নদীর প্রাণ বাঁচাতে আবারও বালু রফতানির উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। তবে রফতানির আগে বালুতে কী ধরনের খনিজ সম্পদ রয়েছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে বালু রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি বছর এক কোটি ট্রিলিয়ন কিউসেক ঘনফুট বালু রফতানি করে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে। রফতানি নিষিদ্ধ তালিকায় না থাকায় গত বছর কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বালু রফতানির অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে এক আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় আবেদনগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সভায় নদীর প্রাণ বাঁচাতে বালু রফতানির পক্ষে ইতিবাচক মতামত দিয়ে আবেদনগুলো ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এখন ভূমি মন্ত্রণালয় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী দেশের চাহিদা মিটিয়ে বালু রফতানির অনুমতি দিতে পারবে। যদিও ভূমি মন্ত্রণালয় কয়েক বছর আগে বালু রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পরে সে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র ।
এ প্রসঙ্গে ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করবেন। তবে এ ক্ষেত্রে দেশের ভেতরে বালুর চাহিদা ও পরিবেশের ওপর প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০১০ সালে ঢাকা সফরকালে তৎকালীন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ থেকে বালু আমদানির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রস্তাব দেন। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী দেশের নদীগুলোতে ড্রেজিং করে মালদ্বীপকে মাটি রফতানির প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর পরিকল্পনা কমিশন বালু রফতানির বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রফতানির পক্ষে মতামত দেয়। কিন্তু পরে তা কার্যকর হয়নি।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় বলা হয়, বাংলাদেশের নদনদী দিয়ে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে বালু ও পলিমাটি আসে। ফলে পর্যায়ক্রমে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে। হ্রাস পাচ্ছে নাব্য। বিপুল অর্থ ব্যয় করে দেশের নদনদীর নাব্য রক্ষায় প্রতিনিয়ত ড্রেজিং করা হলেও উত্তোলন করা বালু ও পলিমাটি রাখার জায়গা পাওয়া যায় না। বালু রফতানি করা হলে নদীর নাব্য রক্ষার পাশাপাশি নদনদীগুলো প্রাণ ফিরে পাবে। পাশাপাশি আয় হবে বৈদেশিক মুদ্রার।
সভায় জানানো হয়, আণবিক শক্তি কমিশনের গবেষণায় নদনদীর বালু পরীক্ষা করে ১৩টি খনিজসম্পদ শনাক্ত করা হয়েছে। খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ বালুকে সাধারণ
বালু দেখিয়ে কম দামে রফতানি করলে মূল্যবান খনিজ পদার্থ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পানিসম্পদ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশের ২৩০টি নদনদী বছরে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন টন পলি বহন করছে। এতে নদনদীর প্রবাহ ও উৎসমুখ ক্রমশ বন্ধ হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে ১৭টি নদী চিরতরে হারিয়ে গেছে। আরও ৮টি নদী বিলুপ্ত হওয়ার পথে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ক্রমশ ভরাট হওয়াতে নদীমাতৃক এ দেশের জীবন-জীবিকাও পড়েছে হুমকির মুখে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহ্মেদ বলেন, প্রতি বছর নদী ভরাট হওয়ায় ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণে কৃষি পণ্য বিনষ্ট হয়। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে বালু রফতানি করা যেতে পারে। এতে নদী ও মানুষ বাঁচবে। আসবে বৈদেশিক মুদ্রাও। তবে এ লক্ষ্যে নিতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা।

মন্তব্য করুন