'রহু চণ্ডালের হাড়' :বাজিকরদের জীবনগাথা

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

মাসুম রেজা

 'রহু চণ্ডালের হাড়' :বাজিকরদের জীবনগাথা

'রহু চণ্ডালের হাড়' নাটকের দৃশ্য

শুরু করি অভিজিৎ সেনের কথা দিয়ে, যিনি 'রহু চণ্ডালের হাড়' উপন্যাসটি লিখেছেন। 'যেভাবে লেখা হলো রহু চণ্ডালের হাড়'-এ অভিজিৎ বলছেন, 'এ উপন্যাস শুধু একশ্রেণির যাযাবরের জীবন-সংগ্রামের কাহিনী নয়। এই যাযাবর গোষ্ঠী, আমার উপন্যাসে যে গোষ্ঠীর নাম বাজিকর তাদের এক-দেড়শ' বছরের ঘোরাফেরাকে কেন্দ্র করে আমি একটা বিস্তৃত অঞ্চলের ওই সময়কার ইতিহাস, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়কে টুকরো টুকরো করে তুলে এনেছি। ...বালুরঘাট মহকুমার তপন থানার কয়েকটি গ্রামে এইসব বাজিকরের সাথে আমার দেখা হয়... বেশ কয়েক বছর কাছ থেকে এবং দূর থেকে দেখার পুঁজি সম্বল করে রহু চণ্ডালের হাড় লেখা শুরু করি ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি।

' অভিজিৎ সেনের রহু চণ্ডালের হাড় পড়ে মুগ্ধতায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস 'অভিজিৎ সেনের হাড়তরঙ্গ' নামে একখানা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আর হাসান আজিজুল হক এক চিঠিতে অভিজিৎকে লিখেছিলেন, 'আপনার উপন্যাসটি পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি।' একটি মঞ্চনাটকের কথা লিখতে গিয়ে আমি কেন সেই নাটকটি যে উপন্যাসকে কেন্দ্র করে অভিনীত হয়েছে তার কথা বলছি, তা নিয়ে একটু বলা দরকার। ঢাকার মঞ্চে আমরা যারা রেজা আরিফের নির্দেশনার কাজ দেখেছি, তারা সবাই জানি, তিনি উপন্যাসকেন্দ্রিক কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এর আগে তার নির্দেশিত 'সে রাতে পূর্ণিমা ছিল' বা 'দি আলকেমিস্ট' নাটক দুটি যারা দেখেছেন, তারা ভালো করেই জানেন- কী অবলীলায় তিনি সব রস-রূপ-গন্ধ বজায় রেখে উপন্যাস দুটিকে মঞ্চে ভ্রমণ করিয়েছেন। রহু চণ্ডালের হাড়-এর মঞ্চয়নের সন্ধ্যায় রেজা আরিফ বলেছিলেন, 'এই নাটকের কোনো নাট্যরূপ নেই। এটি সরাসরি উপন্যাস থেকে মঞ্চে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।'

তবে তিনি সমগ্র উপন্যাসটিকে মঞ্চে আনেননি আর সেটা সম্ভবও নয়। মঞ্চে উপস্থাপিত গল্পটুকুতে দেখা যায় বাজিকরদের জীবনগাথা। বাঁশবাজি, দড়িবাজি, বান্দর নাচানো, ভল্লু নাচানো, কাঠের পুতুল নাচানো, নর-রাক্ষস হয়ে 'কাঁচা হাঁস কাঁচা মুরগা' কড়মড় করে চিবিয়ে খাওয়া, বিচিত্র চিকিৎসা পদ্ধতি আর নানারকম অবিশ্বাস্য অলৌকিকতার পসরা নিয়ে বাজিকর পথে পথে ঘোরে। পশ্চিম থেকে পুবের পথে। সঙ্গে থাকে তাদের প্রধান অবলম্বন ঘোড়া-মহিষের দল আর অলৌকিক শক্তির আধার 'রহু চণ্ডালের হাড়'। বাজিকরদের আপন কোনো 'ধরম' নেই। রহু বাজিকরদের দেবতা নয়, একজন প্রাচীন দলপতি মাত্র। বাজিকরদের 'করম' বলতে 'ভিখ্‌ মাঙ্গা'। সারাদিন খেলা দেখিয়ে যা রোজগার হয়, সেটাই হলো 'ভিখ্‌ মাঙ্গা'। বাজিকরের গৃহ নেই, জমি নেই, পাসপোর্ট নেই, দেশ নেই, জাতের পরিচয় নেই। বাজিকর সর্দার পীতেম চেয়েছিল, ভবঘুরে বাজিকর থিতু হোক। বাজিকরের ঠিকানা হোক, এক টুকরো জমি হোক, জাত-পাতের পরিচয় হোক।

বাজিকররা কী করে যেন সাঁওতাল বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং স্বভাবতই ইংরেজ সরকারের রোষানলে পড়ে। বাজিকরদের আবার পথে নামতে হয়। গন্তব্য অন্য কোনো পুবের দেশ। পীতেমের পর দলের হাল ধরে পরতাপ। রাজশাহীর চলনবিল থেকে শিখে আসা বুনো ধানের চাষ করে পরতাপ সমস্ত অঞ্চলে সাড়া ফেলে দেয়। বাজিকররা যখন থিতু হওয়ার স্বপ্নটাকে প্রায় আয়ত্তের মধ্যে দেখে- তখনই গৃহস্থ মানুষের দ্বারা বাজিকর অকস্মাৎ আক্রান্ত হয়। বাজিকরের ঘর পোড়ে। বাজিকর আবার পথে নামে। পুবের পথে। পরতাপের নাতনি লুবিনি আর তার নাতনি সারিবার কথোপকথনে আমরা জ্ঞাত হতে থাকি এইসব গল্পমালা। এই যাযাবর জীবনের এপিক উপস্থাপনাকে রেজা আরিফ সাজিয়েছেন এক ভিন্নমাত্রায়। 'গঠিত হয় শূন্যে মেলায়' জাদুতে উপন্যাসের একেকটা ঘটনা ক্রমে মূর্ত হয়েছে এবং চূড়ায় উঠে তা মিলিয়ে গেছে অন্য এক ঘটনার সমীপে।

মঞ্চের বিস্তৃত সজ্জায় আলোর কারুকার্যে, জীবন্ত সঙ্গীতে আর অভিনতাগণের অপূর্ব বয়ানে একেকটা মুহূর্ত হয়ে উঠেছে একেকটা আখ্যান। আরিফের নির্মাণ-কৌশলই এমন। মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। এ নাটকে কে কেমন অভিনয় করলেন, তা নিয়ে আলাদা করে লিখব না, কারণ আমি সবার ভেতরেই এক দারুণ সম্ভাবনা দেখেছি, যেমন পীতেম চরিত্রে ফাহিম মালিক ইভান, লুবিনিরূপী শ্যামাঙ্গিনী শ্যামা, সারিবার ভূমিকায় শারমিন ডেইজি, নিতাই চন্দ্র কর্মকার করেছেন দোদন নামের চরিত্রটি, রাধার চরিত্রে আইনুন পুতুল, সালমারূপে নুসরাত জিসা, রহু ও জামিরের ভূমিকায় আসাদুজ্জামান আবীর- তাদের অভিনয়ে সে সন্ধ্যায় আমি আনন্দ পেয়েছি। নাটকটি দেখলে আপনারাও আনন্দিত হবেন।