আজকের পত্রিকা

বাংলা উইকিপিডিয়ার অগ্রযাত্রা ঈর্ষণীয়

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০১৫     আপডেট: ০৩ মার্চ ২০১৫

বাংলা উইকিপিডিয়ার অগ্রযাত্রা ঈর্ষণীয়

উইকিপিডিয়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়ালেস


ইন্টারনেট ভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়ালেস গত বৃহস্পতিবার কয়েক ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশ সফর করেন। সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলা উইকিপিডিয়ার দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। এর এক ফাঁকে সমকালের সঙ্গে উইকিপিডিয়া এবং বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমদাদুল হক

প্রশ্ন :আজ থেকে ১৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় উইকিপিডিয়া। শুরুটা কীভাবে?

জিমি :শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল খুবই সাধারণ। নানা ভাষাভাষীর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি। এই তথ্যভাণ্ডারটি হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। ১৯৯৩ সালে রিক গেস অনলাইন বিশ্বকোষ নিয়ে যে কাজটা করেছিলেন তা থেকে আমাদের উদ্যোগটি ছিল একেবারেই স্বাতন্ত্র্য। তাই কাজটি ছিল বেশ জটিল। এই জটিল কাজটি সহজে সম্পন্ন করার উপায় ছিল একটিই। সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করা। কমিউনিটি তৈরি করা। যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম ইন্টারনেটে আমরা সেই কাজটিই করেছি। শুরুটা একাই করেছিলাম। অল্পদিনের মধ্যেই আমার সঙ্গে যোগ দেন ল্যারি [লরেন্স মার্ক ল্যারি সাঙ্গার]। দু'জনে মিলে ২০০১ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করি। আমরা চেয়েছিলাম সব ভাষার তথ্যই এখানে থাকবে। সব ধরনের মানুষও যাতে এতে অবদান রাখতে পারে, সেটাও আমরা ভেবেছি। তারই ফল হলো উইকিপিডিয়া। বাংলা উইকিপিডিয়া শুরুর পেছনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন রাগিব হাসান। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এখানে একটি বড় কমিউনিটি গড়ে উঠেছে।

প্রশ্ন :মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় যে বিপুল তথ্যভাণ্ডার রয়েছে সেখানে বাংলা উইকিপিডিয়ার কী অবস্থা?

জিমি :বাংলা বিশ্বের অন্যতম ভাষা। বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষীর সংখ্যাও অনেক। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো অনলাইনে এ ভাষায় পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাই এটি নিয়ে কাজ করতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়। অবশ্য ইতিমধ্যে আমরা এ ভাষায় তথ্য সমৃদ্ধির জন্য স্বেচ্ছাসেবীদের দারুণ একটা সমাবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। তারাই উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে অনলাইনে বাংলা ভাষার তথ্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করছে। সত্যি তাদের অংশগ্রহণ আমাকে অভিভূত করেছে। তবে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ কিন্তু বেশ ভালো করছে। বাংলায় এখনও অনেক তথ্য অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন রয়েছে।

প্রশ্ন :বাংলা উইকিপিডিয়া কমিউনিটিতে মোট কতজন স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন? কী পরিমাণ বাংলা কনটেন্ট এখানে রয়েছে? অনলাইনে বাংলার এই তথ্যভাণ্ডারটি বৈশ্বিক বিবেচনায় কতটা সমৃদ্ধ?

জিমি :বাংলা উইকিপিডিয়ায় মোট ৭৭ হাজার নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০০ থেকে ৩০০ জন প্রশাসক ও প্রদায়ক সক্রিয়। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছেন যারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাজ করেন। স্থানীয়ভাবে ১০ থেকে ২০ জন স্বেচ্ছাসেবী প্রতি মাসে এখানে গড়ে শতাধিক আর্টিকেল প্রকাশ করেন। সব মিলিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানে ৩৪ হাজার ৮২৫টি নিবন্ধ ছিল। এর মধ্যে অনেক লেখাই বেশ সমৃদ্ধ। সব মিলিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ার অগ্রগতির ধারা ঈর্ষণীয়। ভাষাগত দিক থেকে এটি এখন তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

প্রশ্ন :বিশ্বজুড়ে উইকিপিডিয়ার মতো অনেক ওয়েবসাইট রয়েছে। তবে জনপ্রিয়তায় কোনোটিই এর ধারেকাছে নেই। ওয়েবে এর অবস্থান ষষ্ঠ। কীভাবে এলো এই সফলতা?

জিমি :আমার মনে হয়, সাইটের সাদাসিধে লুক এই সাফল্যের বড় কারণ। আসলে আমরা খুবই সাধারণ। প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রতিটি ভাষার জন্য তথ্যকে উন্মুক্ত রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তাই আমরা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হয়েও সাইটে কোনো বিজ্ঞাপন রাখিনি। এ ব্যবস্থাটি নিরপেক্ষ তথ্য প্রচারের স্বার্থে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি তথ্যকে নিরপেক্ষ রাখতে। মানুষ হিসেবে আমরা সবসমই যে ঠিক তথ্য দিতে পারি তা বলব না। এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য সূত্র থেকেই তথ্য সমৃদ্ধ করা হচ্ছে যা ইতিমধ্যে মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের সবারই জানা, ডটকম যখন পুরোদস্তুর অবস্থায় তখনও উইকিপিডিয়া ছিল শিশু। ওই সময় এটি জ্ঞান বিনিময়ের খুবই সাধারণ একটি প্রযুক্তি ছিল প্রচুর মানুষের কল্পনাকে ছুঁতে পেরেছিল। এখনও এতে মানুষের সমান আগ্রহ রয়েছে।

প্রশ্ন :উন্মুক্ত মডেল হওয়ায় উইকিপিডিয়াতে যে কেউই সংযুক্ত হয়ে নিবন্ধ যোগ করতে পারেন, সম্পাদনা করতে পারেন। ফলে উইকিপিডিয়াতে যুক্ত হওয়া তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। অনেকেই উইকিপিডিয়ার তথ্যে আস্থা রাখার খুব একটা পক্ষপাতি নন। সে ক্ষেত্রে উইকিপিডিয়া নির্ভুল তথ্য নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নিয়ে থাকে?

জিমি :নির্ভুল তথ্য নিশ্চিতের একমাত্র উপায় হচ্ছে নির্ভরযোগ্য একটি কমিউনিটি গড়ে তোলা। আমরা সেই কাজটি করার প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছি। একাধিক সূত্রের সঙ্গে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তথ্যসূত্রও উল্লেখ করা হচ্ছে। তাতে সাফল্যও মিলেছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য নিয়ে যারা সন্দিহান ছিলেন তাদের অনেকের কাছেই এখন এটি আস্থার স্থান দখল করে নিয়েছে। তাই আমি চাই, গণমাধ্যম কর্মীরা যেন এখানে তথ্য খোঁজার চেয়ে নির্ভুল তথ্য সমৃদ্ধ করতে অবদান রাখেন। এর ডিসকাশন পেজে গিয়ে নিজেরাও উইকিপিডিয়ানদের মতো কন্ট্রিবিউট করবেন।

প্রশ্ন :২০১২ সাল থেকে আমরা দেখে আসছি, বিভিন্ন দেশের সরকার অপছন্দের কারণে উইকিপিডিয়ার কিছু পেজ 'নিষিদ্ধ' করতে বা মুছে দিতে চেষ্টা করছে। বিষয়টি উইকিপিডিয়া কীভাবে মোকাবেলা করছে?

জিমি :আমার মনে হয়, বিশ্বজুড়ে এটি একটি বড় সমস্যা। অনেক দেশেই আমাদের কাজে বাদ সেধেছে। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির তথ্যই সাইটে উপস্থাপন করাই তো আমাদের কাজ। হাস্যকরভাবে কোনো সরকার চায়নি জনগণ ওই সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো জানুক। যদিও জানাটা ব্যক্তির মানবিক অধিকার। ব্যক্তিগতভাবে মত প্রকাশ এবং জ্ঞান অর্জনের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, দৃঢ় মনোভাবের অধিকারী। তাই প্রতিবাদ জানিয়েছি। ফলে ইতালিতে উইকিপিডিয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাশিয়ায় উইকিপিডিয়ানরা বিক্ষোভ করেছে। এটা সরকারের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। এর বাইরে আমরা কিইবা করতে পারি? সব ধরনের সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই উইকিপিডিয়া ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তথ্যকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে। সেন্সরশিপ বিষয়ে চীন সফরে গিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে বিতর্ক করেছি। সেখানে স্থানীয় উইকিপিডিয়ান, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। সত্যি, বড়ই সৌভাগ্যবান আমি।

প্রশ্ন :বিশ্বের অন্যতম ইন্টারনেট উদ্যোক্তা হয়েও আপনি উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে সম্পদশালী নন। এজন্য কী কখনও কোনো অনুশোচনা হয়? উইকিপিডিয়াকে বাণিজ্যিক মডেলে নিয়ে আসার কোনো অভিপ্রায় আছে কি?

জিমি :না, একেবারেই নেই। হতে পারে আগামী এক হাজার বছর পর মানুষ হয়তো গুগল বা ফেসবুকের কথা মনে রাখবে না। তবে উইকিপিডিয়ার কথা মনে রাখবে। কারণ এটা একটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। অতীতকে স্মরণ করে মানুষ তখন বলবে, একটা সময় ছিল যখন একটি কমিউনিটি যূথবদ্ধ হয়েছিল এবং পৃথিবীতে এক সুবিশাল তথ্যভাণ্ডার উপহার দিয়ে গেছে। হ্যাঁ, জীবন উপভোগ করতে হয়তো অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। অবশ্য আমার জীবনে এমনিতেই আনন্দের অনেক উপকরণ রয়েছে। জীবনের স্বল্প সময়ে যথেষ্ট পেয়েছি।

প্রশ্ন :উইকিপিডিয়ার মতো বিভিন্ন দেশে এমন বেশ কিছু কমিউনিটি রয়েছে। এই যেমন- মজিলা কমিউনিটি। নিকট ভবিষ্যতে কী এসব কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে?

জিমি :হ্যাঁ, নিশ্চয় আছে। আমরা অবশ্যই বৃহত্তর কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করব। ইতিমধ্যে সেই পরিকল্পনা নিয়ে কাজও চলছে। একেক সময়ে আমরা একেক জনের সঙ্গে কাজ করব।

প্রশ্ন :এখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বেশ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কি উইকিপিডিয়ায় ভিডিও কনটেন্ট দেখতে পাব?

জিমি :এর জবাব হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে। কারণ, ভিডিও কনটেন্টের ফলে আমাদের কাজ সহজতর হবে। এখন অনেকের কাছেই উচ্চমানের ভিডিও ক্যামেরা থাকে। এটা ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরির কাজকে সহজতর করে দেয়। ইতিমধ্যে আমরা চারপাশের দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি তোলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলাম। অধিকন্তু উইকিপিডিয়া ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকেও ভিডিও কনটেন্টের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। বিশ্বকোষ প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করার কথা বিবেচনায় ডকুমেন্টই সুবিধাজনক। ভিডিও এডিট করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তারপরও আমরা বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি।

প্রশ্ন :স্থানীয় তথ্য সমৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা উইকিপিডিয়ার আছে কী?

জিমি :প্রয়োজনের নিরিখে কিছু সুযোগ এখানে রয়েছে। গ্যালারি ও লাইব্রেরির মতো এখানে অনেক ইনস্টিটিউশন রয়েছে, এগুলো উইকিপিডায় অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। অবশ্য এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্টতায় রাজনৈতিকভাবে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। তারপরও আমরা সরকারের ঐকান্তিক সমর্থন চাই।

প্রশ্ন :সার্চ ইঞ্জিন এবং সোশ্যাল মিডিয়াগুলো উইকিপিডিয়া থেকে তথ্য নিয়ে সরাসরি ব্যবহার করছে। এতে কি উইকিপিডিয়ার ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে?

জিমি :অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের লক্ষ্য তথ্যভাণ্ডারে সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। তাই যে কেউ চাইলেই এ তথ্য ব্যবহার করতে পারে। ফলে গুগল এখন তথ্যসূত্র হিসেবে উইকিপিডিয়ার লিংক ব্যবহার করছে। এটা আমাদের ট্রাফিক বাড়াতে সহায়তা করছে।

প্রশ্ন :নাগরিকের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর সরকারের নজরদারির বিরুদ্ধে আপনি বরাবরই সোচ্চার। এক্ষেত্রে উইকিপিডিয়া ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণে কতটা যত্নবান?

জিমি :আমরা এখন ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে উইকিপিডিয়া ব্যবহারকারীদের সব তথ্যই এনক্রিপ্টেড থাকবে। এজন্য এখন আমরা কারিগরি ও কৌশলগত বেশ কিছু বিষয় নির্ধারণ করছি। আমরা উইকিপিডিয়া ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণে সবোর্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। কেবল সরকারের কাছ থেকে নয়, নিয়োগদাতা, সহযোগী এমন অন্য যে কারও কাছে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা বজায় রাখি।