ট্রাফিক পুলিশের সাতপাঁচ

'সার্জেন্ট হলো সোনার খনি'

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০১৪     আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৪      

সালাহ উদ্দিন


কক্সবাজার ট-১১-০০৬৯। গাছবোঝাই এ ট্রাকটি যাচ্ছিল নগরের অক্সিজেন মোড় হয়ে। হঠাৎ কর্তব্যরত এক ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশরায় থামাতে হলো ট্রাকচালককে। চালকের কাছে দৌড়ে গেলেন কনস্টেবল। ট্রাক থেকে হাত বাড়িয়ে দিলেন হেলপার। নীরব কুশল বিনিময়ের মতো হাত মিলিয়ে ফিরে এলেন ওই কনস্টেবল। কিছুক্ষণ পর মুষ্টিবদ্ধ হাত আলগা করে এক পলক দেখেই মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে সেই হাত ঢোকালেন পকেটে। এরপর আবার শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ।

মিনিট দশেক পর শলা-পরামর্শ করলেন এক সুদর্শন যুবকের সঙ্গে। তার চোখে কালো চশমা, হাতে গ্গ্নাভস। সাদা মোটরসাইকেলে বসে আঙ্গুল দিয়ে চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে তিনি নির্দেশনা দিলেন দুই কনস্টেবলকে। ভদ্রলোক ইউনিফর্ম পরা থাকলেও নেই নেমপেল্গট। পাশে দাঁড়ানো ট্রাক ড্রাইভার রফিক জানালেন, 'উনি সার্জেন্ট স্যার। মাথা ভীষণ গরম।'

'সার্জেন্ট স্যারের' ইশারায় আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন দুই কনস্টেবল প্রণজিৎ ও অলিউল্লাহ। রাস্তার মাঝেই দাঁড় করালেন একটি পিকআপভ্যান, দুটি মোটরসাইকেল ও একটি অটোরিকশাকে। কাগজপত্র দেখতে চাইলেন। চালকরা কাগজ দেখালেন, কিন্তু আটকে গেলেন আইনের মারপ্যাঁচে। 'গাড়ি থানা থেকে ছাড়ায় নিবা নাকি এইখান থেইক্যা'_ জিজ্ঞেস করলেন কনস্টেবল। ড্রাইভারদের একজন মিনতি করে বললেন, 'স্যার মামলা দেবেন না, একটু সময় দেন। আমি টাকা নিয়ে আসতেছি।'

এ ফাঁকে পাশের চায়ের দোকানে খাতির জমানোর চেষ্টা করলাম কনস্টেবল অলিউল্লার সঙ্গে। তিনি 'সার্জেন্ট স্যারের' নাম বলতে চাইলেন না। কথায় কথায় জানালেন জরিমানার এ টাকা তিন ভাগ হয়। উপরেও নাকি যায় এ টাকা।

অলিউল্লাহ বলেন_ ভাই, পরিবারে একজন সার্জেন্ট থাকলে কী আর লাগে। সার্জেন্ট হলো সোনার খনি। বলেই একটু থামলেন। এরই মধ্যে পিকআপভ্যানের ড্রাইভার পাঁচশ' টাকা গুঁজে দিলেন অলিউল্লার হাতে। বললেন_ 'সার্জেন্ট স্যার'-এ টাকা দিতে বলেছেন।' এরপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন চালক।

এদিকে চা চক্রে যোগ দিলেন 'সার্জেন্ট স্যার'। 'জ' আদ্যাক্ষরের এ সার্জেন্টের খুঁটির জোর অনেক। আর তাই তো বিএনপি আমলে নিয়োগ পেয়েও বহাল-তবিয়তে আছেন চট্টগ্রাম মহানগরে। মাথা গরম এই সার্জেন্ট আবার দয়ার সাগরও। কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন অলিউল্লাহ। দীর্ঘদিন ভর্তি ছিলেন রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে। খরচ হয় আঠার লাখ টাকা! সরকারের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছেন সার্জেন্ট_ জানালেন কনস্টেবল অলিউল্লাহ। বাকি ১৩ লাখ টাকা কোথায় পেলেন জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, 'সরকার এক টাকা না দিলেও আমার চিকিৎসা হতো। আমার এক ভাই এসআই।'

বাঁশি বেজে উঠল। কথা বলার ফুরসত নেই। দুই কনস্টেবল ছুটলেন 'ট্রাফিক আইন' প্রয়োগ করতে।