[গত সংখ্যার পর]

সত্তর দশকের পর চাকমা কবিতার বিষয় ও শৈলীর ক্ষেত্রে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটেছে। সত্তর-উত্তর তরুণ কবিরা দেখেছেন কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন। কাপ্তাই বাঁধের প্রভাব পড়েছে আধুনিক চাকমা কবিদের চিন্তার ওপর। ফলে কবিতার বিষয় ও শৈলীতে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আশির দশকের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের রাজনৈতিক সংক্ষুব্ধতাজাত সশস্ত্র সংগ্রামের প্রভাব এসে লাগে আধুনিক চাকমা কবিতার শরীরে। সুগত চাকমার বিশেষণ শুনতে শুনতে আমার তাৎক্ষণিকভাবে মনে হলো সুহৃদ, শিশির, মৃত্তিকা যে নিরীক্ষা আশির দশকে শুরু করেছিলেন তার ধারাবাহিকতা কেন খণ্ডিত হলো সে আলোচনা সুগত বাবু করলে আমাদের জন্য বুঝতে সহায়ক হতো। কারণ এ কথা তো সত্য, ১৯৭০ সালে সুগত চাকমা ননাধনের 'রাঙামাত্যা' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে চাকমা সাহিত্যে যথার্থ আধুনিকতার যাত্রা শুরু হয়েছে। সুহৃদের মতে, ইওরোপীয় ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে অনবরত সংঘাতের ফলে চাকমাদের যে সাংস্কৃতিক ভাবধারার পরিবর্তন ঘটে, তৎকালীন সেই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থাকে ধারণ করার জন্যই সুগত চাকমা ননাধন আধুনিক। তারপরও সুগত চাকমা যুগযন্ত্রণাকে সঠিকভাবে তার কবিতায় ধারণ করতে পারেননি বলে সুহৃদ (সুহৃদ চাকমার লেখা কবিতা ও আধুনিক চাকমা কবিতার পটভূমি দ্রষ্টব্য) মন্তব্য করেছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কালে, সেই আশির দশকে আমি লক্ষ্য করেছি কবিতা সম্পর্কে সুহৃদের দৃষ্টিভঙ্গি খুব তীক্ষষ্ট ছিল। একটি লেখা অনেকবার কেটেকুটে আমাদের কাছে পাঠ করতেন। চাকমা জাতিসত্তার সংকটকে সুহৃদ গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। আমার কাছে সুহৃদের কবিতাকে সব সময় মনে হতো শব্দের শিল্প। সুহৃদ শব্দ নিয়ে নিরীক্ষা করতেন। বাংলা ভাষার সঙ্গে জন্মসূত্রে চাকমা ভাষার যে সম্বন্ধ তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সুহৃদ অনেক ভোটবর্মী ভাষা খুঁজেছেন, চাকমা ভাষাকে প্রতীকী করার চেষ্টা করেছেন; সে আমি সেই আশির দশকেই দেখেছি। প্রায় একই সময়ে সুহৃদ, শিশির, মৃত্তিকা, সুসময়_ এদের যাত্রা শুরু। শিশির চাকমার কবিতায় একটি কাঠামোবাদের বিকাশ দেখি। তার কবিতার বিষয়বস্তু সময়ের সাথে সাথে বদলেছে। নারীপ্রেম ও স্বদেশপ্রেমের কবিতাকে তিনি এক সময় পেঁৗছে দিয়েছেন সর্বজাতির প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার কাছে। তার কবিতায় জাতিসত্তার সমন্বয়ধর্মিতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিও চাকমা আলামে মিশে যায়। শিশির চাকমার কবিতায় দৃষ্ট একটি জাতিসত্তার ক্রমাগত বিলুপ্তির বেদনার অনুরণন। সুগত চাকমা থেকে শুরু হওয়া আধুনিক চাকমা কবিতার নিরীক্ষার যুগ শেষ হলে পর এর ধারাবাহিকতা তেমন একটা চোখে পড়ে না। কবি ফেলাজিয়া ১৯৭৩ সালে লেখেন চাকমা কবিতার মোড় ফেরানো 'জুম্মবী পরাণী মর' কবিতা। চাকমা কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার নতুন মাত্রা লাভ করে। চাকমা পুরাণনির্ভর শব্দগুলো নতুন মাত্রা পায়। পাহাড়ি জীবন ও জনপদের সঙ্গে মিলেমিশে নবতর ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে চাকমা কবিতা। সুহৃদ, সুসময়, মৃত্তিকা, শিশিরের কবিতায় জুম, পাহাড়ি ফুল, মোনঘর, চাকমা কাব্যের রাধামন-ধনপুদি প্রভৃতি শব্দ ও প্রসঙ্গ ভিন্নতর আবহ নিয়ে আসে কবিতায়। অন্যদিকে ফেলাজিয়ার কবিতায় দেখি সেই অতীতকালের চম্পকনগরী ও কবি প্রেয়সী একাকার। ব্যক্তিপ্রেম ক্রমাগত কবিতার ভেতরে ঐতিহ্যের পরিপূরক হয়ে ওঠে এবং পাঠকের ভেতরে ভালো লাগার ঘোর তৈরি করে। অনেকটা জীবনানন্দের মেজাজ যেন। কবি যখন বলেন,
সাগরর পানি তর চোগ ভর/এভ যে এধক আঘে ন-হদ জানং মুই,/ন-হদ জানং মুই, কেঙেরি হারেলে তুই/বদাচোগী নুদী চোক নুদী হাঝি কুঝি নুদী নুদী রিনিচানাগান,/জুম্মবী কদে চাং এধক কেঙেরি হলে পঝাগে আ ধগেধাগে/যদেপদে কধা কদে বাঙালমিলা সান?/আহ মর পরাণর চম্পক নাগরী!/কদে চাং কমলে কেঙেরি কুধু তর মর এধকদিন ওইয়ে হারাহারি?/মোনমুরা ছরাছরি কদকিত্যা ঘুরিফিরি চিপ্পুরেপা আবাধা গরি/ভালকদিন পরে তুই মইধু এলে,/কদে চাং জুম্মবী পরাণী মর এধকদিন কুধু কুধু এলে?
(বঙ্গানুবাদ :সুগত চাকমা)
সাগরের এত জল দুটি চোখে এখনও যে আছে হায়!/আমি তা জানি না!/কবে তুমি সুনয়না, হারিয়েছ প্রিয় আঁখি, মায়াচোখ/কোমল কোমল চাহনি?/জুম্মবী, বলো প্রিয়া, সাজে লাজে কেন আজ কাঙালিনী বেশে?/আহা মোর চম্পা-প্রিয়া, কতকাল পরে দেখা হলো দু'জনের?/কত পথ কত নদী, কত অরণ্য পেরিয়ে/আবার এসেছো হায় এতদিন পরে!
চাকমা কবিতায় এভাবে জীবনের বর্ণময়তা রঙে-রূপে বেড়ে উঠতে থাকে। পাহাড়ে দীর্ঘসময় ধরে যে সশস্ত্র সংগ্রাম চলেছে, তার প্রভাবও চাকমা কবিতায় পড়েছে। সেই ধারাবাহিকতা থেকে পাহাড় সম্পূর্ণ ছাড়া পায়নি। অন্তরালের সেই বেদনা মৃত্তিকার মন-মুরো কানি যার ( হৃদয়ে পাহাড় কাঁদে) কবিতায় এমনভাবে উঠে এসেছে_
উুলুন-ও আর তুলিবের নেই, পাগোর ঝরি যেইয়ে/পানিও নেই বিঝুগুলো ভাঝেবার/মনানি-ও নেই, মনর চুমত ধিবে পোরি ওই আঘে/কুধু যেই বর চেম, ভাঙি যেইয়ে সারেক ঘর আর গোই মাঝা
মনর উঝ কুধু তুলো যেম, পিন্যে আগে ঠেঙে-অধে হারচ্য়ান/সিলে যেইযে দ্বি-উধো মাধা, আর-/চোগো উৎ বারেই আঘে মালাআনি,/আগুন বাঝি আঙি যার এ দেঝর মন-মুরোনি।,/এুই কবুল খেয়ং বিঝুত মুই ন যেম./...মুই উবোচ ওই থেম, মোনমুরা কানানির পোইদ্যানে।
মৃত্তিকার কবিতায় চাকমা ভাষার বাইরের শব্দ প্রয়োগ তার কবিতায় স্থিতিস্থাপকতা এনে দিয়েছে। আবেগ ও দ্রোহের ভার যথাযথভাবে বহন করতে পারে এমন শব্দ প্রয়োগের দিকে মৃত্তিকার ঝোঁক রয়েছে।
চাকমা সাহিত্যের, বিশেষ করে কবিতাচর্চার যে বিবর্তন ঘটেছে, সে সম্পর্কে সুগত চাকমার মূল্যায়ন যথার্থ। তিনি তার আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত কবিদের কবিতাকে মূল বিবেচনায় রেখেছেন। তাই একুশ শতকের আধুনিক চাকমা কবিতার ধারায় তরুণ কবিদের অবস্থান, কাব্যভাবনা এবং তাদের 'কমিটমেন্ট' নিয়ে তেমন একটা আলোচনা করেননি। সম্ভবত তিনি স্বতন্ত্রভাবে এ বিষয়ে লিখবেন। সুগত চাকমার প্রবন্ধটি চাকমা আধুনিক কবিতা সম্পর্কে আমাদের ভাবনাকে শাণিত করবে। বাংলাদেশের কবিতার ধারায় চাকমা ভাষা ও কবিতা নতুন মাত্রা নিয়ে আসবে নিঃসন্দেহে। এ জন্য প্রয়োজন চাকমা কবিদের চেতনাগত প্রসার। চাকমা ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্বসাহিত্যকে স্পর্শ করার প্রবল ইচ্ছাকে ধারণ করে কবিদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রেম ও দ্রোহের যুগপৎ মিলনে আমাদের পাহাড়ি জনগণের জীবনজিজ্ঞাসা কবিতায় রূপ পাবে। ব্যক্তিসত্তার বিকাশ, অধিকারবোধ, অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কবিরাই থাকেন সামনের সারিতে। আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে চাকমার কবিতায় বিধৃত দ্রোহী মনোভাব। এই দ্রোহে বেদনা ও ভালোবাসা, অধিকার ও অধিকারহীনতার সংক্ষুব্ধতা রয়েছে। তার কাব্যগ্রন্থ 'জুলি ন উধিম কিত্তেই' (১৯৯২) থেকে একটি অংশ তুলে দেই_
জুলি ন উধিম কিত্তেই!/যিয়ান পরানে কয় সিয়েন গরিবে-/বযত্তান বানেবে বিরানভূমি,/গাভুর বেলরে সাঝ/সরয মিলেরে ভাচ/জুলি ন উধিম কিত্তেই!/(বঙ্গানুবাদ)
রুখে দাঁড়াবো না কেন!/যা ইচ্ছে তাই করবে-/বসত বিরানভূমি
নিবিড় অরণ্য মরুভূমি,/সকালকে সন্ধ্যা/ফলবতীকে বন্ধ্যা/রুখে দাঁড়াবো না কেন!
মঞ্চে বসে, সুগত চাকমার এই সুখপাঠ্য গদ্যে রচিত প্রবন্ধের ভেতর দিয়ে আমি চাকমা জাতিসত্তার গভীরে ডুবে যেতে থাকি। সেই যে কিংবদন্তির বিজয়গিরি রাজা থেকে ছুটে চলা শুরু হয়েছে, আজও কি তার শেষ নেই! আমি ভাবি, রূপান্তরের বাঁক বদলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে চাকমারা সেই কবে থেকে! এই রূপান্তরে সুখ কিংবা স্বস্তি কতটা আছে জানি না। তবে কষ্ট যে অনেকটাই তা কবিদের কবিতা পড়ে বুঝতে পারি। একুশ শতকের একটি কবিতা, কবি প্রগতি খীসার লেখা (২০১২) 'মন চিদ আহঙি যায়' থেকে একটি অংশ তুলে দিয়ে এ প্রসঙ্গের ইতি টানব।
যুদি নু-ও জনম অহ্য়,
গাঙ, মুরো ন' অহ লে সাঝন্যা তারা ওহ্ই/পত্র ছদগ ওহ্ম-/ন' অহলে বলবলা বলি নয় ঝুবুর চিবিত গাঝ/তুও মুই আহন্দি রাজার রেজ্জ্যত-/জনমেদুং নয় কন' জনমত
কবি প্রগতি খীসা তার এই কবিতায় রূপান্তরিত জীবনের কথা বলছেন। তিনি উচ্চ বৃক্ষ হতে চান, সন্ধ্যাতারা হতে চান, নদী-গিরি-ঝর্না হতে চান। কিন্তু কোনোদিনই এই হতভাগা ভূমিতে জন্ম নিতে চান না। কবি রূপান্তর চান নিজের ভূমির বৃক্ষলতায়, নদী, পাহাড়ে। বৌদ্ধ জন্মান্তরবাদ কিংবা রূপান্তরবাদের একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার রূপান্তর ঘটেছে প্রগতি খীসার কবিতায়। ভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং ভূমিহীনতা কবিকে বেদনার্ত করে। আমার বিবেচনায়, একুশ শতকের চাকমা কবিতায় এই বিষয়টি ব্যক্তিপ্রেমের ঊধর্ে্ব স্থান পাচ্ছে। আধুনিক চাকমা কবি ও কবিতার আলোচনাকালে সুগত চাকমা খুব সুন্দর করে চাকমা কবিতার আধুনিকতার মূল প্রণোদনাকে তুলে ধরতে পেরেছেন।
সুগত চাকমা প্রবন্ধ শেষ করার পর মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা তার প্রবন্ধ পড়লেন। 'ককবরক কাব্যচর্চার বর্তমান হালচাল' শীর্ষক তার প্রবন্ধটিতে ত্রিপুরাভাষী কবিতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা ককবরক সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মৌখিক ধারায় রচিত সাহিত্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই ধারাটির ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ককবরক সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতার বিকাশ ঘটেনি। তিনি বাংলাদেশে ককবরক সাহিত্যচর্চার প্রথম নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন ১৯৪২ সালে লেখা খুশীকৃষ্ণ ত্রিপুরা রচিত গানের বই 'ত্রিপুরা খা-কাচাংমা খুম্বার বই' গ্রন্থকে। আশির দশক থেকে ত্রিপুরারা নিজেদের ভাষায় সাহিত্যচর্চার প্রয়াস পায়। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ককবরক কবিদের মধ্যে সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা, বরেন ত্রিপুরা, মহেন্দ্রলাল ত্রিপুরা, ব্রজনাথ রোয়াজা প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। আশির দশক ত্রিপুরা ভাষায় কবিতা চর্চার জোয়ারযুগ। এই সময়ে প্রভাংশু ত্রিপুরা (বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত), প্রশান্ত ত্রিপুরা, কাবেরী ত্রিপুরা, সুরেন্দ্রনাথ রোয়াজা, দীনময় রোয়াজা, লাল দেনদাক, চিরঞ্জীব ত্রিপুরা, সুরেশ ত্রিপুরা, অনিলচন্দ্র ত্রিপুরা, মায়াদেবী ত্রিপুরা, কুহেলিকা ত্রিপুরা, উল্কা ত্রিপুরা, হিরণ্ময় রোয়াজা এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবি। তবে এদের অধিকাংশই আর লেখার সাথে নেই। লেখালেখির মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে এখনও টিকে আছেন প্রভাংশু ত্রিপুরা, প্রশান্ত ত্রিপুরা, দীনময় রোয়াজা। মথুরা বিকাশ তার লেখায় ১৯৯১ সালে প্রকাশিত 'সান্তআ' নামে একটি সাহিত্য সাময়িকী যা প্রশান্ত ত্রিপুরার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছেন। আমার বিবেচনায় পত্রিকাটি ককবরক সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এই পত্রিকার সূত্র ধরে ককবরক ভাষায় লেখকগোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। তবে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা তার লেখায় উল্লেখ করতে পারতেন বাংলা ভাষায় কোন কোন ত্রিপুরা কবি সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন কিংবা করছেন কি-না। এই প্রবন্ধটি আমাদের জিজ্ঞাসাকে উচ্চকিত করবে নিঃসন্দেহে। তবে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা প্রবন্ধটি আরও গুরুত্বের সাথে লিখলে এবং ত্রিপুরাভাষী কবিদের একটি তালিকা তৈরি করলে আমরা আরও উপকৃত হতাম। আমি প্রভাংশু ত্রিপুরার কথার সাথে সহমত পোষণ করে এ প্রসঙ্গের ইতি টানতে চাই। আজ প্রবন্ধ পাঠের শেষে প্রভাংশু ত্রিপুরা তার কথাগুলো বলেন। কী যে সুন্দর আর সাবলীল তার বলার রীতি! আমি মুগ্ধ। আগে কখনও তার বক্তৃতা শুনিনি। তিনি বলেন কবিতার পাঠযোগ্যতা বিষয়ে। কবিতায় মূলবাণী কীভাবে ধারণ করতে হয় সে কথা বলেন তিনি। কবিতার যদি পাঠযোগ্যতা না থাকে তবে সেই কবিতা টিকে থাকে কী করে? কবিতার ভেতর দিয়ে জীবনকে, জগৎকে স্পর্শ করার তাগিদ থাকতে হয়। প্রভাংশু ত্রিপুরার আলোচনায় কবিতার আন্তর্জাতিক প্রাণময়তা ও নির্যাসের বিষয়টি উঠে এসেছে। আমি ভাবি, এমন লেখক যে জাতির রয়েছে তার কবিতার বিকাশ না ঘটে কি পারে? ত্রিপুরা কবিরাই শুধু নন, আমাদের তিনটি পার্বত্য জেলার কবিদের খেয়াল রাখা দরকার, কবিতার সার্বজনীনতাকেই তুলে ধরতে হবে। এ জন্য বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের দিকেও খেয়াল রাখলে কবি ও কবিতার মধ্য দিয়ে একই দেশে বসবাসরত শিল্প-সাহিত্যানুরাগী পাঠকরা শুধু পড়শি হয়ে থাকবেন না; বন্ধুও হতে পারবেন। বাংলাদেশের সাহিত্য সার্বিকভাবে তাতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।
ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যভাবনা বিষয়ক প্রবন্ধটির পরে তরুণ গবেষক চিংলামং চৌধুরী 'মারমা কবি ও কবিতা' শিরোনামের প্রবন্ধ পাঠ করেন। চিংলামং অনেক পরিশ্রম করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। কারণ মারমা ভাষায় কবিতা রচনার সংখ্যা যেমন কম, কবির সংখ্যাও কম। এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে বসবাস করে মারমা সাহিত্য সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি ভাষাগত পার্থক্যের ফেরে পড়েছেন। বান্দরবানের মারমারা যে উচ্চারণ কিংবা রীতিতে কথা বলেন কিংবা লেখেন, তার সঙ্গে খাগড়াছড়ির মারমাভাষীদের খানিকটা পার্থক্য রয়েছে। চিংলামং এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে মারমা কবি ও কবিতা সম্পর্কে একটি তথ্যনির্ভর আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক মারমা কবিতা যারা লিখছেন তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। মারমা কবিদের লেখা কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা নেই। এমনকি কোনো কবিতা সংকলনও নয়। বিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য সাময়িকীতে মারমা কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তাই আধুনিক মারমা কবিতার আলোচনা করা একটি দুরূহ কাজ বলেই আমার মনে হয়েছে। চিংলামং সেই অসাধ্য কাজটি করেছেন।
ষ ৫ পৃষ্ঠার পর
চিংলামং তার প্রবন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতার যাত্রা শুরুর আগে দীর্ঘ ব্যাপ্ত মধ্যযুগের সাহিত্যকে সঙ্গীত ও কবিতা রূপেই বিবেচনা করা হয়। বাংলা কবিতা পাঠ যেমন হতো, তেমনি আসরে আসরে পরিবেশন করা হতো। এগুলো গেয় আখ্যান নামে পরিচিত। এই কাব্যধারা দুই রকম। একটি ধারা মৌখিক রীতির, অন্যটি লিখ্যরীতির সাহিত্য। এ প্রসঙ্গ স্মরণে রেখে চিংলামং মারমা কাব্যচর্চার ইতিহাস বিন্যস্ত করতে চেয়েছেন। মারমা আধুনিক কবিতা চর্চার পূর্বে মারমা অধ্যুষিত অঞ্চলে মৌখিক রীতির কাব্যচর্চা ছিল এবং এখনও তা বিদ্যমান। মারমাদের উল্লেখযোগ্য লোকগীতি হিসেবে কাইপ্যা ব্যাপক জনপ্রিয় মারমা নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত আরণ্যক জনপদে। পরিবেশনা ও আঙ্গিকের দিক থেকে অনেকটা বাংলা কবিগানের মতো এই কাইপ্যা। কাহিনীভিত্তিক হলেও জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দ-বেদনার কথা কাইপ্যার প্রাণ মাতানো সুরে মহার্ঘ হয়ে ওঠে। মারমা জ্যা পালার অনেক চরিত্রের অন্তর্গত বেদনাবোধের সুরেলা প্রকাশের মধ্যে কাইপ্যার মন্ময় বেদনারই প্রতিফলন ঘটে। আমি কাইপ্যা বিষয়ক উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বান্দরবান শহর থেকে দূরে চেমীদলু পাড়ায় কাইপ্যা পরিবেশনা শুনেছি অনেক বছর আগে।
বান্দরবান অঞ্চলের প্রখ্যাত কাইপ্যা শিল্পী মংজবু এবং তার সহযোগীর কাছে এক বৃষ্টিমুখর দিনে আমি কাইপ্যা শুনেছি। বাইরে তুমুল বর্ষণ। পর্বতের গা বেয়ে তীব্র বেগে প্রবাহিত পাহাড়ি ঢল। ঘরের ভেতরে মংজবু ও তার সহশিল্পী নিবিষ্টচিত্তে পরিবেশন করছেন কাইপ্যা। দুইজন কাইপ্যা গায়ক একই সুরে প্রথমে জুমচাষের বর্ণনা উপস্থাপন করেন। সঙ্গের গায়ক বিশেষ মুহূর্তে উ-উ-উ-উ ধ্বনি তোলেন কণ্ঠে। দুইজন মারমা যুবক যুবতীর সংলাপ সুরে সুরে বিনিময় করেন। মংজবুর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানা যায় অধিকাংশ কাইপ্যা মূলত প্রেমসঙ্গীত। তাই সুরবৈচিত্র্য না থাকলেও সুরের প্রলম্বিত বিস্তারে মানব-মানবীর বুকের গভীরে লুকানো ব্যথা শ্রোতাকে স্পর্শ করে যায়। বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে কাইপ্যার শ্রোতারা তাই উ-উ-উ-উ ধ্বনির মাধ্যমে তাদের আনন্দকে প্রকাশ করে থাকে। মারমা কাইপ্যার এই উ-উ-উ-উ ধ্বনির সঙ্গে চাকমা গেংখুলী গীদের মিল লক্ষ্য করা যায়। চাকমা গেংখুলী গীদে এই উ-উ-উ-উ ধ্বনিকে বলা হয় রেং বা রেং কারানা। কাইপ্যা লোকগীতির উক্তি-প্রত্যুক্তিরই পরিপূর্ণতা ঘটেছে মারমা জ্যা নাট্যে। চিংলামং চৌধুরীর প্রবন্ধে মারমা মৌখিক রীতির লোকসাহিত্য প্রসঙ্গের জের ধরে বলতে চাই, এই লোকসাহিত্য মারমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বিধায় আধুনিক সাহিত্যের অগ্রযাত্রায় তার ভূমিকা নির্ণয় করা জরুরি। এসব সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে আধুনিক মারমা কবিতার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মারমা সমাজে কাইপ্যা, পাংখুং ব্যতীত আরও অনেক ধরনের সঙ্গীত ও গীতিনাট্যের পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :চাগায়াং (মারমা সমাজে প্রচলিত এক ধরনের লোকগীতি), সাগ্রাং (এক প্রকার কাহিনীভিত্তিক লোকগীতি), রদুঃ (নির্দিষ্ট কোমল সুর ও ছন্দে পরিবেশিত এক ধরনের কাহিনীভিত্তিক মারমা লোকগীতি), লাংঙ্গা (নির্দিষ্ট সুরে আরণ্যক জনপদে প্রচলিত এক ধরনের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত), সাইংগ্যাই (বাংলা জারিগানের মতো তালে তালে একই সুরে ও ছন্দে দলীয়ভাবে একদল কর্তৃক অন্য দলের উদ্দেশে বিভিন্ন ধরনের বিবরণমূলক সঙ্গীত), লুংদি (গৌতম বুদ্ধের শৈশব ও যৌবনের কাহিনী নিয়ে একই সুরে রচিত এক ধরনের লোকসঙ্গীত। বিশেষ উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই গান গাওয়া হয়ে থাকে), সাইংবক (ধর্মীয় সঙ্গীত), আফয়েঃ (বর্তমানে বিলুপ্ত এই লোকগীতি পূর্বে রাজাদের সামনে বেহালা বাজিয়ে পরিবেশন করা হতো), সোইং আকাহ (বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে পরিবেশিত নৃত্যগীত) প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী নৃত্যগীত। এ ছাড়া ঙচোয়ে আকাহ (এক ধরনের গীতিনৃত্য। প্রাচীনকালে একজন শিল্পী মারমা সমাজ সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে নৃত্য ও গানে বাড়ি বাড়ি পরিবেশন করতেন। বর্তমানে বিলুপ্ত), লংবাই আকা (চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষ উপলক্ষে নৃত্যগীত), ছিমুই খোয়ও আকা (ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নৃত্যগীত), নে-ছমুই (রূপকথানির্ভর পরীনৃত্য), বুলু (মুখোশ নৃত্য) প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী নৃত্যগীত রয়েছে মারমাদের। প্রকৃতির সঙ্গে মারমা নৃগোষ্ঠীর অন্তর্লীন সংলগ্নতা এসব নৃত্যগীত ও নাট্য আঙ্গিকের মধ্যে পরিস্ফুটিত। তাদের গোষ্ঠীগত ধ্যানধারণাপ্রসূত এসব নৃত্য, গীত ও নাটকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত। এসব কবিতা আখ্যানধর্মী যেমন, তেমনি ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনার আত্মগত অনুভূতিপ্রধানও। এগুলো অধিকাংশই পরিবেশন করা হতো আসরে আসরে কিংবা জুমের সময়ে কর্মের অবসরে। ফলে লোকগীতি নামে পরিচিত এই কাব্য বা সঙ্গীত যা-ই বলি না কেন, তাকে কবিতার সঙ্গে অদ্বৈত ভাবলেই মারমা কবিতার একটি পূর্বাপর ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। চিংলামং চৌধুরীর এই যুক্তিটি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। মারমা ভাষা বেশ সুরধর্মী। সুরের ভেতর দিয়ে যেন একটি জনগোষ্ঠীর আশা-আনন্দকে স্পর্শ করার প্রয়াস পেয়েছেন কবিরা। জুমচাষের সময় দুই পাহাড়ে অবস্থানকারী যুবক-যুবতী তাদের মনের কথা প্রকাশ করে গানে গানে। তাৎক্ষণিকভাবে রচিত কিংবা চর্চিত গানের মধ্য দিয়ে তারা ভাবের আদান-প্রদান করে। কাপ্যার ভেতওে মারমা নৃগোষ্ঠীর নর-নারীর ব্যক্তিগত জীবন ও কৃষিকেন্দ্রিক জীবনভাবনার একটি আত্মগত মগ্নতার রূপ বিধৃত হয়েছে। চিংলামং এই বিষয়গুলো তার আলোচনায় নিয়ে এসে মারমা কাব্যচর্চার প্রেক্ষাপটকে খুব পোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। মারমা ভাষায় যারা আধুনিক কবিতা লিখছেন তারা চিংলামং চৌধুরীর এই পরামর্শটি কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু সুরের বন্ধন থেকে কবিতার মুক্তি পাওয়ার যে লক্ষণটি চিংলামং আধুনিকতার চিহ্ন বিবেচনা করেছেন তা কিন্তু পাশ্চাত্যের ধারণা। এই ধারণার আলোকে কাব্যবিচার করতে গেলে শুধু নৃগোষ্ঠী কবিতাই নয়, বাংলা কবিতাও আধুনিকতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করবে। মারমা কবিতা তো সেখানে দিকচিহ্নহীন অকূলে ভাসবে। আসলে প্রত্যেক জাতির শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করতে হয় তার নিজস্ব শিল্পভাবনা ও নন্দনভাবনার আলোকে। বাঙালির জীবন সঙ্গীতময় বলেই তার কবিতার সঙ্গে সঙ্গীতকে অচ্ছেদ্য করা কঠিন। মারমা ভাষার কবিতা কিংবা গানকেও আমরা খুব আলাদা করতে পারি না। আমি মারমা পাংখুম ও জ্যা পরিবেশনায় দেখেছি, গানের স্বতন্ত্র প্রয়োগ যেমন রয়েছে তেমনি সংলাপও বাদ্যযন্ত্রের তালে-সুরে-লয়ে পরিবেশিত হয়। মৌখিক রীতির এই নৃত্য-গীত-কবিতার কথা এ জন্যই বলেছি, এসব কবিতা কিংবা গীতের ধমনী ও শিরায় প্রবাহিত নৃগোষ্ঠী নর-নারীর জীবনাচরণ, সংস্কার এবং লোকাচার। এই বিষয়গুলো আধুনিক মারমা কবিতায় অনুষঙ্গ কিংবা কবিতার উপাদান হিসেবে এলে নবরীতির মারমা কবিতা স্বতন্ত্র হয়ে উঠতে পারবে। আধুনিকতা বলতে আমরা এমন কিছুকেই বোঝাতে চাই, যা খুবই সাম্প্রতিক এবং তা ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে উস্কে দেয় আধুনিকতা নামের এই বোধটি। একই সঙ্গে মানুষকে স্বভূমিজাত শিল্পবোধের সঙ্গে বিশ্বানুভূতির সংশ্লেষ ঘটায়। তাই মারমা কবিতার আলোচনায় আধুনিকতাকে স্পর্শ করতে গিয়ে যদি তার লোকঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা হয় সঙ্গীত বলে তাহলে মারমা কবিতা একেবারেই উন্মূূল বলে বিবেচিত হবে। কারণ মারমা নৃগোষ্ঠীর এমন কোনো অনুষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে সঙ্গীত নেই। বলা হয়ে থাকে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই নৃগোষ্ঠী সঙ্গীতে বসবাস করে। চিংলামং যথার্থভাবেই তাঁর আলোচনায় কাইপ্যা, ব্যাসা, রুদুঃ, লাঙগা প্রভৃতির উল্লেখ করেছেন। রুদুঃ শ্রবণকালে আমার কাছে মনে হয়েছে, এর সুর খুবই কোমল। কাহিনীভিত্তিক এই মারমা লোকগীতি মৌখিক রীতির আখ্যান। কিন্তু আধুনিককালে যারা মারমা ভাষায় কবিতা চর্চা করছেন তাদের লেখায় এই ঐতিহ্যের অনুরণন তেমন লভ্য নয়। তাদের অনেকের মধ্যেই একটা উন্মূল আধুনিকতাবোধ কাজ করে। যে অর্থে আধুনিক কবিতা বলে কবিতাকে গণ্য করা হয়, সেই ধারায় এখনও মারমা কবিতার প্রবেশ কিংবা উত্থান ঘটেনি। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন। মারমা সঙ্গীত কিংবা সুরকে পরিহার না করেও মারমা কবিতার গঠন কাঠামোতে এর ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিকের প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব। আধুনিক জীবনজিজ্ঞাসাকে অঙ্গীকৃত করে কবিতার বিষয় ও ভাষারীতি তৈরি হবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে।
আধুনিক মারমা কবি ও কবিতার আলোচনায় প্রাবন্ধিক চিংলামং চৌধুরী কবি মনতোষ মারমার একটি কবিতার উদৃব্দতি দিয়েছেন। কবিতাটির মধ্যে নৃগোষ্ঠী মারমাদের জুম ও পাহাড়কেন্দ্রিক জীবন-জীবিকার পরিচিহ্ন বিদ্যমান। কবিতাটি মারমাদের লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় কৃত্যকে অবলম্বন করে আধুনিক মননশীলতায় বিন্যস্ত। আমরা মারমা জ্যা পরিবেশনার শুরুতে দেখেছি, আসর বন্দনার নামে নৃত্যশিল্পীরা নৃত্য ও গীতে চারদিক, বনদেবতা, বৃক্ষদেবতা, খারাপ ভূত, ভালো ভূতের বন্দনা করে। সর্বপ্রাণবাদী জীবনজিজ্ঞাসার একটা স্পষ্ট ধারণা এখানে লভ্য। মনতোষ মারমা এই বোধটি তার কবিতায় তুলে ধরেছেন। এই কবিতায় মারমা লোকঐতিহ্যের আধুনিক ব্যবহার আমার নিকট একটি চমৎকার প্রয়াস বলে মনে হয়েছে। সেমিনারে কবিতার ওপর মুক্ত আলোচনায় আমি বলেছিলাম, মারমা ভাষায় কবিতা যারা লিখছেন তাদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা সম্ভব হয় না প্রকাশনার অপ্রতুলতার কারণে। বিভিন্ন সংকলনে মারমা কবিদের কবিতা আমি পড়েছি। বাংলা অনুবাদ পড়ার পর দেখেছি, একটি সম্ভাবনাময় পথ ধরেই হাঁটছেন আধুনিক মারমা কবিগণ। মারমা ভাষা সঠিক উচ্চারণে বাংলায় স্থানান্তর একটি দুঃসাধ্য বিষয়। আবার মারমা লিপিতে লিখলে তা মারমাদের পক্ষেই বোঝা কঠিন, বৃহত্তর পাঠকদের তো কথাই নেই। এ রকম একটি কঠিন সমস্যার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে আধুনিক মারমা কবিতা।
বান্দরবান সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত মারমা গানের সংকলনে গান পাঠ করেছিলাম অনেক দিন আগে। কিন্তু সংকলনটিকে গান হিসেবে না দেখলে তা চমৎকার কবিতা সংকলন হতে পারে। এসব গানে কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে। সেটুকু বাদ দিলে বহু গানই চমৎকার কবিতা। ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, মারমা জীবনে সুরের যে প্রভাব তা বাদ দিয়ে তার আধুনিক কবিতা এখনই রচনা সম্ভব নয়। সংকলনটিতে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, চাওয়া-পাওয়া কিংবা আশা-হতাশার কথা আছে। চ থুই ফ্রু-এর লেখা 'লাহ্ প্রংরে অখ্যিং মা' গানটিতে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত একটি রাতে একজন প্রতীক্ষারত মানুষের হৃদয়বেদনার কথা উঠে এসেছে। কয়েকটি লাইন তুলে দেই_
দে পইং লাহ্প্রং ওে অখ্যিং মা/কো খ্যসুগো এম্রে সিদিরা/তয়কতে থইংরো চং নিওে খ্যসুগা ল্ফাহ/আস্বা আস্বা কাখ্যাং আসাইং যাখা ক্রা ফোলে/মং গো খ্য রো যাখা থইংফোলে আনামা
(কবিকৃত বঙ্গানুবাদ)
এই চাঁদনী রাতে তোমায় পড়েছে মনে/একা বসে আছি এলে না তুমি/চুপিসারে কবে নূপুরের সুর তুলবে/কবে ভালোবেসে বসবে পাশে এস এ প্রু সম্পাদিত উপজাতীয় সঙ্গীত পুস্তিকা প্রথম খণ্ডে এই মারমা গানগুলো প্রকাশিত হয়েছে। এই সংকলনে ক্য শৈ হ্লা, উ চ হ্লা, ক্য শৈ প্রু, চ থুই ফ্রু, ক্য মাং উ প্রমুখ গীতিকারের ২৪টি গান সংকলিত হয়েছে। চিংলামং এগুলোকে গান বিবেচনা করে হয়তো আলোচনায় আনেননি। এই প্রবন্ধে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকলে পাঠকের মারমা কবিতার সুরধর্মিতা বুঝতে সুবিধা হতো।
চিংলামং চৌধুরীর প্রবন্ধটিতে মারমা কবিদের কালওয়ারি একটি তালিকা থাকা দরকার ছিল। লোকঐতিহ্যনির্ভর কবিতা থেকে কবে কীভাবে মারমা কবিতা আধুনিকতাকে স্পর্শ করতে চাইল সে সম্পর্কে একটি আলোচনা থাকতে পারে। এই প্রবন্ধে উলি্লখিত কবিদের পরিচিতি ও সময়কাল দেওয়া দরকার। কারণ কবিরা বৃহত্তর পাঠকের কাছে এখনও পেঁৗছাতে পারেননি ভাষা ও পরিচিতির কারণে। চিংলামং হয়তো ধারণা করেছেন, তার মতো সবাই মারমা সাহিত্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত। চিংলামং যে নিবিড় গবেষণা করেছেন তাতে তিনি আধুনিক মারমা কবিতার পূর্বাপর সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত। আমার বিবেচনায় তার পরামর্শ গ্রহণ আধুনিক কবিদের জন্য জরুরি। আমি যতটুকু জানি, আধুনিক মারমা কবিতার ওপর এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ আলোচনা। তাই এই প্রবন্ধের একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। মারমা ঐতিহ্যকে অঙ্গীকৃত করে আধুনিক মারমা কবিতা চর্চা অব্যাহত থাকলে কবিরা ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি আরও সংলগ্ন হতে পারবেন। স্বজাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি না হলে আধুনিকতাকে স্পর্শ করা দুরূহ। এ বিষয়টি আশা করি চিংলামং তার পরবর্তী লেখায় বিস্তারিত তুলে ধরবেন। মারমা কবি মংসুইচিং চৌধুরীর কবিতায় লোকঐতিহ্য গ্রহণের বিষয়টি রয়েছে। লোকগানের রাত্রে তার কাছে প্রিয়তমা নারী যেন গন্ধরাজ ফুল। প্রিয়তমাকে কবি লিছুওয়া ফুল দেবেন বলে আশা নিয়ে বসে থাকেন। এই ফুলটি বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়ার ধারে ত্রিশ বছর অন্তর প্রস্ফুুটিত হয়। প্রতীক্ষাকে এমন করে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতীকায়িত করে কবিতাটিতে কাব্যিক মাধুর্য সঞ্চারিত করেছেন কবি। কবির ভাষায়_
লুগে-লুলি আপং সুংছে/তংগ্রী-তংশ্যে ম্রংগু ছেংব/মেরচ্শ্যেগু মংরচ্শ্যে গা-/পিলিমে লিছুওয়াপেং।
(বঙ্গানুবাদ)
লাগলে লাগুক না ত্রিশ বছর/পাহাড়-টিলা ছড়া পেরিয়ে/প্রেয়সীকে প্রিয়-/দেবে লিছুওয়া ফুল।
চিংলামং চৌধুরী তার প্রবন্ধে মারমা লোককবির কবিতা ছাড়াও মনতোষ মারমা, মংসুইচিং চৌধুরী, রেপ্রু চাই মারমা বাবু, অংসুই মারমা, মংক্য শোয়েনু নেভী, সাথোয়াই মারমা, অংচাইরী মারমা, চাই সুই হ্লা মারমা প্রমুখ কবির কবিতা আলোচনার মাধ্যমে মারমা ভাষায় লেখা আধুনিক মারমা কবিতার বিষয় ও আঙ্গিক বিচার করেছেন। ব্যক্তিগত প্রেম, কৃষিজীবন, সামাজিক দায়িত্ববোধ, অন্যায়-অবিচার-অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে কবিতায়। মারমা লোকঐতিহ্য, সাহিত্য এবং পুরাণ মারমা কবিতায় নবমাত্রিকতায় প্রয়োগ ঘটেছে। কিন্তু এই প্রয়াস এত সীমিত যে, এটিকে প্রাথমিক যুগ বলা যেতে পারে। আমি বিভিন্ন সংকলনে আরও অনেক মারমা কবির কবিতা পাঠ করেছি। বিভিন্ন সংকলনে মারমা গান প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে রাঙামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত গিরিনির্ঝর পত্রিকায় মাম্যাচিং-এর দুটো গান ছাপা হয়েছিল। আমি আগেই বলেছি, গান অভিধা ভুলে যেতে পারলে এগুলোকে চমৎকার কবিতা বলে মনে হবে। এই কবিতা কিংবা গানে প্রিয়তমের কাছে যাওয়ার ব্যাকুলতা ফুটে উঠেছে। চিংলামং চৌধুরী আরও খোঁজ করলে বহু মারমা কবিতার সন্ধান পাবেন। শুধু মারমা ভাষায় নয়, বাংলা ভাষায়ও বহু মারমা কবি কবিতা লিখেছেন। আশির দশক থেকে যাত্রা শুরু হওয়া আধুনিক মারমা কবিতা এখনও ভাষার প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তবে মারমা কবিদের মধ্যে লেগে থাকার প্রবণতা কম বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান। চিংলামং-এর লেখাটি মারমা কবিদের সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে। মংক্য শোয়েনু নেভীর একটি কবিতা দিয়ে মারমা কবিতা সম্পর্কে আমার কৌতূহলের ইতি টানব। কবি মংক্য শোয়েনু নেভী নিজেদের শিল্পঐতিহ্য ও ভূমিতে দাঁড়িয়ে কবিতার নতুন ভাষা বিনির্মাণের কথা বলেছেন। এই প্রবণতাটি সব মারমা কবির ভেতরে ক্রিয়াশীল থাকলে হয়তো একদিন আধুনিক মারমা কবিতার সত্যিকার প্রতিষ্ঠা ঘটবে। নেভীর কবিতার নাম 'নৈরাসীহ্ টাইংখুংলাহ'। বাংলায় অনুবাদে নাম 'ফাল্গুনের দাবদাহ'।
রাংথেহ্মা খাইংজাহ্ক্ষ্যাক আব্রেহ্/চিচাইক্সুহ্ মেহিং-ফ্রাইংপিহ্সুহ্ মেহিং,/মার্মামা জাইত্, পাংখুং, লাংগা আব্রেহ্/য়েগেলেহ ছোফোসুহ্ মেহিং- কাহ্খুংসুহ্ মেহিং।
(বঙ্গানুবাদ)
আমাকে উচ্চারণ করতে দাও-/জাইত, পাংখুং, মারমা লাংগা
শব্দাবলির প্রমিত ধ্বনি।
'কবি ও কবিতা :পার্বত্য চট্টগ্রাম' শীর্ষক সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধ ও উপস্থিত কবি-বুদ্ধিজীবীদের আলোচনা শুনে আমার কাছে স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান, পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠী কবিতার যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে তা একদিন বিশ্বমানের হয়ে উঠবে। পাহাড়ি ভাষাগুলো কবিতার আবেগ প্রকাশের উপযুক্ত বাহন হয়ে উঠবে। এই যে শুরু হলো, এটারই দরকার ছিল। বর্তমান বাংলাদেশে সাহিত্য সম্মেলন কিংবা এমন গঠনমূলক কবি ও কবিতা বিষয়ক সেমিনারের চল উঠেই গেছে বলা যায়। সুসময় চাকমা এমন একটি আয়োজন করেছেন বলে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এই সেমিনারে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা থেকে কবি-সাহিত্যিক-পেিম্মলনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, পার্বত্য অঞ্চলে যারা মাতৃভাষায় কবিতা লেখেন তারা একটি প্ল্যাটফর্মে মিলিত হয়েছেন। তিনটি অঞ্চলের ভিন্নভাষী কবিগণ পরস্পর মতবিনিময় করেছেন। কবি-বুদ্ধিজীবীরা খোলামেলাভাবে তাদের শিল্প ও রাষ্ট্রভাবনা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রত্যেক বক্তাই ঐতিহ্য সংলগ্ন হওয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আধুনিক কবিতার ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠী কবিগণ বিশেষ করে চাকমা কবিগণ যেভাবে নিজস্ব পথ অন্বেষণ করছেন তাতে তারা একদিন নিশ্চিত আন্তর্জাতিক মানের কাব্যভুবনে পেঁৗছবেন_ সে ব্যাপরে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। হ

মন্তব্য করুন