মানবজীবনে স্বাধীনতা আল্লাহতায়ালার অপূর্ব দান। স্বাধীনতা যে কত বড় নেয়ামত, পরাধীন ব্যক্তিই তা অনুধাবন করতে পারেন। পরাধীনতা মানুষের জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে বড় বাধা। পরাধীন মানুষ কখনও একান্তে বসে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে না। স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষায় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বলেছেন, 'প্রত্যেক মানবসন্তান ফিতরাত তথা স্বভাবজাত ধর্মের ওপর জন্মগ্রহণ করে।' এই ফিতরাতের মধ্যেই স্বাধীনতার মর্মকথা নিহিত।
স্বাধীনতা একজন মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রথম অধিকার। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে নিয়ে সর্বপ্রকার স্বাধীনতাকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। রাসূলুল্লাহর (সা.) সারা জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্যের অন্যতম ছিল, মজলুম জনতার স্বাধীনতা অর্জন করা এবং তাদের আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। তিনি আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ' বছর আগে আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার পরাধীনতা দূর করে মদিনা নগরীতে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিতকে মজবুত করার জন্য মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের নিয়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানবিক ও ধর্মীয় অধিকারকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন, যা 'মদিনা সনদ' নামে প্রসিদ্ধ। একটি স্বাধীন কল্যাণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এটিই পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান।
স্বাধীনতা রক্ষা ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'একদিন ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া পৃথিবী ও তার অন্তর্গত সবকিছুর চেয়ে উত্তম।' অন্য হাদিসে বলেছেন, 'মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তার আমল আর বৃদ্ধি পায় না। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে ব্যক্তি কোনো ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার আমল কেয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং কবরের প্রশ্নোত্তর থেকেও সে মুক্ত থাকবে।' -তিরমিজি
আল্লাহতায়ালা তার প্রতিনিধি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়ে মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তাই মানুষ স্বাভাবিকভাবে এবং সঙ্গত কারণে স্বাধীনচেতা। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনো ধরনের পরাধীনতাই ইসলাম সমর্থন করে না। রাসূল (সা.) একটি স্বাধীন ভূখণ্ড লাভের জন্য কঠোর সাধনা করেছিলেন। পৃথিবীতে চিরসত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর তিনি ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে সে স্বাধীনতার বিস্তৃতি ও পূর্ণতা অর্জিত হয়েছিল। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে চিন্তা ও মতপ্রকাশের পূর্ণ সুযোগ দিয়ে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বতোভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কল্যাণমূলক আরব রাষ্ট্র পৃথিবীর ইতিহাসে একটি চিরন্তন আদর্শের উদাহরণ হয়ে আছে। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি স্বাধীনতা রক্ষায়ও তিনি জোরালো ভূমিকা রেখে গেছেন। রাসূল (সা.) হিজরত করার পর মদিনাকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবে গণ্য করেন এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীনতা অর্জন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবনদানকে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করেন।
১৯৭১ সালে আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতাও অনেক জানমাল এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। এই অর্জনে যারা নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, ইসলামের দৃষ্টিতে তারাও শহীদের মর্যাদায় ভূষিত। এমন ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ষ কবি ও কলাম লেখক

মন্তব্য করুন