টোকেন না থাকায় হয়রানি বেড়েছে!

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০১৪      

আহমেদ কুতুব

টেম্পো চালক আজিজ। বয়স ২৫ বছর। নগরের জাকির হোসেন সড়কের জিইসি থেকে এ কে খান মোড় পর্যন্ত গাড়ি চালান। এ জন্য প্রতিদিন লাইনম্যানকে দিতে হয় একশ' টাকা। আক্ষেপ করে টেম্পো চালক আজিজ বলেন, 'আগের টোকেনই ভালো ছিল। মাসে পাঁচশ' টাকায় একটি টোকেন নিলে এক মাস নিশ্চিন্তে টেম্পো চালাতে পারতাম। এখন মাসে দিতে হচ্ছে তিন হাজার টাকা।'
আজিজের মতো আক্ষেপ কাভার্ডভ্যান চালক নুরুল আলমেরও। তিনি বলেন, 'সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনে কাভার্ড ভ্যান চালাচ্ছি। ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি টোকেন নিলেই এক মাস ঝামেলাহীন থাকতাম। কোথাও কোনো সার্জেন্ট ধরলে টোকেন দেখালেই ছেড়ে দিতেন। টোকেন তুলে দেওয়ার পর এখন কষ্টের শেষ নেই। সার্জেন্ট ধরলেই প্রতিবার এক থেকে দুই হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। তারা মাসে তিন থেকে চারবার ধরছে। এখন প্রতি মাসে সাত-আট হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।'
কাভার্ড ভ্যান আলম, টেম্পো চালক আজিজই নয় বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, মিনি ট্রাক ও টমটম চালকরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট, দালাল ও লাইনম্যানদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১০ সালে টোকেন সিস্টেম তুলে দেওয়া হয়। এর আগে টোকেনের মাধ্যমে সব যানবাহন থেকে মাসিক চাঁদা আদায় করত পুলিশ। ওই সময় টেম্পে চালককে পাঁচশ' টাকা, ট্রাক দুই হাজার টাকা, কাভার্ড ভ্যান তিন হাজার টাকা, অটোরিকশা দুই হাজার টাকা, বাস পাঁচশ' টাকা এবং রিকশা চালককে দুইশ' টাকা দিয়ে মাসিক টোকেন দেওয়া হতো। টোকেন নিলেই এক মাস নিশ্চিন্তে যানবাহন চালাতে পারতেন চালকরা। কোথাও ট্রাফিক পুলিশ ধরলেই টোকেন দেখালে ছাড়া পেতেন। এখন টোকেন সিস্টেম না থাকায় মাসে বিভিন্ন মোড়ে বারবার পুলিশকে টাকা দিতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আন্তঃজেলা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভপতি মনির আহাম্মদ সমকালকে বলেন, 'মোড়ে মোড়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চালককে প্রতিদিন নূ্যনতম চারশ' থেকে পাঁচশ' টাকা ট্রাফিক পুলিশকে দিতে হয়। না দিলে কাগজপত্র ঠিক নেই বলে হয়রানি করে। বাধ্য হয়েই চালকদের টাকা দিতে হচ্ছে।'
আন্তঃজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির আহ্বায়ক শফিউর রহমান টিপু জানান, 'অবরোধে গত দু'মাস ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তেমন একটা গাড়ি বের হয়নি। এর আগে ট্রাফিক পুলিশ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র ঠিক নেই বলে হয়রানি করত। চাহিদামতো টাকা পেলে ছেড়ে দেয়।
চাঁদাবাজিতে নতুন সংস্করণ 'দালাল-লাইনম্যান'
টোকেন প্রথা উঠে গেলেও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজিতে নতুন সংস্করণ 'দালাল-লাইনম্যান'। ২০১০ সালে টোকেন প্রথা তুলে দেওয়ার পর অলিখিতভাবে দালাল ও লাইনম্যান নিয়োগ দেয় পুলিশ! নগরের গুরুত্বপূর্ণ ২৮টি পয়েন্টে শতাধিক দালাল-লাইনম্যান প্রতিদিন সমানে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। গুরুত্ব অনুযায়ী একটি মোড়ে একাধিক দালালও নিয়োগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সরেজমিনে এসব মোড়ে পুলিশ ও দালালদের একশ' থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিতে দেখা গেছে।
ট্রাফিক পুলিশের সহায়হতায় নগরের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দালাল এবং আটটি পয়েন্টে লাইনম্যানরা চাঁদাবাজি করছে। পয়েন্টগুলো হলো_ অলংকার মোড়, সিটি গেট, এ কে খান মোড, সল্টগোলা ক্রসিং, জিইসি মোড়, মুরাদপুর, অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, দুই নম্বর গেট, নতুন ব্রিজ, দেওয়ানহাট, নিউমার্কেট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কোতোয়ালি মোড়, চকবাজার, বারেক বিল্ডিং মোড়, আগ্রাবাদ মোড়, কদমতলী, রাহাত্তারপুল ও বড়পুল মোড়।
এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডিসি ট্রাফিক (দক্ষিণ) সুজায়াত ইসলাম সমকালকে বলেন, 'দালাল বা লাইনম্যান রাখার কোনো বিধান নেই। কারও বিরুদ্ধে যদি এমন অভিযোগ পাওয়া যায় এবং তা যদি প্রমাণ হয় তাহলে অভিযুক্ত সার্জেন্ট ও দালালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'