দ্রোহী নজরুলের মৃত্যুক্ষুধার মঞ্চপাঠ

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭      

হুমায়ুন আজম রেওয়াজ

কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য ও সঙ্গীতের তুলনায় তার নাটক সমান মান্যতা অর্জন করেনি বটে; কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কবির প্রতিবাদী চৈতন্য পাঠের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু বাংলার নাট্যমঞ্চে তুলনামূলকভাবে নজরুল অনুচ্চারিত। এমন উপেক্ষার তিমিরে নাট্যচক্র মঞ্চে এনেছে কবির 'মৃত্যুক্ষুধা' উপন্যাস অবলম্বনে নাটক 'মৃত্যুক্ষুধা'। এর নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন গোলাম সারোয়ার। ১৯৩০ সালে রচিত এ উপন্যাসের পটভূমি কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের এক বস্তি এলাকা। এখানে বাস করে এক নিম্নশ্রেণির দরিদ্র মুসলমান, হিন্দু এবং ধর্মান্তরিত এ দেশীয় রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবার। গল্পের কেন্দ্রে আছে গজালের মায়ের পরিবার। বৃদ্ধ মা, তিন বিধবা পুত্রবধূ ও তাদের কয়েক সন্তান। আবার উনিশ বছরের ছেলে, স্বামীর বাড়ি ফেরত মেয়ে নিয়ে তার হতদরিদ্র সংসার। বৃদ্ধার ছেলের নাম প্যাঁকালে। প্যাঁকালের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলেই এই সংসারটি টিকে আছে কোনো রকমে। সে ভালোবাসে কুশি নামে এক খ্রিস্টান মেয়েকে। কুশিও ভালোবাসে প্যাঁকালেকে। এই পরিবারের মেজো বউ এবং পুত্র প্যাকালের খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার করুণ বিষাদময় বাস্তবতার গল্পই এ নাট্যের প্রথম পর্বের গল্প। এই দরিদ্র পরিবারের সঙ্গে আর একটি কাহিনী এসে জুড়েছে। প্রথম কাহিনীতে মৃত্যু আছে, ক্ষুধাও আছে কিন্তু দ্বিতীয় কাহিনীতে মৃত্যু আছে, ক্ষুধা নেই। দ্বিতীয় কাহিনীটি সংসার-বিবাগী দেশপ্রেমিক বিপ্লবী আনসারের। আনসার ভালোবাসত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কন্যা রুবীকে। রুবীর বিয়ে হয় অন্যত্র। অবশ্য অল্পদিনের মধ্যেই রুবীর স্বামী মৃত্যুবরণ করে। আনসার রাজবন্দি অবস্থায় ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়। আনসার মৃত্যুবরণ করে ক্ষয়রোগে।
এই গল্পের আখ্যানের নেপথ্যে আছে স্বদেশি আন্দোলন এবং তৎকালীন ধর্মান্ধ সমাজপতিদের স্বার্থপরতার ইতিহাস। এমন ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে সমকালীন বয়ানে উপস্থাপন করতে নির্দেশক তেমন নিরীক্ষার বশবর্তী হননি। স্থান, কাল ও ঘটনার ঐক্য সাধনে তৎকালীন সময়কে বর্তমানের সঙ্গে সাঁকোবন্ধনের কোনো উচ্চাভিলাষী প্রয়াসও চোখে পড়েনি। বরং সূত্রধরের বয়ানে একটি সরল গল্প বলে গেছে নিরাভরণ মঞ্চের আলোয়। অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে নজরুলের গান।
'মৃত্যুক্ষুধা' উপন্যাসের প্রথম অংশে কিশোর প্যাঁকালে চরিত্র প্রতিনিধিত্ব করেছে নজরুলের কৈশোর জীবনকে, আর দ্বিতীয় অংশে যুবক আনসার প্রতিনিধিত্ব করছে নজরুলের দ্রোহী মূর্তিতে। এই উপন্যাসে নজরুলের যাপিত জীবনের কিছু ঘটনা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অনেকখানি ছায়াপাত ঘটেছে। এ নাটকেও তা ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে।
'মৃত্যুক্ষুধা' নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তনিমা হামিদ, তাবাসসুম আহমেদ, স্বপন, খুশী, উমা, অপু, তারক নাথ প্রমুখ।