এ কে খান-অলংকার মোড়

গাড়ি থামান সার্জেন্ট টাকা নেন কনস্টেবল

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০১৪      

আহমেদ কুতুব

নাজমুলের ভ্রাম্যমাণ টি-স্টল। সেখানেই কনস্টেবল রশিদের সঙ্গে তর্ক চলছে সাদা গেঞ্জি পরা এক যুবকের। এগিয়ে যেতে দেখা গেল কনস্টেবল রশিদের হাতে কাভার্ডভ্যানের (ঢাকা মেট্রো ১৪-২৩০৯) কাগজপত্র। চা খাওয়ার ভান করে শোনার চেষ্টা করলাম কনস্টেবল রশিদ ও কাভার্ডভ্যান হেলপারের কথা কাটাকাটি।
হেলপার হেলাল বলছেন, 'স্যার এক মাস হলো সব কাগজপত্র ঠিক করছি। আপনি বলছেন ঠিক নেই। এটা কেমন কথা?' ধমক দিয়ে কনস্টেবল রশিদ বললেন, 'দেখ, ঝামেলা করিস না। কথা না শুনলে মামলা দিয়ে লটকাইয়া দিমু। তখন দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন শেষ হয়ে যাবে। স্যারকে এক হাজার টাকা দে, ছেড়ে দিমু।' হেলপার রাস্তার পাশে দাঁড়ানো গাড়িতে গিয়ে চালক থেকে এক হাজার টাকা এনে দিলে কাগজপত্র ফেরত দেন কনস্টেবল রশিদ। টি-স্টল থেকে চলে যান হেলপার হেলাল। কনস্টেবল রশিদ এগিয়ে যান সার্জেন্টের দিকে। কাছে গিয়ে সার্জেন্টের হাতে তুলে দেন হাজার টাকার নোট!
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এ কে খান মোড়ে কাভার্ডভ্যান দাঁড় করিয়ে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির ঘটনা এটি। ঘটেছে গত ১৪ জানুয়ারি সকাল ১০টায়। এরপর দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এ দুটি মোড়ে যানজট দেখা যায়নি তেমন একটা। তবে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, বাস ও মিনিবাস রিক্যুইজিশন, ট্রাফিক আইন লংঘন, চালক কিংবা গাড়ির কাগজপত্র ঠিক না থাকার অভিযোগ এনে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করতে দেখা গেছে পুলিশকে। চাহিদামতো টাকা না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন দাঁড় করিয়ে রেখে যাত্রী ও চালকদের হয়রানি করতেও দেখা গেছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একে খান মোড়ে ১০টা ২০ মিনিটে গাজীপুর থেকে আসা আকাইদ কার্গো কাভার্ড ভ্যান থামানোর নির্দেশ দেন সার্জেন্ট। নাজমুলের টি-স্টলের পাশে পার্কিং করে নেমে আসেন চালক। সামনে এগিয়ে চালক থেকে কাগজপত্র নেন কনস্টেবল রশিদ। এরপর সার্জেন্টের কাছে কাগজপত্র নিয়ে যান। পরামর্শ নিয়ে ফিরে যান নাজমুলের চা-স্টলের পেছনে। ফিরে এসে কনস্টেবল রশিদ চালকের কাছে দুই হাজার টাকা দাবি করেন। চালক দেড় হাজার টাকা দিয়ে কাগজ নিয়ে চলে যান। ১০টা ৩২ মিনিটে বারৈয়ারহাট থেকে আসা উত্তরা নামে একটি বাস থামান। চালক ফোনে 'জনৈক' ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন। সার্জেন্ট 'জনৈক' ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে বাসটি ছেড়ে দেন। গাড়ির চাপ না থাকলেও তখন মহানগর থেকে মহাসড়কে একটি-দুটি করে গাড়ি ঢুকছিল এবং বের হচ্ছিল। ১১টা ৫ মিনিটে পরশুরাম-চট্টগ্রাম (০২-১২০৩) যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে চালককে টি-স্টলের পেছনে নিয়ে ৫শ' টাকা নিয়ে বাস ছেড়ে দিতে দেখা যায়। এরপর দেড়টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের হামা কার্গো সার্ভিসের কাভার্ড ভ্যান, সোনাগাজী থেকে আসা ঢাকামোট্রোর একটি যাত্রীবাসী বাসসহ একে একে আরো পাঁচটি কাভার্ড ভ্যান, তিনটি বাস, একটি মিনিবাস নাজমুলের টি-স্টলের পাশে দাঁড় করিয়ে ৫শ' থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি করতে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশকে।
এ মোড়ে 'ন' আদ্যক্ষরের এক ট্রাফিক সার্জেন্ট, এক এএসআই ও দুই কনস্টেবলকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। একই অবস্থা দেখা যায় অলংকার মোড়েও। এখানে চাঁদাবাজি করেন ছয় পুলিশ সদস্য। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে ওই সার্জেন্ট কথা বলতে রাজি হননি।
নাজমুল টি-স্টলের মালিক নাজমুল বলেন, 'প্রতিদিন সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত এখানে কাভার্ড ভ্যান, বাস, ট্রাক দাঁড় করিয়ে যার থেকে যা পারে তা হাতিয়ে নেন সার্জেন্টরা। কেউ যেন না দেখে সেজন্য আমার চা দোকানের আড়ালে টাকা-পয়সা লেনদেন করেন।'
অলংকার মোডের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিআই সোহরাব উদ্দিন সমকালকে বলেন, 'সকালের দিকে অলংকার মোড়ে যানজট কম থাকে। তবে বিকেলে বন্দর থেকে ট্রাক-লরি বের হলে তখন যানজট বেড়ে যায়। বিকেল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ ও চালক-গাড়ির কাগজপত্র ঠিক না থাকায় গড়ে দিনে ১০ থেকে ১২টি মামলা করা হয়। বেশিরভাগ মামলাই হচ্ছে কাগজপত্র ঠিক না থাকার অপরাধে।' ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে টিআই সোহরাব কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করেন থাকেন।