ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করেছিল ট্যুরিজম বোর্ড। চিহ্নিত করেছিল ৭৮০টি পর্যটনের স্পট। টার্গেট ছিল ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক। কিন্তু ঘোষণাই সার। অর্থের অভাবে বহির্বিশ্বের পর্যটকদের উদ্দেশে প্রচার শুরু করতে পারেনি বোর্ড। পর্যটন বর্ষের কার্যক্রম চালাতে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ২৩২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছিল। পরিকল্পনা কমিশন গত সপ্তাহে মাত্র ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বছরের শুরুতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে মেগা বিচ কার্নিভাল দিয়ে পর্যটন বর্ষের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল; কিন্তু এক মাসের মধ্যেই অর্থের অভাবে সে উদ্যোগে ভাটা পড়েছে। ভরা মৌসুমেও দেখা নেই বিদেশি পর্যটকের।
এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সমকালকে বলেন, ২০১৬ সালকে 'পর্যটন বর্ষ' ঘোষণা করলেও শেষ মুহূর্তে অর্থের অভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা ছোট করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অর্থের সংকট থাকলেও আমাদের মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। দ্রুতই এ সমস্যা কেটে যাবে। হিসাব কষেই অর্থ বরাদ্দের দাবি জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঠিক সময়ে অর্থ ছাড় হলে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম, ফ্লাইটের ম্যাগাজিন, বিলবোর্ড, রোড শো, আউটডোর মিডিয়া ক্যাম্পেইনসহ যা যা কার্যকর হবে বলে মনে হয়েছে, সবই করা সম্ভব। টাকা না থাকার পরও বিভিন্ন জনপ্রিয় ইভেন্টের সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রচার চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করে তোলার ব্যাপারে এখনও আশাবাদী তিনি।
বিদেশি পর্যটক আসছেন না : বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২০ সাল নাগাদ সারাবিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ১৬০ কোটি হবে। পর্যটকদের প্রায় ৭৩ শতাংশই ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলো। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা থেকে সরকার ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করে। গ্রহণ করা হয় ভিজিট বাংলাদেশ কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় ২০১৮ সালের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ১০ লাখ এবং এ খাত থেকে আয়ের পরিমাণ প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে প্রচার থমকে আছে।
গত তিন বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতায় পর্যটন শিল্পে ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ওই সময় যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছিল, তার রেশ এখনও কাটেনি।
এ বিষয়ে টোয়াবের পরিচালক তৌফিক রহমান সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন বিদেশি হত্যা ও হামলার ঘটনায় ভ্রমণ বাতিল করেছে বাইরের বেশ কয়েকটি পর্যটক গ্রুপ। দিনাজপুরে ইতালিয়ান পাদ্রির ওপর হামলা, শিয়া মসজিদে আক্রমণ এবং জেএমবি সদস্যদের গ্রেফতার ইত্যাদি ঘটনারও নানা প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, ২০ ডিসেম্বর ১৪ জনের, ১০ জানুয়ারি ১৪ জনের ও ৮ ফেব্রুয়ারি ৯ জনের একটি গ্রুপ তার কোম্পানিতে পূর্ব নির্ধারিত ভ্রমণ বাতিল করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশিদের আস্থার সংকট কাটাতে হলে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পর্যটনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে বিদেশে পাঠাতে হবে।'
আয় ও লক্ষ্যমাত্রা : বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরী সমকালকে বলেন, 'পর্যটন খাত থেকে ২০১৬ সালে ৯৮০ কোটি তিন লাখ টাকা, ২০১৭ সালে ১ হাজার ১৮২ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০১৮ সালে ১ হাজার ৫৩২ কোটি ২৬ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।'
তবুও আশাবাদ : তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও ট্যুর অপারেটররা হাল ছাড়েননি।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি অধ্যাপক ড. আকবর উদ্দিন আহমদ সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে পর্যটন বর্ষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব। চলতি বছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ দেশি পর্যটক ও ৬-৭ লাখ বিদেশি পর্যটক তারা আশা করছেন।
বাংলাদেশ ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুল ইসলাম বুলু বলেন, 'সরকার
পর্যটকদের নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু বিদেশিরা সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।' পরিস্থিতি উত্তরণে ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে বিদেশে রোড শো আয়োজনের পরামর্শ দেন তিনি।
বেঙ্গল ট্যুরসের প্রধান নির্বাহী মাসুদ হোসেন বলেন, বড় পরিসরে বিচ কার্নিভাল করা সম্ভব, এটা এবার প্রমাণিত হয়েছে। তবে এর সময়টা যথাযথ হয়নি। এ ধরনের কার্নিভাল থার্টিফার্সদ্ব নাইটে না করে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাসের দিকে করার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ, তার মতে, থার্টিফার্সদ্ব নাইটে কক্সবাজারে এমনিতেই প্রচুর পর্যটক থাকে।




মন্তব্য করুন