পত্রিকার পাতায় যখন আমরা রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধির সুসংবাদ পাই তখনই কেবল আমাদের প্রবাসী ভাইবোনদের কথা মনে পড়ে। আনুমানিক ১৩ লাখ বাংলাদেশি বর্তমানে অস্থায়ী ও স্থায়ী অভিবাসী হিসেবে বিশ্বের প্রায় ১৬২টি দেশে বসবাস করছেন। হাজার মাইল দূরে থেকেও তারা প্রতিনিয়ত দেশের কথা মনে করেন। অভিবাসী সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ষষ্ঠ শীর্ষস্থানে রয়েছে। এসব অভিবাসী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন দেশে নানা পেশায় তাদের দক্ষতা ও মেধার পরিচয় দিয়ে আসছেন। মাতৃভূমির জন্য কিছু করার সুযোগ পেলে তারা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা দেশের কল্যাণে এবং স্বদেশে বসবাসকারী নিজ পরিবার, বন্ধুবান্ধব সর্বোপরি দেশের মানুষের টানে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে থাকেন, যার অধিকাংশই অজানা। যেমন- অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা ৫০ মিলিয়ন ডোজ করোনার টিকা বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য অস্ট্রেলিয়ার সংসদ বরাবর আবেদন করেন। এ দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে অনুসরণীয়। আবার সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে 'দি লাস্ট মার্সেনারি' নামক ফরাসি চলচ্চিত্র প্রচার করা হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাককে কটাক্ষ করে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। আমরা লক্ষ্য করেছি, আমাদের প্রবাসী ভাইবোনরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিজিএমইএ ইতোমধ্যে এর বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করেছে।

আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভাইবোনেরা অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠিয়ে শুধু তাদের পরিবারকেই সহায়তা করছেন না; দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন। যেখানে করোনার মহামারির প্রাদুর্ভাবে সমগ্র বিশ্বে প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব বিরাজ করছে, সেখানে বাংলাদেশ বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছে, যা সর্বোচ্চ। এর মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমদানি বিল মেটানো, বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষার মতো জরুরি বিষয়গুলোর জন্য রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, প্রবাসীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী; অনেকেই রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য হয়েছেন। কেউবা আবার স্বনামধন্য শিক্ষক কিংবা চিকিৎসক। অনেকের আবার প্রবাসে রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ।

তাছাড়া অনাবাসী বাংলাদেশি অনেকেরই দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দু'জন প্রবাসী নারীর কথা না বললেই নয়, যাদের কারণে বাংলাদেশি হিসেবে আমরা গর্বিত। তাদের একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সাদিয়া খানম, যিনি কভিড-১৯ মোকাবিলায় যুগান্তকারী রোগ-জীবাণু ধ্বংসকারী স্প্রে 'ভলটিক' উদ্ভাবন করেছেন। কিশোয়ার চৌধুরী নামে আরেকজন নারী যিনি মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়াতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। এ ধরনের সাফল্য শুধু তাদের ব্যক্তিগত সুখ্যাতিই এনে দেয়নি, বরং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে। এই বিপুল প্রবাসী জনগোষ্ঠী, যারা একাধারে মেধাবী, পরিশ্রমী ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, তাদের সম্মিলিত শক্তি আমাদের জন্য অনন্য সুযোগ, যা আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত আমাদের বাংলাদেশি মিশন আরও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে পারে।

এ ছাড়া বিনিয়োগ ও দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং আরও করতে পারেন। উল্লেখ্য, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, কিন্তু আমাদের বাজার শেয়ার মাত্র ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের সম্ভাবনা অপরিসীম। যদিও বাংলাদেশ প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প বিশেষ করে নিট ফেব্রিক্সে সফলতা অর্জন করেছে, কিন্তু ওভেন টেক্সটাইলে এখনও পিছিয়ে। ভবিষ্যতে পোশাক খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমরা কৌশলগতভাবে যেসব সম্ভাবনার জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছি, তার মধ্যে একটি হচ্ছে বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশেষ করে বস্ত্র খাতে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনীয় পণ্য উৎপাদন। এই পণ্য বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে আমরা নন-কটন বস্ত্র খাতে বা ম্যান-মেইড ফাইবারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ আমরা মনে করি, ভবিষ্যতে এই খাতে পণ্যের বাজার চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি কাঁচামালের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে। এসব সম্ভাবনাময় খাতে নিজেরা বিনিয়োগ এবং নিজ নিজ দেশ থেকে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারলে একদিকে যেমন দেশ উপকৃত হবে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও লাভবান হবেন।

বস্ত্র ছাড়াও অন্যান্য খাত যেমন- তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, পাট, চামড়া, ওষুধ, সিরামিকস, রপ্তানিমুখী বাইসাইকেল, জাহাজ নির্মাণ প্রভৃতি খাতে প্রবাসী বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিনিয়োগের আদর্শ ক্ষেত্র। বর্তমানে বাংলাদেশে খুব অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই এআইভিত্তিক প্রযুক্তি, তথ্য (ডাটা) বিশ্নেষণ এবং বিজনেস ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগে অত্যন্ত আকর্ষণীয় খাত। অনাবাসী বাংলাদেশি যারা বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন, তারা এ খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যামে বাংলাদেশের মানবসম্পদকে একটি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেন।

যেহেতু, বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের দিক থেকে সুবর্ণ সময় অতিক্রম করছে, তাই এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বাংলাদেশ সরকার বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রিমিয়াম বন্ড, ইনভেস্টমেন্ট বন্ড প্রভৃতি চালু করেছে। এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আকর্ষণীয় মুনাফা পাচ্ছেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ বটে। তবে রেমিট্যান্স উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও অবকাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রবাসীরা অগ্রাধিকার পাবেন। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) কেন্দ্র হতে পারে, যেখানে কিনা প্রবাসী বাংলাদেশিরাই হবেন মূল বিনিয়োগকারী। তবে এসবের জন্য সর্বপ্রথম দরকার কঠোর কমপ্লায়েন্স প্রতিপালন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা, যেখানে তারা বিনিয়োগ করতে নিরাপদ বোধ করবেন। পাশাপাশি অনাবাসী বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবাদানের উদ্দেশ্যে একটি ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে।

শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারেন। বিশ্ববাসীকে বলার মতো বাংলাদেশের অনেক সফলতার গল্প এবং সম্ভাবনার জায়গা রয়েছে। তবে প্রায়ই আমরা দেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার ছড়িয়ে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা দেখতে পাই। প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশি ভাইবোনেরা এ অপতৎপরতা রোধে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলে এসব অপপ্রচেষ্টা নস্যাৎ হবে। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি পোশাক কেনার সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাককে পছন্দের শীর্ষে রাখেন অথবা বাংলাদেশি পোশাক তাদের বিদেশি বন্ধুবান্ধবকে উপহার দেন এবং তাদের নিজ নিজ কমিউনিটিতে বসবাসরত সবাইকে 'মেইড ইন বাংলাদেশ' পণ্য কিনতে উদ্বুদ্ধ করেন; সেটি শুধু আমাদের রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না; আমাদের পণ্যের প্রচারও বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে। অধিকন্তু, প্রবাসী ভাইবোনেরা যেসব দেশে বসবাস করছেন, সেসব দেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণের ব্যাপারেও আলোচনা করতে পারেন।

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করতে এবং ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে অভিবাসী বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয়তা আমাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারা যেন এসব উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারেন, সে জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি ও নীতি সহায়তা খুবই জরুরি। এ ব্যাপারে আমরা ভারত, জাপান ও ফিলিপাইনকে অনুসরণ করতে পারি। কীভাবে তারা প্রবাসী নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ দেশের উন্নয়ন সাধন করেছে, তা আমলে রেখে আমরা এগোতে পারি।

সভাপতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)

মন্তব্য করুন