২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে দেওয়া তার ভাষণে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার কূটনীতিতে নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের সবখানের পিছিয়ে পড়া জনপদকে তুলে ধরার জন্য তার উন্নয়ন শক্তিকে নিয়োজিত করছে। গণতন্ত্র সুরক্ষায় সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করছে। জো বাইডেন বলেন, উন্নয়ন, অগ্রগতি, স্বাধীনতা, সাম্য- এসব মূল্যবোধ 'জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের ডিএনএতে প্রোথিত'। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মানবতা, মানবিক মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে বলেই আমেরিকানরা একতাবদ্ধ হয়ে বিশ্বসভায় থাকতে পারছে।'

সন্দেহ নেই, বাইডেনের এ ভাষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোধ হয় তার আগে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এমনভাবে তার ও জনগণের চিন্তার সমন্বয় করে বক্তব্য উপস্থাপন করেননি জাতিসংঘে। বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন চিন্তার স্পর্শ লেগেছে কিংবা সেই চেতনায় অন্য কিছু যোগ হয়েছে। সেই অন্য কিছু খোঁজার আগে বাইডেনের ভাষায় 'পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য' তার উন্নয়ন শক্তিকে নিয়োজিত করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন শক্তি যে বিপুল শক্তির অধিকারী, তা পৃথিবীর ধনী-গরিব সব দেশই জানে ও বোঝে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেই শক্তি গরিবদের জন্য কখনোই ব্যাপকভাবে কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য ব্যয় হয়নি বা স্বার্থহীনভাবে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা দেয়নি। দিলে আজ তাকে বলতে হতো না পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া জনগণের কথা।

গরিব বিশ্বের দেশগুলো সব সময় শঙ্কিত থাকে- কখন তারা আমেরিকান রাজনৈতিক কূটনীতির প্যাঁচে আটকে যায়। এই ভয়কে জয় করে এমন কোনো দেশ নেই। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক- ফ্রান্সের সঙ্গে সাবমেরিন নির্মাণের যে চুক্তি করেছিল অস্ট্রেলিয়া, তা বাতিল করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন প্রযুক্তি হস্তান্তর করে অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু সামরিক শক্তির দেশে পরিণত করতে যাচ্ছে। তারা ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকার জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় সামরিক নিরাপত্তা জোট গড়ে তুলেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র [এইউকেইউএস- অকাস] মিলে অস্ট্রেলিয়ার এডিলেডে সাবমেরিন ডকইয়ার্ড নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এর অবকাঠামোগত বিষয় সম্পন্ন এবং পরবর্তী ২০৪০ সালের মধ্যে তারা পরমাণু শক্তিধর দেশের অধিকারী হবে।

এই যে ফ্রান্সকে কোনো আগাম তথ্য না দিয়েই, চুক্তি বাতিলের কথা না জানিয়ে অস্ট্রেলিয়া শর্ত ভঙ্গ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সাধারণ ভদ্রতা এটাই যে, চুক্তি ভেঙে দেওয়ার আগে তা সংশ্নিষ্ট তরফকে জানানো। অস্ট্রেলিয়ার এ আচরণ শোভন নয়। কিন্তু এ নিয়ে ফ্রান্স তেমন প্রতিক্রিয়া জানায়নি। শুধু বলেছে, এটা পেছন থেকে আঘাত করার শামিল। ফ্রান্স হয়তো আরও কঠিন কোনো পদক্ষেপ নিত, কিন্তু নেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের কারণে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে জোটভুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আর দোসর যুক্তরাজ্য। উন্নত দেশ এবং ন্যাটোর অন্যতম শক্তিশালী দেশ ফ্রান্স। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র তোয়াক্কা করেনি। কারণ দুটি, অকাস জোট করার পেছনে আছে ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা বিধানের টোপ আর চীনের সম্প্রসারণশীল সামরিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর সামরিক হুমকির নিশান ওঠানো। ফলে ফ্রান্স কিছুই বলেনি। ফ্রান্স যেখানে কোনো প্রতিবাদেও কণ্ঠ জোরালো করেনি, তখন দরিদ্র দেশের কী অবস্থা হবে, তা বলাই বাহুল্য।

যুক্তরাষ্ট্রের এই রাজনৈতিক সামরিক চিন্তা ও পদক্ষেপের পর ধারণা করি, জো বাইডেন তার নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের যে বাণী দিয়েছেন, তা তিনি মিনিংফুল করতে চেষ্টা করবেন। কেননা, বাইডেনের ভাষায়, তার দেশ ও জাতিসংঘ একই ডিএনএতে প্রোথিত। জাতিসংঘ বিশ্বপরিবারের সংগঠন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী ও সামরিকভাবে দুর্ধর্ষ দেশের সঙ্গে পৃথিবীর গরিব দেশও সদস্য। জাতিসংঘ চায়, পৃথিবীর সব দেশেরই রাজনৈতিকভাবে ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্র নয়, সাম্যময় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম হোক। তাহলে সেসব দেশের সার্বিক উন্নয়নে গতি আসবে। এ-টু-জেড, আপামর জনগণ মৌলিক অধিকারগুলো পাবে- এটাই সবার প্রত্যাশা। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যেমন তাদের মৌলিক অধিকার ভোগ করে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর মানুষও ভোগ করতে পারত, যদি কথিত উন্নয়ন ঘটত। না, তেমনটি ঘটেনি। কারণ, ধনী দেশগুলোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে নিজেদের আরও শক্তিশালী করে তোলো- এই নীতি। আর সেটা করতে গিয়ে তারা পৃথিবীর বহু জায়গায় এমন সব নৃশংস ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, যা ঘৃণার সংস্কৃতি তৈরি করেছে। এমনকি বাইডেনের দেশেও সাদা আর কালো মানুষের মধ্যে যে বর্ণবাদ মাথা তুলেছে, যার শক্তিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হলেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে চার বছর সেই ঘৃণার কেবল চাষই করেননি তিনি, মানুষের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক পার্থক্যকেই রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। ট্রাম্প পৃথিবীর যে ক্ষতি করেছেন মানুষের অন্তরে বাস করা বর্ণবাদ আবিস্কার এবং তা ছড়িয়ে দিয়ে, সেই অদৃশ্যপ্রায় ক্ষত কবে মুছে যাবে, বলা কঠিন।

যখন রাষ্ট্রনৈতিক স্তরে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক ওয়্যারহেড বহনকারী সাবমেরিন নির্মাণের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তখন কি তার মুখে এ কথা মানায়- তিনি কূটনীতির নতুন যুগের সূচনা করেছেন? এটা অনেকটাই বিপরীত চেতনার কাজ বলে মনে হয়। তাহলে কি জাতিসংঘে বলা বাইডেনের কথাগুলো 'মিথ্যার মুখোশ'-এ ঢাকা?

না, তাকে এই নতুন কূটনৈতিক ধারার সূচনার উদাহরণ তৈরি করতে হবে। পিছিয়ে পড়া জনপদের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের মতো আর কোনো এলাকা নেই। অশিক্ষা, মানবেতর জীবন, খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্য সমস্যার চরম দুর্বিষহ অবস্থায় পড়ে আছে। সেই মানবজীবনকে অর্থবহ উন্নতির শিখরে না হোক, মানবেতর লাইনের ওপরে তুলে নিয়ে আসতে বাইডেনকে অতিদ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, তিনি মানবতা, মানবিকতা আর মানুষের বাঁচার মৌলিক অধিকারকে সামনে তুলে এনেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির তুলনা নেই। তারাই সেই মানবতার কাজটি করতে পারে এবং এক নতুন ও মানবিক বিশ্বের নির্মাতা হিসেবে মানুষের বুকের ভেতরে বাস করতে পারে।

পিছিয়ে পড়া মানুষকে বাঁচার মৌলিক অধিকার দিতে চাইলে সবকিছুর আগে দিতে হবে খাদ্য। গম দিয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন না করে তা আফ্রিকার ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে তুলে দেওয়া হোক। দ্বিতীয় কর্তব্য হচ্ছে, তাদের সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন। তৃতীয় পদক্ষেপ হতে হবে শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এবং বস্ত্রের সরবরাহ বা সেসব দেশেই কর্মচঞ্চল শিল্পায়ন করা, যা হবে পরিবেশ দূষণমুক্ত টেকনোলজিতে সমৃদ্ধ শিল্পায়ন। পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি হস্তান্তর করে তাদের উন্নয়ন ধারায় অবদান রাখতে পারে।

শুধু কি পিছিয়ে পড়া জনপদ আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ? এশিয়ায় কি তা নেই? বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ অনেক দেশের কোটি কোটি মানুষ মানবেতর জীবনের ঘূর্ণিচক্রে পড়ে আছে। বাইডেন যদি তাদের উদ্ধার করতে চান, তাহলে তা হবে মানবতার সেবা। সেই সেবামূলক আন্তর্জাতিক কূটনীতির শুভ সূচনা হয়েছে বলে মনে করেন বাইডেন। কোনোরকম সামরিক আধিপত্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের এখন অতীতের সব দোষ-ত্রুটি মুছে ফেলার জন্য প্রয়োজন এই মানব-উন্নয়নে কাজ করা।

এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে- কোন কূটনৈতিক পররাষ্ট্রনীতি তারা গ্রহণ করবে এবং তার চর্চার ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় সাম্য-সমান্তরাল চেতনার বিকাশ করবে। নতুন পরাশক্তি হিসেবে খ্যাত চীনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থানের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি ও জবরদখলের কূটনৈতিক পরম্পরা। উত্তর ও দক্ষিণ চীন সাগর বা ইন্দো-প্যাসিফিকে নিরাপত্তা জোরদার করার নামে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তাকে আর যা-ই বলা হোক, তা পুরোপুরি চীনের বিরুদ্ধে সামরিক অবরোধের শামিল। একটি দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি এ ধরনের পদক্ষেপ তো নতুন করে কোল্ড ওয়ারের পটভূমি সৃষ্টি করছে। নতুন কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি যাতে আর না হয় বা না হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘকে সেই পথ অনুসরণ করতে হবে। একই রকম ডিএনএ-যুক্ত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ অবশ্যই মানবিক ও নৈতিক দিক থেকে যুদ্ধ ও আগ্রাসনবিরোধী অবস্থানে আসতে হবে। সেই সঙ্গে চীনকেও বুঝতে হবে- তার প্রতিবেশী দেশগুলোর দক্ষিণ চীন সাগরে যে পরিমাণ হিস্যা আছে, তাকে ওভারল্যাপিং করা যাবে না। 'নাইন ড্যাসের' ওই কাহিনি ভুলে যেতে হবে তাদের। রাজনীতিতে মানুষকে প্রধান করে তুলতে হবে, তা গণতান্ত্রিক বিশ্বেরই হোক বা স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী দেশের শাসনব্যবস্থাতেই হোক। 'মানুষ' যদি সব শাসনকর্তার চেতনার প্রথম ও প্রধান উপাদান হয়ে উঠতে পারে, তাহলে সম্পদের বণ্টনও সাম্য চেতনায় হতে পারে। খাদ্য বণ্টনের অসমতার দরুণই মূলত দেশে দেশে, সমাজের অভ্যন্তরে 'হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভনট'দের বিভাজন। এই চেতনার উৎখাতই মানুষের সার্বিক মুক্তির একমাত্র পথ বলে বিবেচিত হতে পারে।

কবি ও সাংবাদিক

মন্তব্য করুন