ইসমাইলদের প্রশ্নের উত্তর নেই

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০১৪      

রুবেল খান

'আল্লাহ ছাড়া গরিবের দুঃখ কেউ বুঝে না। ট্রাফিক সার্জেন্টদের অত্যাচারে মনে হয় বাস চালানো ছেড়ে দেই। কিন্তু ছেড়ে দিলে খাব কি? তাই চাইলেও ছাড়তে পারি না।'
আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ট্রাফিক পুলিশের মামলা খাওয়া সিটি সার্ভিস বাসের চালক ইসমাইল। ইসমাইলের অভিযোগ, তার ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও নগরের চৌমুহনী মোড় এলাকার এক ট্রাফিক সার্জেন্ট সিগন্যাল দিয়ে গাড়ি থামিয়ে ২শ' টাকা ঘুষ দাবি করেন। ঘুষের টাকা দিতে অস্বীকার করায় নিষিদ্ধ পার্কিংয়ের কথা বলে মোটরযান আইনের ১৪০ ধারায় মামলা ঠুকে দেন। মামলা প্রত্যাহার করতে নগরের সদরঘাটের ট্রাফিক বিভাগের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে ধরনা দিতে হয়। সেখানে আড়াইশ' টাকা জরিমানা দেওয়ার পাশাপাশি মামলার সিরিয়াল এগিয়ে আনতে ঘুষ দিতে হয় ১শ' টাকা। তারপরও মামলা থেকে মুক্তি পেতে লেগে যায় ১২ দিন।
দুঃখ করে বাস চালক ইসমাইল বলেন, 'প্রতিদিন বাস মালিককে জমা বাবদ দিতে হয় আড়াই হাজার টাকা। তেল বাবদ খরচ হয় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। সারাদিনে খাবার খরচ বাবদ ব্যয় হয় পাঁচশ' টাকা। এর সঙ্গে স্টাফদের বেতন বাবদ ব্যয় পাঁচশ' টাকা। এসব খরচের পর অনেক সময় হাজার টাকা হাতে থাকে না। এর মধ্যে ট্রাফিক সার্জেন্টদের হয়রানিতে খুব কষ্টে আছি। ট্রাফিক সার্জেন্টরা প্রকাশ্যে এমন দুর্নীতি করলেও কেউ তাদের কিছুই করতে পারে না। আমরা কি সার্জেন্টদের এ হয়রানি থেকে মুক্তি পাব না?'
এমন প্রশ্ন শুধু বাসচালক ইসমাইলের নয়, নগরে চলাচল করা বাস, ট্রাক, হিউম্যান হলার, টেম্পো, অটোরিকশা চালকসহ সব গণপরিবহন চালকের। কয়েকজন গণপরিবহন চালক জানান, ট্রাফিক সার্জেন্টরা সিগন্যাল দিলে ঘুষ দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও নানা অজুহাতে তারা ঘুষ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরও তাদের ঘুষ না দিলে মোটরযান আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা ঠুকে দেন।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন ট্রাফিক সার্জেন্ট (প্রসিকিউশন) মামুন। তিনি সমকালকে বলেন, 'চালকদের অভিযোগ সত্য নয়। সুনির্দিষ্ট কারণেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। ধারা অনুযায়ী মামলার নির্ধারিত জরিমানার টাকা জমা দিয়ে অনায়সেই মামলা থেকে রেহাই পায় তারা।' তিনি বলেন, 'সাধারণত একটি মামলা হওয়ার সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে জরিমানার টাকা জমা দিয়ে মামলা থেকে অব্যহতি পায় চালকরা। তবে চার মাসের মধ্যেও কেউ যদি জরিমানার টাকা জমা না দেন সেক্ষেত্রে মামলাটি আদালতে পাঠানো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধে যেসব যানবাহন আটক করা হয় সেই মামলাগুলো তদন্তসাপেক্ষে আদালতে পাঠানো হয়।'
তিনি জানান, গত বছরের জুন মাসে ৮০টি মামলা আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ডিসেম্বরে ৯৩৪টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৭০টি যানবাহন আটক করা হয়েছে। জরিমানা আদায় হয়েছে ৯ লাখ ৪১ হাজার ৫৫০ টাকা।
এদিকে ট্রাফিক সার্জেন্ট মহিউদ্দিন জানান, গত বছরের জুনে কার্যক্রম শুরু করা নগরের আগ্রাবাদের ট্রাফিক বিভাগের কার্যালয়ে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৯ হাজার ৯৬৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জরিমানা আদায় হয়েছে ৮৯ লাখ ৫ হাজার ২শ' টাকা। শুধু ডিসেম্বরেই মামলা হয়েছে ২ হাজার ১৪৯টি। জরিমানা আদায় হয়েছে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১শ' টাকা।
যে ধারায় দণ্ড যা
মোটরযান আইনের ১৩৭ ধারায় সাধারণ অপরাধের মামলায় ২শ' থেকে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা, ১৩৯ ধারায় নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারের মামলায় ১শ' থেকে ২শ' টাকা, ১৪০ ধারায় আদেশ অমান্য, কর্তব্যে বাধা দান, তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি ও নিষিদ্ধ পার্কিং মামলায় আড়াইশ' থেকে পাঁচশ' টাকা কিংবা এক মাসের কারাদণ্ড, ১৪২ ধারায় অতিরিক্ত গতির মামলায় ২শ' থেকে ৪শ' টাকা জরিমানা কিংবা এক মাসের কারাদণ্ড, ১৪৬ ধারায় দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধ মামলায় ৫শ' থেকে এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা তিন মাসের কারাদণ্ড, ১৪৯ ধারায় নিরাপত্তাহীন বা ত্রুটিযুক্ত গাড়ি চালনা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও হেলমেট ব্যবহার না করা মামলায় ৩শ' থেকে ৫শ' টাকা জরিমানা কিংবা তিন মাসের কারাদণ্ড, ১৫০ ধারায় কালো ধোঁয়া মামলায় ২শ' টাকা জরিমানা, ১৫১ ধারায় অধ্যাদেশের সঙ্গে সঙ্গতিহীন অবস্থায় গাড়ি চালনা, ব্যবহার, বিক্রয় অথবা পরিবর্তন সাধন মামলায় আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা দুই বছরের কারাদণ্ড, ১৫২ ধারায় রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস অথবা পারমিট ব্যতীত গাড়ি চালনা মামলায় ৭শ' থেকে দুই হাজার টাকা জরিমানা কিংবা তিন মাসের কারাদণ্ড, ১৫৪ ধারায় অনুমোদিত ওজন অতিক্রম করে গাড়ি চালনা মামলায় ৫শ' থেকে দুই হাজার টাকা জরিমানা কিংবা ছয় মাসের কারাদণ্ড, ১৫৫ ধারায় বীমা ব্যতীত বা মেয়াদ উত্তীর্ণ বীমায় গাড়ি চালনা মামলায় এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা জরিমানা, ১৫৬ ধারায় অনুমতিপত্র কিংবা নিয়োগপত্র ব্যতীত গাড়ি চালনা মামলায় এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা জরিমানা কিংবা তিন মাসের কারাদণ্ড, ১৫৭ ধারায় প্রকাশ্য সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, সাধারণ যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা মামলায় আড়াইশ' থেকে ৫শ' টাকা জরিমানা কিংবা গাড়ি বা জিনিস বাজেয়াপ্ত এবং ১৫৮ ধারায় মোটরযানে অননুমোদিত হস্তক্ষেপ বা মিটার টেম্পারিং করা কিংবা স্বেচ্ছায় কোনো যন্ত্রাংশ অপসারণ মামলায় আড়াইশ' থেকে এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান হয়েছে।