনক পদে বদলি করা হয় বলে জনশ্রুতি আছে। অনেক ভালো ও সৎ কর্মকর্তা অসম্মানজনকভাবে তাদের চাকরি হারিয়েছেন শুধু এ কারণে, তারা শক্তিশালী স্তরের অলিখিত এবং কথ্য সিদ্ধান্তগুলোকে অন্যায্যভাবে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছিলেন।

যেসব বেআইনি কাজ হয় তা অধিদপ্তর বা নিম্নতর স্তরে স্বাধীনভাবে ঘটে; এসব মনে করার কোনো কারণ নেই। পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শক্তির আশীর্বাদ না থাকলে এত ব্যাপক পরিমাণ ও সংখ্যায় পচন ঘটতে পারে- এটা বিশ্বাস করা কঠিন। দুর্নীতি দমন কমিশন মাঝেমধ্যে পরাবাস্তব পর্যায়ে কাজ করে। যে কারণে সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারে, সুতা টানার কারণে এসব হচ্ছে।

এসব অপরাধ বন্ধের উপায়

সঠিক লোক অনুসন্ধান এবং তাদের সঠিক পদে বসানো ও বহাল রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে সঠিক মানুষ খুঁজে বের করা যায়? একজন কর্মকর্তার অতীতে স্বচ্ছতার চর্চা, আত্মসম্মানবোধ, কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত। প্রয়োজনে পদায়নকৃত কর্মকর্তাদের ক্রয়-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু এসব গুণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এ ধরনের কর্মকর্তা কোনো অযৌক্তিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। তাই মাঝেমধ্যে এটা দেখতে পাওয়া আশ্চর্যজনক নয়, ঠিক বিপরীত ধরনের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হচ্ছে।

সব সরবরাহের ক্ষেত্রেই মূল ব্যবহারকারীর প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক করা উচিত। হ্যাঁ, এটি দুর্নীতির আরেকটি ধাপ তৈরি করতে এবং স্থানীয় শক্তির উৎস মূল ব্যবহারকারীদের ক্রয়ের উপযোগিতা প্রত্যয়িত করতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু শেষ ব্যবহারকারীরা সরাসরি সেবা প্রাপক, উপকারভোগী বা সম্প্রদায়গুলোর কাছাকাছি থাকেন। তাই প্রত্যয়নকারী কর্মকর্তাদের সহজে এবং সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করার একটা সুযোগ তৈরি হয়, যা তাদের বৈধ সনদ প্রদানে চাপ সৃষ্টি করবে। পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা এবং পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন ইত্যাদির ওপর জোর দেওয়া বা এ জাতীয় অন্যান্য ব্যবস্থা গৌণ এবং প্রত্যাশিত স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে না।

ন্যায়বিচার প্রদানকারী বা নিশ্চয়তাকারীদের উচিত এ কথাগুলো মনে রাখা এবং বিশ্বাস করা- 'ন্যায়বিচার অন্ধ' বা 'বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে ন্যায়বিচার অস্বীকার করা' এবং 'ন্যায়বিচার করলেই হবে না, সেটা দৃশ্যমান হতে হবে'। এসব নীতির অনুশীলন দুস্কর্ম প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে, আশা করা যায়।

রোগতত্ত্ববিদ; বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কার্যকরী দলের সদস্য

মন্তব্য করুন