রেলে লোক নিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোই গুরুত্ব পাচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অর্ধেক পদই খালি। এতে সারাদেশে স্বাভাবিক ট্রেন পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পেঁৗছে না ট্রেন। কমছে রেলের আয়। যাত্রীরা পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত সেবা।
স্টেশন মাস্টার (এসএম), সহকারী স্টেশন মাস্টার (এএসএম), কেবিন স্টেশন মাস্টার (সিএসএম), পয়েন্টম্যান, গেটম্যান ও শান্টিংম্যানের মতো পদের কর্মীরাই সাধারণত ট্রেন পরিচালনা করে থাকেন। তবে বছরের পর বছর এসব পদে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ না হওয়ায় খেসারত দিতে হচ্ছে রেলওয়েকে।
এসএম, এএসএম, পয়েন্টম্যান, শান্টিংম্যান ও গেটম্যানের তিন হাজার ৩৪১ পদের বিপরীতে লোকবল মাত্র এক হাজার ৬৯৩ জন। ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত লোকবলের অভাবে ট্র্রেন পরিচালনায় নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শুধু স্টেশন মাস্টারের অভাবে রেলের পূর্ব ও পশ্চিম জোনে ৩৩৪টি স্টেশনের মধ্যে ১০৬টি বন্ধ। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ১৭৩টি স্টেশনের মধ্যে বন্ধ স্টেশনের সংখ্যা ৫৬টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৭৩টি স্টেশনের মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৫০টি।
একটি স্টেশনের সার্বিক দায়িত্ব স্টেশন মাস্টারের। স্টেশনের অন্য কর্মচারীরা তার অধীনে কাজ করেন। এক লাইন থেকে আরেক লাইনে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করে দেওয়াই হচ্ছে রেলের পয়েন্টম্যানের কাজ। ট্র্যাক (রেললাইন) পরিবর্তন করতে হলে তারাই সেটা করে দেন। তারা ক্লিয়ারেন্স দিলেই চালক ট্রেন চালিয়ে যান। শান্টিংম্যানের কাজ, একটি বগির (কোচ) সঙ্গে আরেকটি বগি সংযুক্ত করা এবং কোনো বগির ত্রুটি থাকলে তা অন্য লাইনে সরিয়ে নিয়ে নতুন বগি সংযুক্ত করা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে লেভেল ক্রসিংগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেটম্যানের কাজ। এসব লোকবল ছাড়া ট্রেন পরিচালনা করা যায় না।
বিষয়টি স্বীকার করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মকবুল আহম্মদ সমকালকে বলেন, 'মাঠ পর্যায়ে ট্রেন পরিচালনার কর্মী প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ সমস্যা দূর করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে লোকবল নিয়োগে কাজ চলছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, অনেক সময় লোকবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলে কেউ না কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতে মামলা করে দেন। এতে নিয়োগে জটিলতা তৈরি হয়।' এক প্রশ্নের জবাবে মকবুল আহম্মদ বলেন, 'রেলে এন্ট্রি পদে নিয়োগ না হওয়ায় প্রমোশনও হচ্ছে না। রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ও কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোখলেছুর রহমান সমকালকে বলেন, 'একজন স্টেশন মাস্টার একটি স্টেশনের দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও সংকটের কারণে একজনকে আরও তিন থেকে চারটি স্টেশনের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। জোর করে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। আবার এসব স্টেশনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেই স্টেশন মাস্টারকেই দায়ী করা হচ্ছে। এভাবে কাজ চললেও স্টেশন মাস্টার, শান্টিংম্যান, পয়েন্টম্যান ও গেটম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে লোকবল নিয়োগে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।'
আবদুল করিম নামে রেলের একজন শান্টিং কর্মচারী সমকালকে বলেন, শান্টিংম্যান পদটি ছোট হলেও এ পদের লোক ছাড়া ভালোভাবে ট্রেন চালানো যাবে না। কর্তৃপক্ষ এ পদটিকে অবহেলা করে, গুরুত্ব দেয় না।
সূত্র জানায়, স্টেশন মাস্টারের শূন্য পদ পূরণে ২০০৬ সালে ৮১ জন সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। এ নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও লোকবল নিয়োগ করা যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা আদালতের শরণাপন্ন হন। সর্বশেষ আদালতের মাধ্যমে ওই ৮১ জনের মধ্যে মাত্র ১৪ জন নিয়োগ পেলেও ৬৭ জনের নিয়োগ আটকে রয়েছে। জটিলতা থেকে বের হয়ে পরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ৩০ জন সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এখনও ২৭০ জন মাস্টারের পদ খালি রয়েছে। এসব পদের বিপরীতে ১৪০ জন লোক নিয়োগে প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মন্তব্য করুন