প্রতি বছর অন্তত একশ' কোটি টাকার সাপের বিষ পাচার হচ্ছে দেশ থেকে বিদেশে। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ১০ গ্রুপের দেশি-বিদেশি শতাধিক সদস্য এই কাজে লিপ্ত। বনাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বিভিন্ন চক্রও যুক্ত পাচারের সঙ্গে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা এসব গ্রুপের তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। অন্যদিকে 'সাপের খামার ব্যবস্থাপনায় বিধিমালা ২০১৬' চূড়ান্ত হয়েছে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে বিধিটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ওষুধ তৈরির মূল্যবান উপাদান সাপের বিষ বৈধপথে রফতানির সুযোগ নেই বাংলাদেশে। তাই পাচার থামানো যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, 'সাপের বিষ পাচার রোধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেসব পাচারকারী সক্রিয় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চক্রের কয়েকজনকে আটক করেছে। বিষ পাচার রোধে স্থল ও আকাশপথে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাপের বিষগুলো দেশের ওষুধ শিল্পে কাজে লাগানো হবে।'
সক্রিয় বিভিন্ন গ্রুপ :সাপের বিষ পাচারকারীদের মাঠ পর্যায়ের একেকটি গ্রুপে অন্তত ১০ জন সদস্য রয়েছেন। বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে বনাঞ্চল থেকে সাপের বিষ সংগ্রহ করেন তারা। পরে কয়েক হাত ঘুরে তা যায় মূল পাচারকারীদের কাছে। ভারতসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে তা পাচার করে মূল চক্রগুলো। গোয়েন্দা সংস্থার তালিকামতে, এই চক্রের শীর্ষে রয়েছে ফেনীর আজিজুল গ্রুপ, সীমান্ত এলাকা বেনাপোলের মোরশেদ গ্রুপ ও বাদশা গ্রুপ। এ ছাড়া সাতক্ষীরার ফেন্সি বজলু গ্রুপ, যশোরের রহিম বেপারী গ্রুপ, কুমিল্লার জুলহাস গ্রুপ, মতিন গ্রুপ, দিনাজপুরের হিলির আবদুর রাজ্জাক গ্রুপ, ড্যানি গ্রুপ ও ঢাকার মহাখালীর রসুল গ্রুপ অবৈধভাবে সাপের বিষ সংগ্রহ ও পাচারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের সহায়তা করছে ভারত, পাকিস্তান, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারের একাধিক গ্রুপ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সমকালকে জানান, একাধিক বিদেশি চক্রের সদস্য ঢাকায় আছে। তাদের ধরতে গোয়েন্দাদের কয়েকটি টিম কাজ করছে।
সাপের খামার নিবন্ধন প্রক্রিয়া থেমে আছে :২০০৮ সালের জুনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) দেশের এই নতুন সম্ভাবনাময় খাতকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়। বাণিজ্যিকভাবে সাপের বিষ রফতানি করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তখন চীন, জাপান, কোরিয়া, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। যেসব দেশে সাপ খাদ্যতালিকায় রয়েছে সেসব দেশের খামার মালিকদের বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠিত হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠকও হয়। সাপের বিষ রফতানির এ উদ্যোগের খবর জেনে দেশের বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী,
পটুয়াখালী, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকার আগ্রহী উদ্যোক্তারা দেশি কোবরা (গোখরা) ও শঙ্খিনী জাতের সাপের খামারের নিবন্ধন পেতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করেন; কিন্তু পরে এ প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
ইতিমধ্যে 'সাপের খামার ব্যবস্থাপনায় বিধিমালা ২০১৬' চূড়ান্ত হয়েছে। বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক অসিত রঞ্জন পাল সমকালকে বলেন, 'বিধিটি এখন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।'
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, চাহিদা মিটিয়ে সাপের বিষ রফতানি করে বছরে প্রায় দেড়শ' কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এতে সাপের বিষের পাচারও বন্ধ হবে। ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোতে সাপের বিষ একটি মূল্যবান কাঁচামাল। এর মধ্যে কোবরা (গোখরা) সাপের বিষে বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান পটাশিয়াম সায়ানাইডের পরিমাণ অনেক বেশি, যা থেকে সাপে কামড়ানোর চিকিৎসার প্রতিষেধক তৈরি হয়। এ ছাড়া ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতেও কোবরা সাপের বিষ একটি মূল্যবান উপাদান। তবে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে সাপের বিষের ব্যবহার নেই।

মন্তব্য করুন