হঠাৎ করেই তেল ও ডিজেলের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হলো। আগেও এভাবে অনেক কিছুর মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি সাধারণ মানুষের জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'র মতো। এমনিতেই জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহ করতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। তেল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আমাদের দেশের কৃষকদের ওপর। ফসলের ক্ষেতে সময়মতো প্রয়োজনীয় সেচ প্রদানের খরচ বেড়ে যাবে। বৃদ্ধি পাবে উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের খরচ। ইতোমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও শাকসবজির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। আবার পুষ্টিকর খাদ্য ক্রয়ের সামর্থ্যও অধিকাংশের থাকে না। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো কমে যায়। বাল্যবিয়ে বেড়ে যায়। অসুখে-বিসুখে চিকিৎসা করার খরচের টাকা মানুষের হাতে থাকে না। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি আর মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকতে পারছে না। নিঃশব্দে তারা আয়ের কারণে শ্রেণিচ্যুত হচ্ছে।

কভিড ১৯-এর সময় থেকে বাংলাদেশে দ্রুত দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এ সম্পর্কিত ২০২০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের গবেষণায় দেখা যায়, দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামে এখন দারিদ্র্যের হার অধিক। গবেষণায় আরও তথ্য উঠে এসেছে- রংপুর, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে দারিদ্র্যের হার। সানেম ব্যতীত আরও কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণাকৃত তথ্যেও উচ্চ দারিদ্র্য হারের তথ্য উঠে এসেছে। গত বছর লকডাউনের সময় গণপরিবহনের ৫০ লাখ শ্রমিক একযোগে কর্মসংস্থান হারিয়েছিল। এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো বাংলাদেশে পড়েছে।

তবে দারিদ্র্য সব জায়গাতেই বেড়েছে। আগে মাদারীপুর জেলার অন্তর্গত রাজৈর উপজেলার গোপালগঞ্জ গ্রামে যারা বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাত, তাদের অনেকে এখন ঢাকা শহরে চলে গেছে কাজের খোঁজে। এখানে গার্হস্থ্য কাজে সাহায্যকারী রাখার লোকও কম। ধান-পাট উঠলে তখন লোকের দরকার হয়। ধান ওড়ানো, সিজানো ও শুকানোর কাজে। কিন্তু সারাবছর করার মতো কাজ গ্রামে কমই থাকে। গ্রামের কাজে খাটনি বেশি, টাকা কম। শহরে বাসাবাড়ির কাজে কালিঝুলি কম। একেকটা কাজে টাকা বেশি। অনেকে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যেতে চায়।

করোনাকালে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক নিত্যদিনের শ্রমিক-মজুর কর্মহীন হয়ে পড়ে। গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, তারা খাদ্য নিরাপত্তায় ভোগে ৭০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ এক বেলা-দুই বেলা খেয়ে বাঁচে। এই সময়ে শহরের বস্তির মানুষ ও পথের পাশে ঘুমানো মানুষদের মধ্যে অনেক সংস্থা অর্থ সাহায্য নিয়ে খাবার বিতরণ করেছে। কিন্তু গ্রামের মানুষদের এভাবে উপকার করার সুযোগ ছিল কম। তবুও করেছে মানুষ।

করোনাকালে ২০২০ সালে শুধু তৈরি পোশাকশিল্পে সাড়ে তিন লাখের বেশি কর্মী বেকার হয়ে পড়ে। প্রবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এই বেকারত্বের সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ কর্ম হারায়। বর্তমান সরকার অতীতে যতখানি দারিদ্র্য হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছিল, এখন তা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরকারি কোনো তথ্যে বাংলাদেশের বর্তমান দারিদ্র্যের হার কত- তা পাওয়া যায়নি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকার অর্থবরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। ভাতাভোগীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে এর চেয়ে অনেক বেশি।

গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ভারসাম্যময় উন্নয়নের পথে এগোনোর বার্তা দেয়। বৈষম্য কমিয়ে ভারসাম্যময় উন্নয়নের রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ পরিকল্পনাকারীদের স্মরণ করিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষকে সতর্ক হতে বলে- যাতে আরও চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হয়ে না পড়ে।

দারিদ্র্যের উচ্চহার বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে। দারিদ্র্য হ্রাস করে ভারসাম্যময় উন্নয়নের জন্য নতুন করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের সব স্তরের দুর্নীতি শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে। ডিজেল ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি না করে কৃষকদের নতুন করে বিপদে ফেলার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি দ্বিতীয় চিন্তাতে রাখা হোক। কৃষি থেকে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা বেশি আয় না হলেও কৃষিক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত অধিকসংখ্যক সাধারণ নারী-পুরুষ সক্রিয়ভাবে জড়িত। তাদের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে তারা চিন্তিত। কৃষক কীভাবে বাঁচবে, দেশের সাধারণ মানুষ কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহের খরচ চালাবে অর্থাৎ জীবিকার ব্যবস্থা করবে, তা ভাবুন। সরকার তাদের বাঁচানোর চিন্তাকে আরও প্রাধান্য দিন। জোরালো করা হোক রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

নারী নেত্রী

মন্তব্য করুন