সরকারি অনুদানের ছবি নিয়ে নয়ছয় নতুন কিছু নয়। অনুদান পাওয়া থেকে ছবি মুক্তি দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে নিয়ম ভাঙার খেলা। তাই প্রথম চেক পাওয়ার ৯ মাসের মধ্যে চলচ্চিত্রের নির্মাণকাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। অথচ অনুদান প্রদানের সময় প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নূরুল আলম আতিকের 'লাল মোরগের ঝুঁটি', মাহমুদ দিদারের 'বিউটি সার্কাস', এন রাশেদ চৌধুরীর 'চন্দ্রাবতীর কথা', ফাখরুল আরেফীনের 'ভুবন মাঝি', মাসুদ পথিকের 'মায়া-দ্য লস্ট মাদার' ও শামীম আখতারের 'রীনা ব্রাউন' এই ছয়টি চলচ্চিত্রকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে দুটি চলচ্চিত্রের। ৭ মার্চ শুরু হবে নূরুল আলম আতিকের 'লাল মোরগের ঝুঁটি'র কাজ।
এদিকে, সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মুক্তি না পাওয়া চলচ্চিত্রের সংখ্যাও। বিগত বছরের হিসাব অনুযায়ী, মুক্তি না পাওয়া অনুদানের চলচ্চিত্রের সংখ্যাই বেশি।
১৯৭৬-৭৭ অর্থবছর থেকে সুষ্ঠু ও ভালো মানের চলচ্চিত্র উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই দেশীয় চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদানের প্রথা চালু হয়।
২০১০ সাল থেকে অনুদানের অর্থের পরিমাণ ৩৫ লাখ টাকা। সঙ্গে থাকছে ১০ লাখ টাকার কারিগরি সুবিধা। প্রথম চেক প্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে।
কিন্তু কিছু নির্মাতা এই অর্থ নিয়ে নয়ছয় করছেন। অনেক নির্মাতার বিরুদ্ধে সময়মতো ছবির কাজ শুরু না করার অভিযোগও রয়েছে।
২০১০-১১ অর্থবছরে অনুদানপ্রাপ্ত ফারুক হোসেনের 'কাকতাড়ূয়া' ও মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেনের 'ধোঁকা', ২০১১-১২ অর্থবছরে মারুফ হাসান আরমানের 'নেকড়ে অরণ্যে', প্রশান্ত অধিকারীর 'হডসনের বন্দুক', সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর 'একা একা', ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রয়াত তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের 'কাগজের ফুল', নারগিস আক্তারের 'যৈবতী কন্যার মন', আকরাম খানের 'খাঁচা', টোকন ঠাকুরের 'কাঁটা', ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মুশফিকুর রহমান গুলজারের 'লাল সবুজের সুর', ড্যানি সিডাকের 'কাঁসার থালায় রুপালি চাঁদ', ড. সাজেদুল আওয়ালের 'ছিটকিনি' ও জাঁনেসার ওসমানের 'পঞ্চসঙ্গী'সহ অনেক ছবিই এখনও আলোর মুখ দেখেনি। এ প্রসঙ্গে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, 'সরকারি অনুদানের ছবিগুলো মুক্তি না পাওয়ার পেছনে অধিকাংশ নির্মাতা বাজেট স্বল্পতার কথা বলে থাকেন। ২০১০-১১ অর্থ বছরের পর ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় একটি ছবির বাজেট ১৯ লক্ষ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ লাখ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১০ লাখ টাকা এফডিসির কারিগরি সহায়তার জন্য প্রদান করবে। বর্তমানে এই বাজেট বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা করার প্রক্রিয়া চলছে। যদিও একটি ছবি নির্মাণের জন্য এ বাজেট পর্যাপ্ত নয়। কারণ একটি ভালো মানের ছবির জন্য এর চেয়ে বেশি অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু যেহেতু এ অর্থের পরিমাণ জেনেই সবাই আবেদন করছেন, সেক্ষেত্রে ছবি নির্মাণের ব্যাপারেও নির্মাতাদের আরও বাস্তবমুখী হতে হবে। প্রথমত ছবির যথাযথ বাজেট পরিকল্পনা করে কাজ শুরু করতে হবে। অনুদানের চেয়ে বেশি অর্থের দরকার হলে, সহকারী প্রযোজক খুঁজে নিতে হবে। বা অন্য কোন মাধ্যম থেকে আর্থিক নিশ্চয়তা নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি নির্মাতাদের চিত্রনাট্য অনুযায়ী কত কম খরচে ছবিটির নির্মাণ সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়েও সচেতন হতে হবে।' অনুদান পাওয়া অনেক নির্মাতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনুদানের জন্য যে অর্থ দেওয়া হয় সেটা একটি ছবির জন্য যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি এফডিসি থেকে যে কারিগরি সুবিধা দেওয়ার কথা থাকে বেশিরভাগ সময় সেই সুবিধা পাওয়া যায় না। ফলে ছবি নির্মাণ কিছুটা হলেও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অনুদানের চলচ্চিত্র নিয়ে নয়ছয় প্রসঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা বলেন, 'অনুদান পাওয়ার পর নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে ছবি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া থাকলেও নির্মাতারা নানা কারণ দেখিয়ে ছবির দেওয়ার সময়সীমা দীর্ঘায়িত করেন। এ নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে বারবার তাদের নোটিশও পাঠানো হয়। প্রতিবার তারা কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন।'

মুক্তি না পাওয়া চলচ্চিত্র
লাল সবুজের সুর
কাঁসার থালায় রুপালি চাঁদ
ছিটকিনি
যৈবতী কন্যার মন
খাঁচা
কাঁটা
নেকড়ে অরণ্যে
হডসনের বন্দুক
একা একা
কাকতাড়ূয়া
ধোঁকা
স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের গল্প'

মন্তব্য করুন