বিশ্রামগঞ্জের বাংলাদেশ হাসপাতাল

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪      

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

একটি জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ একবারই আসে। জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধের অবিস্মরণীয় কিছু ঘটনা নিয়ে রচিত হয় ইতিহাস। সেই ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পঠিত হয়। দেশের তরুণ-যুব সম্প্রদায়কে সে ইতিহাস উদ্বুদ্ধ করে দেশপ্রেমের চেতনায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে 'বাংলাদেশ হাসপাতাল' এমনি এক অধ্যায়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের এই উদ্যোগ এবং অধ্যায়টি মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে সেভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাসপাতালটি প্রায় বিস্মৃত এক অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
আগরতলার বিশ্রামগঞ্জের একটি পেয়ারা বাগানের ভেতরে দেড় একর জমির ওপর বাঁশ-বেতের দোচালা একটি বিশাল ঘর। এই ঘরটিই যে একটি হাসপাতাল তা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, সীমিত সুবিধার এই হাসপাতালটি একাত্তরে কয়েক হাজার আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা এবং উদ্বাস্তুকে চিকিৎসা সুবিধা দিয়েছে। প্রাণে বাঁচিয়েছে অগণিত যোদ্ধাকে। বিশেষ করে এই হাসপাতালের কার্যক্রম মুক্তিবাহিনীর মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
হাসপাতালের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বীরপ্রতীকের দেওয়া বয়ান ও বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (নবম ও দশম খণ্ড) থেকে জানা যায়, হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার মূল নায়ক ছিলেন ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ। তিনি জানান, যুদ্ধের শুরুর দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবার জন্য কোনো হাসপাতাল ছিল না।
সেই সময় খালেদ মোশাররফের সঙ্গে সেনাবাহিনীর এক চিকিৎসক ছিলেন ক্যাপ্টেন আখতার। খালেদ মোশাররফ চিন্তা করলেন রণাঙ্গন সেক্টরেই সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সে কারণে তিনি ক্যাপ্টেন আখতারকে ২নং সেক্টরের সদর দপ্তরের কাছে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করার নির্দেশ দেন। আগেই ২নং সেক্টরে ঢাকা থেকে কিছুসংখ্যক ছেলেমেয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মেডিকেল কলেজের দু'একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক। তাদের নিয়ে মতিনগরে খালেদ মোশাররফের হেড কোয়ার্টারের কাছে ক্যাপ্টেন আখতার কয়েকটি তাঁবুতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সর্বপ্রথম বাংলাদেশ হাসপাতালের ভিত্তি স্থাপন করেন।
শান্ত ও সুন্দর পরিবেশে সেখানকার একটি পেয়ারা বাগানের ভেতর হাসপাতালটির অবস্থান। প্রথমদিকে, হাসপাতালে ওষুধপথ্য এবং অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জাম ছিল না। ক্যাপ্টেন আখতারের কঠোর প্রচেষ্টায় নবীন চিকিৎসক ও তাদের সহযোগী দলটি সব বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে হাসপাতালটি গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
আখতারের সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বেগম সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে টুলু ও লুলু, মেডিকেলের ছাত্রী ডালিয়া, আসমা, রেশমা, সবিতা, শামসুদ্দিন প্রমুখ। আরাম-আয়েশ সবকিছু জীবন থেকে মুছে ফেলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত যোদ্ধা, সৈনিক ও মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের সেবা-শুশ্রূষা ও চিকিৎসা দিতে থাকে দলটি।
হাসপাতালে জুন মাসে যোগ দেন লন্ডনপ্রবাসী ডা. মবিন। কিছুদিন পর লন্ডন থেকে আসেন ডা. মবিনের বন্ধু ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তারা দু'জনেই লন্ডনে এফআরসিএসে অধ্যয়নরত ছিলেন। এ ব্যাপারে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গেও তাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। সৈনিক এবং মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের চিকিৎসার শোচনীয় অবস্থার কথা জেনে কর্নেল ওসমানী খালেদ মোশাররফকে হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনায় উৎসাহ দেন। ভারতীয় ব্যবসায়ী হাবুল ব্যানার্জি স্বেচ্ছায় বিশ্রামগঞ্জে তার পেয়ারা বাগানের দেড় একর জমি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য ছেড়ে দেন। সেখানে একাত্তরের মে মাসের মধ্যে বাঁশ-কাঠ ও ছনের চাল দিয়ে দুইশ' শয্যার একটি হাসপাতাল তৈরি করেন আখতার ও তার সহযোগীরা। পরে সেখানে শয্যার সংখ্যা চারশ'তে উন্নীত করা হয়।
সেনাবাহিনীর চিকিৎসক ডা. ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম একাত্তরের জুলাইয়ের শেষ দিকে বাংলাদেশ হাসপাতালে সিও হিসেবে যোগদানের পর গোটা হাসপাতালটিতে সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরে এসেছিল। তিনি তার মেধা, শ্রম, দক্ষতা ও সেবা দিয়ে সবার মন জয় করেছিলেন। মুক্তিপাগল বাঙালিকে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছেন। লন্ডন থেকে ডা. মবিন, ডা. জাফরুল্লাহ, ডা. কিরণ সরকার দেবনাথ, ডা. ফারুক মাহমুদ, ডা. নাজিমুদ্দিন, ডা. আকতার, ডা. মুর্শেদ প্রমুখ এ হাসপাতালে কাজ করে সিতারা বেগমের কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
১৬ ডিসেম্বর রাতে বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে রেডিওর মাধ্যমে হাসপাতালের কমান্ডিং অফিসার ডা. সিতারা বেগম ও তার সহকর্মীরা ঢাকা মুক্ত হওয়ার সংবাদ পান। ডিসেম্বরের শেষের দিকে তিনি কলকাতায় বদলি হন। এর এক সপ্তাহ পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। মুক্তিযুদ্ধে এ মহিয়সী নারীর সাহসী অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন সিতারা বেগমকে 'বীরপ্রতীক' খেতাব দেওয়া হয়।
ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বর্তমানে স্বামীসহ আমেরিকায় বসবাস করছেন। কিশোরগঞ্জের বাসায় তার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা এটিএম সাফদার জিতু এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতাল মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল। অথচ এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান পায়নি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।