দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বয়ে আনে এক অনাবিল আনন্দ। সার্বজনীন এ দুর্গোৎসব শুধু বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ দুর্গোৎসব ঘিরে বাঙালির মধ্যে গড়ে ওঠে এক সৌহার্দ্য-প্রীতি ও মৈত্রীর বন্ধন। দেবী দুর্গা সব দেব-দেবীর সমন্বিতা পরমা শক্তি। অসুর দমনে যিনি চণ্ডী, শরণাগতদের কাছে তিনিই সাক্ষাৎ লক্ষ্মী-স্বরূপিনী; সিদ্ধি প্রদায়িনী জগন্ময়ী মা। ব্রহ্মাকে রক্ষা করার জন্য, জীবের দুর্গতি হরণ করার নিমিত্তে দুর্গা রূপ ধারণ করে আবির্ভূতা হন বলে তিনি দুর্গা। তিনি মাতৃ জাতির প্রতি করুণাময়ী বলে তাকে নারী মূর্তিতে কল্পনা করা হয়। আসলে তিনি নারীও নন, পুরুষও নন। বস্তুত তিনি এক ও অভিন্ন। জীব ও জগতের কল্যাণে জগন্ময়ী মা দেবী দুর্গা যে রূপ ধারণ করার প্রয়োজন মনে করেন, তিনি সেই রূপই ধারণ করেন।

দুর্গাপূজার কাহিনি শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে। চণ্ডী গ্রন্থে তিনটি খণ্ডে মোট ১৩টি অধ্যায় রয়েছে। এ গ্রন্থে আদ্যাশক্তি মহামায়ার সঙ্গে দোর্দণ্ড দানব অসুরদের সম্মুখযুদ্ধের বিবরণ বিধৃত। প্রখ্যাত দার্শনিক বৈষ্ণবাচার্য্য ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজির মতে, 'শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থ বিজ্ঞানসম্মত শাস্ত্র। বেদাদি শাস্ত্রের মহাসত্য চণ্ডী আধ্যাত্মিক পরীক্ষা অর্থাৎ সাধনার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করেছে।' চণ্ডীর প্রথম অংশে মধু কৈটব বধ, মধ্যম খণ্ডে মহিষাসুর বধ এবং উত্তর খণ্ডে শুম্ভু-নিশুম্ভু বধের কাহিনি বর্ণিত। প্রচীনকাল থেকেই সনাতন ধর্মে বৈদিক ও তান্ত্রিক নামে দুটি ধারা প্রচলিত। তান্ত্রিক ধারার পরিপূর্ণ রূপায়ণ ঘটেছে শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে।

সত্য যুগে রাজা সুরথ রাজ্যচ্যুত হয়ে বনে আশ্রয় নেন। সাংসারিক জ্বালা-যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজা সমাধি-বৈশ্যও বাড়ি ছেড়ে বনে চলে আসেন। উভয়েই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে ঋষি মেধষ মুনির শরণাপন্ন হন। সত্যদ্রষ্টা মুনিবরের পরামর্শে তারা দুর্গতিনাশিনী দুর্গা দেবীর পূজা করেন। তবে এ পূজা বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে এ পূজাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে সংহার করে সীতা দেবীকে উদ্ধারে যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন, এ দুর্গাপূজাই শারদীয় দুর্গোৎসব হিসেবে প্রচলিত। শ্রীরামচন্দ্রের শরৎকালের এ অকাল বোধনই হলো বর্তমানকালের শারদীয় দুর্গোৎসব। হেমন্ত ঋতুতেও মা দুর্গার আগমন ঘটেছিল, যা কাত্যায়নী দুর্গাপূজা নামে খ্যাত।

মা ব্রহ্মময়ী। আদ্যাশক্তি অপরূপ শোভামণ্ডিত ত্রিনয়না। অনিন্দ্য সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক। সর্বালংকারে ভূষিতা দেবী দুর্গা। তিনি সর্বশক্তির আধার। মাতৃরূপে তিনি সর্বজীবে বিরাজ করেন। দশভুজা মা দুর্গার দশটি হাতে দশটি অস্ত্র শোভমান। ডান হাতে ত্রিশূল, খÿ ও চক্র। বাঁ হাতে শঙ্খ, ঢাল, কুঠার ও ঘণ্টা। মা দুর্গা কৈলাস থেকে মর্ত্যলোকে একা আসেননি। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন জ্ঞানের প্রতীক দেবী সরস্বতীকে। তার বাহন সাদা হাঁস, যা জ্ঞানের নির্মল ও শুভ্রতার নিদর্শন। সঙ্গে এনেছেন 'ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা' ঐশ্বর্যের প্রতীক লক্ষ্মী দেবী। সঙ্গে আরও রয়েছেন জনশক্তির প্রতীক 'সিদ্ধিদাতা' গণেশ। সঙ্গে এসেছেন আত্মরক্ষা, শত্রু দমন ও বলবীর্যের প্রতীক কার্তিক। প্রতিটি শক্তির সমষ্টিরূপে দেবী দুর্গার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে শ্রীরামচন্দ্রের অকাল বোধনে।

পূজা হলো শক্তির প্রতীক। দেব-দেবীর কৃপালাভের জন্য ভক্ত তার অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভক্তি সহকারে দেবতার উদ্দেশে যে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন তা-ই পূজা বা উপাসনা। দেবতার প্রতীক হিসেবে প্রতিমা পূজা হিন্দু ধর্মে প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। হিন্দুরা মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে চিন্ময়ী জ্ঞানে পূজা করেন। তবে সেটা পুতুল পূজা নয়।

ভক্তের হৃদয়ের অকৃত্রিম ভক্তি ও শ্রদ্ধায় মৃন্ময়ী মূর্তি চিন্ময়ী হয়ে ওঠে। তাই হিন্দুরা নিছক মাটিতে তৈরি মূর্তিকে পূজা করেন, বলা ঠিক নয়। কালবিজয়ী প্রবাদপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়- 'পুতুল পূজা করে না হিন্দু কাঠ মাটি দিয়ে গড়া/ মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরে যাই আত্মহারা।'

১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'ভারতবর্ষে মূর্তি পূজা বলতে ভয়াবহ একটা কিছু বোঝায় না। ইহা উচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবধারণার উপায় মাত্র।' সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঈশ্বরের মাতৃভাব এবং পিতৃভাব উভয়কেই বিশ্বাস করেন। দুর্গাপূজা শুরু হয় দেবীপক্ষে। মহালয়ার পূর্বের ১৫ দিন পিতৃপক্ষ। মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষের শেষ এবং দেবীপক্ষের শুরু। পিতৃপক্ষের শেষ দিনে হিন্দুরা তাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার কল্যাণে তপর্ণ অর্থাৎ পিণ্ডদান করেন।

প্রতি বছর আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষীয় মহাষষ্ঠীর পুণ্য তিথি থেকে শুরু হয় দুর্গাপূজা। মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী তিথিত্রয়ে আরাধনা শেষে বিজয়া দশমীতে মা দুর্গা বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটে। তবে মৃন্ময়ী মূর্তির বিসর্জন হলেও ভক্তের হৃদয়ে চিন্ময়ী সত্তা চিরঅম্লান চিরভাস্বর। শক্তির জাগরণই মাতৃবন্দনার আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য। শক্তি 'স্বয়ম্ভু', 'স্বপ্রকাশ'। আদ্যাশক্তি মহামায়াই মহাশক্তির বিচিত্র প্রকাশ মাত্র। শক্তিই চৈতন্যের লক্ষণ। প্রাণ বা শক্তিহীন ব্যক্তি শবদেহ মাত্র। তাই প্রাচীন ঋষিগণ সর্বশক্তিমান পরমেশ্বরের শুভশক্তির প্রতীক হিসেবে জ্যোর্তিময়ী দেবী দুর্গার আরাধনা করতেন। এ যুগেও সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তবৃন্দ তাদের হৃদয়ের অর্ঘ্য নিবেদন করে আনন্দময়ী মা দুর্গার অর্চনা করেন। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে শক্তির অস্তিত্ব সর্বত্র বিদ্যমান। সনাতন ধর্মের ঋষিগণও শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করেন। তবে উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বৈজ্ঞানিক বিশ্বের সব বস্তুতে শক্তির প্রকাশ অবলোকন করেন। আর ঋষিগণ বিশ্বাস করেন সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতি একটি মহাশক্তি। বৈজ্ঞানিক এ শক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করেন। আর সনাতন ঋষি ও আধ্যাত্মিক পুরুষরা এ শক্তিকে জীব ও জগতের হিতার্থে অর্চনা করেন। ঋষিগণ সর্বশক্তির আধার মহামায়ার মধ্যে মাতৃস্নেহ দর্শন করেন। তাই তারা শক্তিকে ব্যবহার না করে পরম শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে বিশ্বের কল্যাণার্থে অর্চনার পথ বেছে নিয়েছেন।

বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নতির যুগে মানুষ জড়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বৈজ্ঞানিক ও আর্যঋষিগণ মহাশক্তির অস্তিত্ব সম্পর্কে একমত। উভয়েই বিশ্বাস করেন, মহাশক্তির নিয়ন্ত্রণাধীনেই সারাবিশ্ব। তবে এ শক্তিকে সমগ্র মানব জাতির কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। শক্তির অপরিকল্পিত ব্যবহার কল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। হিংসাশ্রয়ী শক্তি প্রয়োগে মুহূর্তের মধ্যে গোটা বিশ্ব নিশ্চিহ্ন হতে পারে। তাই শক্তি ব্যবহারে কল্যাণকর মানসিকতা থাকতে হবে। অধুনা দুর্গাপূজার বাহ্যিক আড়ম্বর বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্রাস পেয়েছে পূজার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিকতা।

বহিরাঙ্গের উৎসব আয়োজনে প্রতিযোগীদের অহংকার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বিনিষ্ট হয়েছে দেবীর মাহাত্ম্য। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তিপূর্ণ গানের পরিবর্তে আজ শোনা যায় কুরুচিপূর্ণ অশালীন সংগীত পরিবেশনা। আমাদের ভুললে চলবে না, দুর্গাপূজা শুধু বাহ্যিক আড়ম্বর অনুষ্ঠানের পূজা নয়। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং শক্তি অর্জন করাই এ পূজার প্রধান উদ্দেশ্য। জাত-পাতের অভিশাপ হিন্দু সমাজকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলেছে। জাতিভেদ, বর্ণভেদ, কৌলীন্য প্রথা প্রভৃতি হিন্দু সমাজকে করে তুলেছে দ্বিধাবিভক্ত।

আজ দুর্গাপূজার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে বহিরাঙ্গের উৎসব ও আয়োজন মুখ্য হয়ে উঠেছে। মানুষ নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে জড়বাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। ফলে মানুষ স্বল্প সময়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয়ে বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হচ্ছে। সবাই যেন প্রাচুর্যের পাহাড় গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ! তাই আজ সমাজ-জীবন থেকে এ দুর্গতি বিনাশ করার জন্য মা দুর্গার আশীর্বাদ অপরিহার্য। জীবমাত্রেই ঈশ্বরের প্রতীক। দেবী দুর্গা শাশ্বত সত্য ও শান্তির প্রতীক। যে শান্তির কাছে 'পরাভূত হয় দানব, মুছে যায় তমসা; প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য, সুন্দর ও শান্তি।' আমার অস্তিত্ব ঈশ্বরের অস্তিত্ব। ঈশ্বরের সত্তাই আমার সত্তা- এ দৃঢ় বিশ্বাস মনে রেখে যিনি ঈশ্বরের উপাসনা করেন, তিনিই প্রকৃত ভক্ত ও সাধক।

তাই আসুন, দুর্গোৎসবের এ শুভদিনে আমরা হিংসা-বিদ্বেষ, পরনিন্দা ভুলে যাই। আদ্যাশক্তি মহামায়ার করুণালাভে হই উজ্জীবিত। হিংসার আস্ম্ফালন ও মূল্যবোধের অবক্ষয় দূর করে আমরা আত্মশক্তিতে বলীয়ান হই। আমাদের অঙ্গীকার হোক- আদ্যাশক্তির আশীর্বাদে আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে এক সুখী ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলি। যেখানে থাকবে না মানুষে মানুষে কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ। মানুষের অহংসত্তার গভীরে যে শাশ্বত, বিশ্বজনীন মানবসত্তা রয়েছে, তা দেবী দুর্গার আশীর্বাদে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রস্ম্ফুটিত করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তুলি। জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতা দুর্গা আমাদের সহায় হোন।

মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবী; সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ফরিদপুর জেলা শাখা

মন্তব্য করুন