আইন আছে, প্রয়োগ নেই

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০১৪      

তৌফিকুল ইসলাম বাবর

রাস্তায় চলাচলের সময় অনেক মানুষ জেনেশুনে ভুল করে। ভুলগুলো ছোট। কিন্তু ছোট্ট এ ভুলও অনেক সময় কারণ হয়ে দাঁড়ায় বড় বিপদের। এতে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে জীবন। অথচ খুব সহজেই এসব ভুল এড়ানো যায়। এড়ানো যায় বিপদ।
গাড়ি চালান অথচ মোবাইল ফোন নেই এমন চালক নেই বললেই চলে। ফোন থাকা দোষের কিছু নয়। তবে গাড়ি চালানোর সময় চালকের সামান্য অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। রাস্তায় একটু চোখ বুলালেই অহরহ দেখা যায় গাড়ি চালকের এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে মুঠোফান। মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে একটু আনমনা হলেই ঘটে বিপদ। গণপরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের গাড়ির চালক এভাবে কথা বলতে গিয়ে নিজে বিপদে পড়ছেন, পাশাপাশি বিপদে ফেলছেন অন্যকেও।
গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে নগরের বহদ্দারহাট থেকে ১০ নম্বর রুটের একটি বাসে করে আগ্রাবাদ যাচ্ছিলেন এ প্রতিবেদক। সড়কের ষোলশহর এলাকা পার হওয়ার সময় হঠাৎ চালকের মুঠোফোন বেজে ওঠে। বাস না থামিয়ে চালক স্টিয়ারিং থেকে এক হাত সরিয়ে ওই হাতে ফোন নিয়ে কথা বলতে থাকেন। মাঝে-মাঝে স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে ওঠানামা করছিলেন গিয়ারও। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই বড় ঝাঁকুনিতে এক যাত্রী গিয়ে পড়লেন আরেক যাত্রীর গায়ে। পরে চালককে খেতে হলো উত্তম-মধ্যম।
গাড়ি চালানো অবস্থায় মুঠোফোনে কথা বলা ট্রাফিক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধও। তবে ট্রাফিক পুলিশের সামনেই অহরহ এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও এমন অপরাধে শাস্তি পেতে দেখা যায় না কোনো চালককে।
মোটরসাইকেলে দু'জনের বেশি আরোহন এবং হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোও ট্রাফিক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিষয়টি আমরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু মানি ক'জন? প্রায় সময় দেখা যায়, তিন থেকে চারজন পর্যন্ত সওয়ারি হয়ে চলাচল করছে মোটরসাইকেলে। আর মাথায় হেলমেট তো কদাচিৎ চোখে পড়ে। সাধারণ মানুষ এভাবে দুয়ের অধিক যাত্রী হয়ে এবং হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালালেও এ নিয়ে কোনো মাথ্যব্যাথা নেই ট্রাফিক পুলিশের। সোমবার নগরের দামপাড়া এলাকায় এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার সময় সমকালের ক্যামেরায় ধরাও পড়েন। এভাবে আইন অমান্য করে চললেও থামানোর ছিল না কেউ! তবে সাধারণ মানুষ না হয় জেনে-না জেনে ভুল করে, কিন্তু খোদ আইনের রক্ষক ট্রাফিক পুলিশরা কি এ আইন মানেন? সহজ উত্তর_ না। আইনের ব্যত্যয় রোধে দিন-রাত সমানে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ায় ট্রাফিক পুলিশ। তবে তাদের বেশিরভাগের মাথায় থাকে না নিরাপত্তার হেলমেট।
জীবনের ঝুঁকি এড়াতে নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে নির্মাণ করা হয়েছে ফুটওভার ব্রিজ। কিন্তু এসব ফুটওভার ব্রিজের এখন করুণ দশা। ব্যবহার না করার কারণে মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এগুলো। অনেক সময় ভাসমান মানুষ সুযোগ বুঝে মলমূত্র ত্যাগ করে ফুটওভার ব্রিজে। আবার অনেক ফুটওভার ব্রিজ চলে গেছে হকারদের দখলে। নগরের নিউমার্কেট মোড়ের ব্যস্ততম জংশনে রয়েছে অনেকদিন আগে নির্মিত একটি ওভারব্রিজ। সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এর দু'পাশের ওঠার পথ প্রায় বন্ধ। ওভারব্রিজের দু'দিকের পথ দখল করে নিয়েছে হকাররা। মলমূত্রের উৎকট গন্ধে এটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিরাপদ সড়ক পারাপারে নগরের কয়েকটি পয়েন্টে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করে। যদিও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের সচেতনতা ও অভ্যাস গড়ে না ওঠায় এগুলো তেমন কোনো কাজে আসছে না। তাই তো এখনও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ততম রাস্তা পার হতে দেখা যায় পথচারীদের।
বলা হয়ে থাকে নগরে যানজটের অন্যতম কারণ যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং। নগরে পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা খুব কম বললেই চলে। নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব পার্কিং সুবিধা না থাকাও যানজটের অন্যতম কারণ। কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, নগরে চলাচলরত বাস, মিনিবাস এবং হিউম্যান হলারগুলো নির্ধারিত স্থানে পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করে না। যাত্রীর জন্য নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে একই স্থানে ঠাসাঠাসি করে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করে। নগরের বহদ্দারহাট, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, জিইসি মোড়, নিউমার্কেট মোড় এবং আগ্রাবাদ মোড়ে এ চিত্র প্রতিদিনের। পুলিশ মাঝে-মধ্যে এ বিষয়ে কঠোর হয়। তবে পুলিশের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক থাকায় ইচ্ছামতো পার্কিং করেও ছাড় পেয়ে যান চালক।
হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থানে হর্ন বাজানো নিষেধ। এ আইন সবাই জানলেও কোনো চালক মানেন কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এখন অনেক গাড়িতে যুক্ত হয়েছে হাইড্রোলিক হর্ন। ট্রাক, বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার, কার এবং টেম্পোতে ব্যবহৃত হচ্ছে এ ধরনের হাইড্রোলিক হর্ন। কান ফাটানো এ হর্ন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এমন হর্ন বাজানোর অপরাধেও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না ট্রাফিক পুলিশকে।