নিছক ডাকাতি নয়, শিবির জঙ্গি যোগসূত্র

আশুলিয়ায় ভয়ঙ্কর ব্যাংক ডাকাতি

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০১৫     আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০১৫      

সাহাদাত হোসেন পরশ ও গোবিন্দ আচার্য্য


রাজধানীর অদূরে সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের শাখায় দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনাকে নিছক ডাকাতি বলে মনে করছে না পুলিশ। তাদের প্রাথমিক ধারণা, এ ঘটনার সঙ্গে জামায়াত-শিবির ও জঙ্গিরা জড়িত থাকতে পারে।

পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, গ্রেফতার ডাকাত বোরহান মৃধা (৩০) শিবিরের কর্মী। তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী। বোরহানের পরিবারের প্রায় সব সদস্য জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বোরহানের গাজীপুরের ভাড়া বাসায় গতকাল অভিযান চালিয়ে জিহাদি বই

উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ডাকাতির ধরন, সেখানে ব্যবহৃত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা, গ্রেফতার হওয়া ডাকাতদের বর্ণনা, আঘাতের চিহ্ন ইত্যাদি দেখে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনাটি নিছক ডাকাতি নয়। এখানে শিবির ও জঙ্গি যোগসূত্র রয়েছে। তদন্তকারীরা আরও বলছেন, গ্রেফতার হওয়া ওই ডাকাতের সঙ্গে একজন জঙ্গি নেতার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করতে নাশকতার উদ্দেশ্যে ব্যাংকে হানা দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে কি-না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, টাকা লুট করাই ডাকাতদের প্রধান লক্ষ্য ছিল না। ভল্টের সব টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তারা তা করেনি। এসব কারণে মনে হচ্ছে, ডাকাতদের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য ছিল।

পুলিশ সূত্রের খবর, সাধারণত ডাকাতদের শারীরিক অবয়ব ও আচরণ যে ধরনের হয়ে থাকে, তার সঙ্গে কমার্স ব্যাংকের ঘটনায় জড়িতদের মিল নেই। জনতার হাতে আটক দুই ডাকাত দাবি করে, ডাকাতির সঙ্গে জড়িতরা একে অপরকে 'ভালোভাবে' চিনত না। গোয়েন্দাদের ধারণা, জঙ্গিদের অপারেশনের মতো ব্যাংক ডাকাতিতে তারা 'কাট-আউট' পদ্ধতি প্রয়োগ করেছে, যা অনেকের কাছে 'স্লিপার সেল' নামেও পরিচিত। এর অর্থ, 'বড় ঘটনায়' অনেকে সম্পৃক্ত থাকবে, তবে নিজেদের রক্ষায় একজনের সঙ্গে অন্যজনের খুব বেশি চেনাজানা থাকবে না। দেশ-বিদেশের উগ্রপন্থিরা এমন কৌশল নিয়ে থাকে। এমনকি আশুলিয়ার ঘটনায় গ্রেফতার দুই ডাকাত প্রথমে 'পাগল' সেজে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি গতকাল সমকালকে বলেন, ২০০৯ সালে জেএমবির তৎকালীন আমির মাওলানা সাইদুর রহমানকে গ্রেফতারের পর যে ধরনের বোমা পাওয়া গিয়েছিল, সাভারের ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর একই ধরনের বোমা পাওয়া গেছে। ডিবির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা এসব আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছেন।

মামলা দায়ের :ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনায় গতকাল আশুলিয়া থানায় দুটি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার দুই ডাকাতসহ অজ্ঞাত ৮-১০ জনকে আসামি করে মামলাটি করেন ব্যাংকটির সিনিয়র কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম। ডাকাত সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত আরও দুই-তিনশ' জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। এ ছাড়া ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসি দাবি করে গতকাল দিনভর দোকানপাট বন্ধ রেখে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ মিছিল করেন কাঠগড়া বাজারের শত শত ব্যবসায়ী। গতকাল বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আহতদের দেখতে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক।

আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজার এলাকায় অবস্থিত নাজিমউদ্দিন সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে ডাকাতির এ ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা গুলি, বোমা হামলা ও কুপিয়ে ব্যাংকের ম্যানেজার মো. ওয়ালিউল্লাহসহ সাতজনকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে ডাকাতদের প্রতিহত করতে গিয়ে জীবন দেন এলাকার সাহসী ব্যক্তি। অন্য তিনজন নিহত হন ব্যাংকের ভেতরে। এক ডাকাত গণপিটুনিতে মারা যায়। এ ঘটনায় ডাকাতদের হামলায় গুরুতর জখম হয়ে আরও ১৭ জন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ম্যানেজারের পদোন্নতি :পদোন্নতি শুধু কাগজেই থেকে গেল কমার্স ব্যাংক আশুলিয়ার কাঠগড়া শাখার সাহসী ব্যবস্থাপক ওয়ালিউল্লাহর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ব্যবস্থাপক থেকে জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির কাঙ্ক্ষিত সেই চিঠি মঙ্গলবার দুপুরে হাতে পেয়েছিলেন তিনি। সেটি পাওয়ার কিছু সময় পরই ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান তিনি।

লাশের ময়নাতদন্ত :ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুরে নিহত সাতজনের মরদেহ স্বজনের কাছে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে বদরুল আর মনিরের শরীরে গুলির চিহ্ন ছিল। বাকি পাঁচজনের শরীরে কুপিয়ে জখম ও কাটাছেঁড়ার দাগ রয়েছে। গত রাতে ব্যাংক ম্যানেজারকে জামালপুরের নান্দিনায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহত ডাকাতের মরদেহ ঢামেক মর্গে রয়েছে। তার বিস্তারিত পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। তবে আহত ডাকাত জানিয়েছে, নিহত ডাকাতের নাম আসিফ। বাড়ি উত্তরাঞ্চলে।

ডিআইজির সংবাদ সম্মেলন :গতকাল দুপুরে সাভার মডেল থানায় সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, ডাকাতদের টাকা লুট করার উদ্দেশ্য ছিল না। কারণ, ব্যাংকের ভল্টের চাবি পাওয়া সত্ত্বেও তারা বেশি টাকা নেয়নি। পরিকল্পিতভাবে নাশকতা সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ডিআইজি নুরুজ্জামান বলেন, 'ডাকাতির ঘটনায় যে ধরনের অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে, তা অতীতে বাংলাদেশে কোনো ব্যাংক ডাকাতিতে ব্যবহৃত হয়নি। ডাকাত বোরহান ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মী। তার পরিবারের সদস্যরা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

ডিআইজি বলেন, হামলায় ব্যবহৃত বোমা-গ্রেনেড বিদেশি সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি। বাজারে এসব অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া যায় না। এসব অস্ত্র কেবল সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে থাকে। হাতে তৈরি গ্রেনেড হামলায় একজনের পা উড়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির জন্য এ হামলা করা হয়েছে।

ডিআইজি আরও বলেন, ঘটনা তদন্তে ব্যাংকের সিসিটিভির ফুটেজগুলো পরীক্ষা করা হবে। সাত-আটজন সামনে থেকে এ হামলা চালালেও তাদের সহায়তার জন্য অনেকে পেছন থেকে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নুরুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে অবস্থান করেও এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। যারা নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করে ডাকাতদের গ্রেফতারে এগিয়ে এসেছেন, তাদের সহায়তায় সবকিছু করা হবে।

ডাকাত আটক করে 'আসামি' গ্রামবাসী :বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি ও হত্যাকা ের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। আশুলিয়া থানার ওসি মোস্তফা কামাল জানান, বুধবার সকালে ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি এবং আশুলিয়া থানার এসআই জাকারিয়া হোসেন অন্য মামলাটি করেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা মামলায় সাতজনকে হত্যা এবং ব্যাংকের ভল্ট খুলে ছয় লাখ ৮৭ হাজার ১৯৩ টাকা লুটের অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেফতার দুই ডাকাত সদস্য সাইফুল ও বোরহান উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়েছে এজাহারে। অপর মামলায় এক ডাকাত সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ৩০০ গ্রামবাসীকে আসামি করা হয়েছে বলে মামলার বাদী এসআই জাকারিয়া হোসেন জানান। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ঘটনার পূর্বাপর বিবেচনা না করেই 'পুস্তক' মেনে পুলিশ গণপিটুনির ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেছে। এতে প্রাণ বিপন্ন করে দুর্ধর্ষ ডাকাত ধরার পর এখন সাধারণ মানুষ পুলিশের হয়রানি আতঙ্কে রয়েছে। তবে ডিআইজি নুরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, 'এ ঘটনায় করা মামলায় অজ্ঞাত আসামির নামে স্থানীয় কাউকে হয়রানি করা হবে না। সাধারণ মানুষ যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ডাকাত ধরতে গিয়ে নিহত ও আহতদের সার্বিক সহযোগিতা করতে সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া হবে।

ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী আটক, কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ :ডাকাতির ঘটনায় মো. সোহেল (৩৫) নামের এক নিরাপত্তারক্ষীকে আটক করেছে পুলিশ। ডাকাতদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বুধবার তাকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার আধঘণ্টা আগে তিনি ব্যাংক থেকে বাসায় যাওয়ায় সন্দেহ দেখা দেয়। এ ছাড়া ব্যাংকটির কাঠগড়া শাখার আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, যারা ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মামলার পাশাপাশি ব্যাংকটির পক্ষ থেকে একটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ব্যাংকিং) ফজলুর রহমান। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাদেক মো. সোহেল সমকালকে বলেন, হামলায় যারা নিহত ও আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারকে ব্যাংকের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। ৩৮ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা ঘটেনি।

দোকানপাট বন্ধ রেখে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ :ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল সকাল থেকেই দোকানপাট বন্ধ রেখে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন কাঠগড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া শাখার সামনে কালো পতাকা ঝোলানো হয়। গতকাল সকাল থেকে আশপাশের গ্রাম থেকে ব্যাংকের শাখাটি দেখতে কাঠগড়া বাজারে হাজির হয় শত শত উৎসুক মানুষ।

দুই ডাকাত যা বলল :সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭০৫ নম্বর কক্ষে চিকিৎসাধীন ডাকাত বোরহান মৃধা। সামনেই পৃথক আরেকটি কক্ষে ছিল সাইফুল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বারবার বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয় দুই ডাকাত। জানা যায়, সাইফুলের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে। তবে দুই ডাকাতের কেউ পরস্পরকে চেনে না বলে দাবি করে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ঘটনার সময় সাইফুল ও বোরহান একই মোটরসাইকেলে ছিল। বোরহান নিজের নামে নিবন্ধন করা মোটরসাইকেল ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহার করে। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ডাকাত দলের সদস্যরা সম্প্রতি চন্দ্রা এলাকায় বাসা ভাড়া করে। একাধিকবার কাঠগড়া এলাকায় রেকি করে তারা। এভাবে সাধারণত উগ্রপন্থি জঙ্গিরা কাজ সম্পাদন করে। এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছে শিবিরকর্মী বোরহানের স্ত্রী। গাজীপুর থেকে তার পাঁচটি গাড়ি ও জিহাদি বই জব্দ করেছে পুলিশ।

হাসপাতালজুড়ে আহাজারি :ডাকাতদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে আহত ১৭ জন এখন সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাদের স্বজনের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছিল হাসপাতালের পরিবেশ। ডাকাতদের বোমা হামলায় আহত কাঁচামাল ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের বাঁ পা কেটে ফেলা হয়েছে। ঝালমুুড়ি বিক্রেতা নুরুল ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা ও মেয়ে সালমা বেগম বিলাপ করছিলেন। বিজিবির সাবেক সদস্য আইয়ুব আলীকে (৭০) কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।