'গীতি চন্দ্রাবতী'র কথা

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯

আবু সাঈদ তুলু

'গীতি চন্দ্রাবতী'র কথা

'গীতি চন্দ্রাবতী' নাটকের দৃশ্য

সংস্কার নাট্যদলের সপ্তম প্রযোজনা 'গীতি চন্দ্রাবতী'র উদ্বোধনী মঞ্চয়ন হয় সম্প্রতি। বাঙালি সংস্কৃতি-সচেতনদের কাছে 'চন্দ্রাবতী' চরিত্র অতি পরিচিত। মনসামঙ্গলের পালাকার দ্বিজ বংশীদাসের কন্যা কিংবা বাঙালি সমাজের নারী কবি হিসেবে পরিচিত। অত্যন্ত নাটকীয় জীবন ছিল চন্দ্রাবতীর। ব্যর্থ হৃদয়ের বিয়োগান্ত আকুতির সন্নিবেশন শতকের পর শতকে মানুষের হৃদয়কে করুণ ব্যথায় উদ্দীপিত করে আসছে। চন্দ্রাবতীর জীবননির্ভর এ নাটকটি নয়ান চাঁদ ঘোষের রচনায় নির্দেশনা দিয়েছেন ইউসুফ হাসান অর্ক।

১৯১৩ সালে 'সৌরভ' পত্রিকায় চন্দ্রকুমার দে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে 'চন্দ্রাবতী' পরিচিত হয়ে উঠতে থাকেন। চন্দ্রাবতীর জীবন নিয়ে 'জয়-চন্দ্রাবতী' গীতিকা ও 'চন্দ্রাবতী' নামে দুটো পালার সন্ধান পাওয়া যায়। উনিশ শতকে পালা বা নাট্য হিসেবে জনপ্রিয় ছিল নয়ান চাঁদ ঘোষের 'চন্দ্রাবতী' পালা। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র 'চন্দ্রাবতী', যিনি মনসামঙ্গলের কবি দ্বিজ বংশীদাসের কন্যা ও রামায়ণের রচয়িতা। প্রেম-বিচ্ছেদের বিয়োগান্ত কাহিনী এ পালার মূল উপজীব্য। আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাটুয়ারি গ্রামে চন্দ্রাবতী জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান কিশোরগঞ্জের পাতুয়ার গ্রামে চন্দ্রাবতীর স্মৃতিবিজড়িত শিবমন্দিরটি তার ঐতিহাসিকতা বহন করে। চন্দ্রাবতী চরিত সমাজের আরেক কিংবদন্তি 'খনা'র কথাও মনে করিয়ে দেয়। চন্দ্রাবতীর রচিত পালাগুলো হচ্ছে- রামায়ণ [অসমাপ্ত], দস্যু কেনারামের পালা, মলুয়া প্রভৃতি। তার রামায়ণ পালা গতানুগতিক পুরুষতন্ত্রকে ছাপিয়ে নারীবাদী এক আখ্যানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। মাত্র ৫০ বছর বয়সে পরলোকগমন করলেও বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসে তিনি 'কবি' হিসেবে অমর হয়ে রয়েছেন।

নাটকের গল্পে দেখা যায়- বাল্যকালে চন্দ্রাবতীর বন্ধু ও খেলার সাথী ছিল জয়ানন্দ। কৈশোর পেরুলেই বিয়ে করবে, তারা এমনটা ঠিক করেন। ঠিক হয় বিয়ের দিনও। এরই মাঝে জয়ানন্দ প্রেমে পড়ে এক মুসলিম নারীর। নাম আসমানী। জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয় এবং বিয়ে করে আসমানীকে। যেদিন জয়ানন্দ বিয়ে করে, সেদিনই চন্দ্রাবতীর সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার কথা। বধূ সাজে সজ্জিত চন্দ্রাবতী জানতে পারে, জয়ানন্দ বিয়ে করেছে অন্যত্র। সেদিন চন্দ্রাবতী প্রতিজ্ঞা করে, শিবের সাধনায় জীবন কাটিয়ে দেবে।

বাবার কাছে অনুমতি চাইলে চন্দ্রাবতীকে তিনি পরামর্শ দেন রামায়ণ লেখার। চন্দ্রাবতী শুরু করে শিব-স্তুতি ও সাহিত্য সাধনা। মাঝে কেটে যায় বেশ কিছুকাল। একসময় জয়ানন্দ উপলব্ধি করে, আসমানীর প্রতি তার টান মোহ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে চন্দ্রাবতীকেই ভালোবাসে সে। বুঝতে পারে, সে ভুল করেছে। ভুল শোধরাতে জয়ানন্দ এসে পৌঁছায় চন্দ্রাবতীর মন্দিরে। চন্দ্রাবতী তখন ধ্যানমগ্ন। জয়ানন্দ মন্দিরের দরজায় এসে অনেক ডাকাডাকি করে। কিন্তু চন্দ্রাবতীর ধ্যান ভাঙে না। ব্যর্থ জয়ানন্দ মন্দিরের দরজায় একটি কবিতা লিখে চলে যায়। 'শৈশবকালের সঙ্গী তুমি যৈবনকালের সাথী/অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী/পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হইলা সম্মত/বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মত।' ধ্যান ভাঙলে চন্দ্রাবতী মন্দির পরিস্কারের জন্য নদীর ঘাটে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে, জয়ানন্দের নিথর দেহ ভাসছে নদীতে।

'গীতি চন্দ্রাবতী' নাটকটি প্রসেনিয়াম রীতিতে উপস্থাপন। সহজ-সরল মঞ্চবিন্যাস। সাধারণত ঐতিহ্যনির্ভর নাটকগুলো বাঙালির হাজার বছরের বহমান ধারায় চারপাশ দর্শকবেষ্টিত মঞ্চে উপস্থাপনে বাঙালির শিল্পনন্দনের অনুভব তৈরি করে। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন- মনামী ইসলাম কনক, বাপ্পী সাইফ, ফাতেমা তুজ জোহরা ইভা, আশিকুর রহমান, নাবা চৌধুরী, খন্দকার রাকিবুল হক, উষ্ফ্মিতা চৌধুরী, নির্ঝর অধিকারী, মায়ান মাহমুদ প্রমুখ। নাটকটির পোশাক পরিকল্পনা করেছেন আইরিন পারভীন লোপা, আলো-অম্লান বিশ্বাস, কোরিওগ্রাফি করেছেন শ্রাবন্তী গুপ্ত।