আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামে আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ত্রিপুরা রাজ্যের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১৯৬৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলায় গিয়েছিলেন- এ সম্পর্কে নানা তথ্য রয়েছে। অনেক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে তার আগরতলায় যাওয়ার বিষয়টি। সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ রচিত 'আগরতলা মামলা, শেখ মুজিব ও বাংলার বিদ্রোহ' গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে। ত্রিপুরার কংগ্রেসদলীয় মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ নাকি বলেছিলেন, '১৯৬৩ সালে আমার ভাই উমেশলাল সিংহ এমএলএ সমভিব্যহারে শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জুন ত্রিপুরার পালাম জেলার খেয়াই মহকুমা দিয়ে আগরতলায় আমার বাংলোয় রাত ১২ ঘটিকায় আগমন করেন। প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার পর আমার বাংলো বাড়ি হইতে মাইল দেড়েক দূরে ভগ্নি হেমাঙ্গিনী দেবীর বাড়িতে শেখ সাহেব আসেন। সেখানেই তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তারপর মুজিব ভাইয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী আমি আমাদের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জহরলাল নেহরুর সঙ্গে দেখা করি। আমার সঙ্গে ছিলেন শ্রী শ্রীরমণ, চিফ সেক্রেটারি। তাকে (শ্রীরমণকে) শ্রী ভাণ্ডারিয়ার বিদেশ সচিবের রুমে রাখিয়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ত্রিপুরায় থাকিয়া প্রচার কার্যে সম্মত হন নাই। কারণ চীনের সঙ্গে লড়াইয়ের পর এত বড় ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না। তাই ১৫ দিন থাকার পর তিনি (শেখ মুজিব) ত্রিপুরা ত্যাগ করেন সোনামুড়া পশ্চিম ত্রিপুরার এক মহকুমা, কুমিল্লা সংলগ্ন সীমান্ত পথে। শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।'

শেখ মুজিবের আগরতলা যাওয়া প্রসঙ্গে তারই নিকটাত্মীয় মমিনুল হক খোকা রচিত 'অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জ্বল :বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও আমি' গ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে, '১৯৬২ সাল ... বিরোধীদলীয় চরমপন্থি গ্রুপের কয়েকজনের সঙ্গে মিঞা ভাইয়ের (শেখ মুজিব) ছিল বিশেষ হৃদ্যতা। তাঁদের সঙ্গে পরামর্শে স্থির করলেন উনি দেশত্যাগ করবেন। প্রথমে ভারত, তারপর সেখান থেকে লন্ডনে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করবেন। একই সঙ্গে বিশ্বজনমত গড়ে তুলবেন, যেমনটি করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এই অন্তর্ধান পরিকল্পনার বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ছিলেন সিএসপি রুহুল কুদ্দুস, আহমেদ ফজলুর রহমান এবং মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী নামের সিলেটের একজন চা-বাগানের মালিক। ... সীমান্ত পার হতেই তাঁকে (শেখ মুজিবকে) বিএসএফ গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক আগরতলাতে আগে থেকে মোয়াজ্জেম চৌধুরীর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সব ঠিক করে রাখার কথা ছিল, তা তিনি করেননি। মিঞা ভাইয়ের সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কোনোরূপ অসৌজন্য আচরণ করেননি, কিন্তু ওখান থেকে লন্ডন যেতে দিতে তাঁরা রাজি হয়নি। তাঁরা নাকি তাঁকে আগরতলা থেকে প্রচারণা করার অনুমতি দিতে চেয়েছিল। ব্যর্থ মনোরথে মিঞা ভাই চলে আসেন।'

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ১৯৬৩ সালে আগরতলায় যাওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিক হরিভূষণ পাল আগরতলার জাগরণ পত্রিকার সম্পাদক জিতেন্দ্র চন্দ্র পালের বরাত দিয়ে তার রচিত 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ফিরে দেখা' গ্রন্থে লিখেছেন, 'শেখ মুজিবের থাকার ব্যবস্থা করা হয় অরুন্ধতীনগরে উমেশ বাবুর [শচীন্দ্রলাল সিংহের] বাসস্থানে, যা প্রকৃতপক্ষে শচীন্দ্রলাল বাবুর ভগ্নি হেমাঙ্গিনী দেবীর বাড়ি।' ওই একই গ্রন্থে তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আগে বিদ্রোহী সেনাসদস্যদের প্রতিনিধি রূপে স্টুয়ার্ড মুজিব (মুজিবুর রহমান) আগরতলায় এসেছিলেন। স্পষ্ট করে লেখক লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান তখন আগরতলায় আসেননি। নামের অভিন্নতায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা জানি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছিল। অথচ শেখ মুজিব বিদ্রোহী সেনাসদস্যদের পরিকল্পনা অনুসারে আগরতলায় যাননি।


স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে অংশ নিয়ে মাদারীপুর অঞ্চলে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে তার। স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকার জনবহুল গুলিস্তান এলাকা থেকে কতিপয় সশস্ত্র যুবক তাকে জিপে তুলে নিয়ে যায়। তারপর তার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানসহ স্বাধীনতাকামী অনেকেই গুপ্ত-ঘাতকদের শিকার হয়েছিলেন, রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার প্রক্রিয়ায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দ্বিতীয় অভিযুক্ত লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যার প্রথম প্রহরে তার এলিফেন্ট রোডের বাসায় পাকিস্তানি হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করে।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত সেনাসদস্যদের নানা ক্ষেত্রে জাতি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল। সমমর্যাদার বাঙালি ও পাঞ্জাবি সেনাসদস্যদের মধ্যে ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি নিয়ে বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিক্ষুব্ধ কতিপয় নৌবাহিনীর সদস্যরা করাচিতে সংঘবদ্ধ হয়েছিল লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংঘটনে। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চট্টগ্রামের সেনা ও বিমানবাহিনীতে কর্মরতদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা ও সমর্থনের অভিপ্রায়ে ১৯৬৪ সালে করাচিতে শেখ মুজিবের সঙ্গেও তারা সাক্ষাৎ করে তাদের পরিকল্পনার কথা জানায়। শেখ মুজিব বলেন, 'তোমরা এগিয়ে যাও; অর্থ ও সমর্থন যা কিছু দরকার আমি দেবো।' (আবু সাঈদ খান, 'সেনাছাউনিতে মুক্তিসংগ্রাম ও আগরতলা মামলা' নতুন দিগন্ত ষোড়শ বর্ষের প্রথম সংখ্যা)। প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনে তাদের প্রতিনিধিরূপেই স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান আগরতলায় হয়তো গিয়েছিলেন।

আগরতলায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। বিদ্রোহের পরিকল্পনা বেশিদূর এগোতে পারেনি। কারও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তথ্য ফাঁস হওয়ায় ১৯৬৭ সালের ৯ ডিসেম্বর লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমসহ সংশ্নিষ্টদের একে একে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে ওই মামলার প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। ১৯৬৮ সালের ২০ জুন ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে শেখ মুজিব, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমসহ ৩৫ জন অভিযুক্তের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারি ভাষ্যে মামলার নামকরণ করা হয় 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য'। মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। 'অভিযুক্ত ষড়যন্ত্রকারীরা পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ভারতের সহায়তা পেতে আগরতলায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছিল।' সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর নাসির মামলা উত্থাপনের দিন সাংবাদিকদের কাছে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' উল্লেখ করায় মামলাটি পরিচিত হয়ে পড়ে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা'। পাকিস্তান সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর বাঙালি চাকরিরত, অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ছাড়াও সিএসপি কর্মকর্তা, বেসরকারি চাকরিজীবী ও রাজনীতিকদের মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

ওই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত কর্নেল শওকত আলী তার স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ 'সত্য মামলা আগরতলায়' সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, 'মামলাটি মিথ্যা ছিল না। পুরোপুরি সত্য ছিল।' সাংবাদিক এবিএম মূসার 'আমার দেশ সে সময়' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, 'কুর্মিটোলা সেনানিবাসের আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শেখ মুজিব তাঁদেরকে মুক্ত করার জন্য সাংবাদিক আতাউস সামাদের মাধ্যমে মওলানা ভাসানীকে অনুরোধ করেন।' ওই অনুরোধের ডাকে সাড়া দিয়ে মওলানা ভাসানী তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিলের দাবিতে ভাসানীর নেতৃত্বে সে আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। গণআন্দোলন দ্রুতই গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। হরতাল, মিছিল, সভা-সমাবেশ ঠেকাতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেও ব্যর্থ হয়। আসাদ, মতিউর প্রমুখের আত্মদানে গণঅভ্যুত্থান চরম পর্যায়ে পৌঁছে। বন্দিদশায় আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে সেনানিবাসে হত্যা করা হয়। অপ্রতিরোধ্য ঐতিহাসিক উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। শেখ মুজিবসহ সব অভিযুক্ত বেকসুর খালাস পেয়ে মুক্ত হন। পদচ্যুত হয়ে ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হন সামরিক শাসক আইয়ুব খান।

আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' নতুন বাঁক সৃষ্টি করেছিল। যেটি ক্রমেই স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল। সামগ্রিক বিবেচনার ওই মামলায় বঙ্গবন্ধুকে স্তব্ধ করতে আইয়ুব খান রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে তাকে প্রধান অভিযুক্ত করার ফলশ্রুতিতে মামলাটি গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে পরিণতিতে লৌহমানব সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের পতনকেই নিশ্চিত করেছিল। পাশাপাশি আমাদের স্বাধীনতার অগ্রযাত্রার মাইলফলক হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী আসন নিয়েছে।

মযহারুল ইসলাম বাবলা: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

মন্তব্য করুন