অতিথি আপ্যায়নে বাঙালি খাবার সাজাতে চাই ষোলোআনা বাঙালিয়ানা। সে জন্য মাটির বাসন-কোসন এবং তৈজসের বিকল্প কী?
তৈজসপত্র মৃৎশিল্পের সবচেয়ে প্রাচীন রূপ। বাসন-কোসন, গ্গ্নাস, মগ, কাপ-পিরিচ, বাটি_প্রয়োজন তো বটে; শখের অনুসঙ্গও। বর্তমানে সিরামিক, চিনামাটি, মেলামাইনের যুগে এর চাহিদা কমেছে। তবে কদর ও সৌন্দর্য কিন্তু কমেনি। মা-মাটির এ দেশে নববর্ষে তাই মাটির বাসন-কোসনের চাহিদাও অন্যরকম।
এখন শুধু সৌন্দর্যই নয়, সঙ্গে ব্যবহারের উপযোগী করেও তৈরি হচ্ছে এগুলো। আর এ কাজে অংশ নিচ্ছে অনেক ডিজাইনারও। নিপণ নকশায় তৈরি হচ্ছে মাটির বাসন-কোসন। শুধু উৎসবকে মনে রাখার জন্যই নয়, নিজের ব্যক্তিত্ব ও রুচিবোধও প্রকাশ পায় এটির মাধ্যমে।
কম বেশি সব সময়ই চলে মাটির তৈজস। তবে বৈশাখ মাস এলে চাহিদাটা একটু বেড়ে যায়_ জানালেন রায়েরবাজারে মাটির জিনিস বিক্রেতা নবব্রত সাহা। তিনি বলেন, অনেকে শখ করে নিজের বাসার জন্য অল্প আবার কেউ কেউ কোনো অনুষ্ঠানের জন্য বেশি করে অর্ডার দিয়ে যাচ্ছেন এখানে। আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এটি আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
বাসন-কোসন
এ যুগে ডাইনিং টেবিলে অথবা প্লেট রাখার স্থানে মাটির বাসনের দেখা মেলাই কষ্ট। কিন্তু যারা ঐতিহ্যপ্রিয় মানুষ, তারা কিন্তু ভোলেন না এটির কথা। মাটির বাসনকে সানকি বলা হয়ে থাকে। এই সানকিই ছিল একসময়কার ভাত খাবার পাত্র। পোড়া মাটির সানকি এখন অনেক ধরনের হয়। শুধু প্লেন নয়, গায়ে থাকে বিভিন্ন নকশা। আকারে ছোট-বড় হয়। আবার ব্যবহারের সুবিধার জন্য প্লেটের ধারটা থাকে বেশ বড়। দুই ধরনের সানকি পাওয়া যায়। একটি প্লেটের মতো সমান এবং উপরটি একটু গোলাকার, যেটির আকৃতি হালকা বাটি ধরনের। তবে যে কোনো নকশার সানকির মূল্য পড়বে ৪০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যেই। অনেকগুলো থাকে রঙ করা। তবে রঙ বাদে পোড়ামাটির নেওয়াটাই ভালো।
গ্গ্নাস বা মগ
নানা মেটালে তৈরি হচ্ছে এখন পানি খাবার গ্গ্নাস বা মগ। কোনোটায় অনেক নকশা আবার কোনোটা ভিন্ন। তবে মাটির গ্গ্নাসের কদর কিন্তু কমেনি। গ্গ্নাসগুলো থাকছে অন্যান্য গ্গ্নাসের আকারেই। কোনোটার গায়ে প্লেন, কোনোটার নিচের দিকে নকশা। তা ছাড়া আছে পানি খাওয়ার মগ। এগুলোর হাতলটা বড় থাকায় ধরতে বেশ সুবিধা হয়। নানা কারুকাজ ও টেরাকোটা করা থাকে। এগুলোতে গরমের সময় পানি বেশ ঠাণ্ডা থাকে। দাম পড়বে ৩০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে।
কাপ-পিরিচ
অনেক সিরামিক কোম্পানির সুদৃশ্য চয়ের কাপের পাত্রে এটি কিন্তু কম যায় না। ছোট, বড়, মাঝারি সব আকারের পাবেন পিরিচসহ। কাপে থাকে খাঁচকাটা কাজ, তবে পিরিচে থাকে হালকা নকশা।এটির পুরুত্ব বেশ মোটা থাকে বলে গরম চা বা কফিসহ পাত্র ধরতে সুবিধা হয়। কোনোটা গোল আবার কোনোটা একটু লম্বাটে ধরনের হয়। তবে এখন মাটির জিনিসের নকশায়ও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। আর তাই তো চিনা মাটির সিরামিক ও পাইরেক্সের মতো এটাতেও এক সাইডে, হাতলে, পিরিচে পাবেন নকশা। প্রতি পিস কাপ-পিরিচের মূল্য পড়বে ৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে।
বাটি
বাটি সব সময় অনেক কাজেই লাগে। ওজনে একটু ভারী হলেও মাটির বাটি ব্যবহারের কিন্তু অনেক সুবিধা আছে। এতে জিনিস সহজে নষ্ট হয় না। অনেকক্ষণ ধরে কোনো ফল বা সবজি কেটে রাখলে সহজে কালচে ভাব আসে না। ডিজাইনে ভিন্নতার জন্য কোনোটার গভীরতা বেশি আবার কোনোটার কম। একটু বড় বাটিতে পানি দিয়ে কয়েকটি গোলাপের পাপড়ি অথবা কিছু ফুল ছড়িয়ে দিলে বাড়বে আপনার ঘরের সৌন্দর্য ও সি্নগ্ধতা। মূল্য ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে।
কোথায় পাবেন
আগে অনেক স্থানে পাওয়া গেলেও এখন কিছু নির্দিষ্ট স্থানে ভালো মানের মাটির তৈজসপত্র পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে শিশু পার্কের সামনের দোয়েল চত্বরে, ধানমণ্ডি ৬ নম্বর রোড থেকে কলাবাগান, ঢাকা কলেজের সামনে, নিউমার্কেট, রায়েরবাজার, সাত মসজিদ রোডে। এখানে অনেক জিনিসের মধ্যে কিনতে হবে একটু বেছে এবং দর-দাম করে। তবে মাটির জিনিস কেনার সময় এর মসৃণতা দেখে নেবেন।
যত্ন
মাটির জিনিসে অন্য কিছু থেকে ধুলাটা একটু বেশিই চোখে পড়ে। তাই রোজ পাতলা ও নরম কাপড় দিয়ে মুছে নিন। ভেজা কাপড় দিয়ে না মোছাই ভালো। একটির ওপর আরেকটি রাখার সময় কাগজ ব্যবহার করুন। শক্ত কোনো কিছু যেমন চামচ, খুন্তি, চাকুর খোঁচা দেওয়া যাবে না। এতে ওপরের পরতটি উঠে যাবে। খাবার জিনিসের বাসন-কোসনে কখনও রঙ করবেন না।

গ্রন্থনা : শৈলী ডেস্ক

মন্তব্য করুন