কথামালা : ময়ুখ চৌধুরী

বইমেলায় বাদাম-বুট যত বিক্রি হয়, তত হয় না বই

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬      

আবদুল্লাহ আল মামুন

ময়ুখ চৌধুরী। কবি, গবেষক ও সমালোচক। কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। বাংলা কাব্য সাহিত্যে সত্তর-আশির দশক থেকে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে বিচরণ করছেন তিনি। তবে কাব্যের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এবার অমর একুশে বইমেলায় তার পাঁচটি কবিতার বইকে 'ডান হাতের পাঁচটি আঙুল' শিরোনামে এক মলাটে বন্দি করে প্রকাশ করেছে বাতিঘর। দিব্য প্রকাশনা থেকে বেরুচ্ছে নতুন কাব্যগ্রন্থ 'ক্যাঙ্গারুর বুকপকেট'। চট্টগ্রামের একুশে বইমেলা, প্রকাশনা সংস্থার সেকাল-একালসহ নানা বিষয়ে নিভৃতচারী এই কবির সঙ্গে কথা হয়।
'ডান হাতের পাঁচটি আঙুল' প্রসঙ্গে ময়ুখ চৌধুরী বলেন, "এটি নতুন বই নয়। আমার আগের পাঁচটা বইয়ের সংকলন। ১৯৮৯ সালে যখন আমার ছাপা লেখার বয়স ২৪ বছর তখন আমার প্রথম বই 'কালো বরফের প্রতিবেশী' বের হয়েছিল। এর ১০ বছর পর বেরিয়েছে 'অর্ধেক রয়েছি জলে, অর্ধেক জালে'। ২০০২ সালে বের হয় শেষ বই। বইটার এমন অলুক্ষণে নাম, খুব অলক্ষ্মী নাম 'আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে'। সেই একটু দেরি একেবারে তেরো বছর। এরপর এসে অনেকটা কৈফিয়ত দেওয়ার মতো বেরুলো 'পলাতক পেণ্ডুলাম'।"
তিনি বলেন, '১৯৮৯ কিংবা ২০০২ সালে যাদের বয়স দশ, ওই প্রজন্মের পাঠকরা তো আমার বই পায়নি। তাহলে আমাকে বুঝবে কী দিয়ে। এই বই দিয়ে মোটামুটি আমাকে বিচার করতে পারবে। ভালো হোক, মন্দ হোক। পছন্দ অপছন্দ। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যারা আমার সম্পর্কে জানে না, তারা একেবারে পলাতক পেন্ডুলাম পেয়ে ভাবছে যে কড়কড়ে, বস্তুবাদী। কিন্তু আমার যে গোড়া অন্যরকম, আমি সব করে এসে যে এটা করেছি এটা তারা বুঝতে পারবে।' চট্টগ্রামে

বইয়ের দোকান ক্রমান্বয়ে কমছে বলে মনে করছেন কবি ময়ুখ চৌধুরী। তিনি বলেন, 'চট্টগ্রাম সবসময় সওদাগরের এলাকা। এত দোকানপাট। দেখেন কয়টা বইয়ের দোকান আছে? আমার চোখের সামনে অনেক বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। খাবারের দোকান আর কাপড়ের দোকান বাড়ছে। বহিরাঙ্গিকের জন্য সবকিছু আছে। মনের জন্য কিছুই নেই। অর্থাৎ মন নেই, বহিরাঙ্গিকতা আছে।'
দেশের মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের অন্যতম পুরোধা সৈয়দ মোহাম্মদ শফির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ময়ুখ চৌধুরী বলেন, 'যতদিন তিনি ছিলেন ততদিন চট্টগ্রামের আর্ট প্রেস থেকে খ্যাতিমান অনেক কবি সাহিত্যিকের বই বের হয়েছে। ঠিকানা ছিল ৬, কাজী নজরুল ইসলাম রোড, ফিরিঙ্গী বাজার। মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান আর্ট প্রেস ঘিরে গড়ে তুলেছিলেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইঘর। ওনার রুচি আলাদা ছিলো। তবে তিনি খ্যাতিমান লেখকদের লেখা নিতেন। অথবা খ্যাতিমান লেখকরা যাদের জন্য তদবির করতেন, তাদের বই প্রকাশ করতেন। যেমন শামসুর রাহমান শহীদ কাদরীর জন্য তদবির করেছিলেন বলে উত্তরাধিকার বের হয়েছিল। সৈয়দ আলী আহসান, আবুল ফজল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী এদের বই এখান থেকে প্রকাশ করেছিলেন। বইয়ের ওপরে এখন যে জ্যাকেট দেওয়া হচ্ছে সেটা শুরু করেছিল বইঘর। শুধু জ্যাকেট না প্যাকেটও। বাংলাদেশের সবচেয়ে স্টান্ডার্ড পাবলিকেশন্স ছিলো এটি।'
চট্টগ্রামে পেশাদার প্রকাশকের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন কবি ময়ুখ চৌধুরী। তিনি বলেন, 'পেশাদার প্রকাশক বলতে বুঝি, যিনি পুস্তক প্রকাশ করে তার রিজিক জোটান। অর্থাৎ প্রকাশনা যার পেশা। সেটা বাংলাবাজারে আছে। চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় আছে বইয়ের দোকান। তারা বড়জোর বের করে আল কোরআনের বঙ্গানুবাদ, তাজকিরাতুল আউলিয়া, কাসাসুল আম্বিয়া, বেহেশতি জেওর। এগুলো সবসময়, সারা বছর চলে। এখন আরেকটা যোগ হয়েছে রান্নাবান্না সংক্রান্ত বই। হয়তো আগামী বছর হবে সাজসজ্জ্বার উপরে। চটজলদি সাজবেন কিভাবে এ সংক্রান্ত।'
প্রকাশনা শিল্পের বিকাশে সরকারকে এগিয়ে আসার আহবান জানান এ লেখক। তিনি বলেন, 'সরকারকে সাহায্য করতে হবে। কাগজের দাম কমাতে হবে। প্রিন্টিং মেটেরিয়ালসের দাম কমাতে হবে। যে পর্যন্ত প্রকাশনা সত্যিকার অর্থে লাভজনক না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রি হবে না। ইন্ডাস্ট্রি না হলে লেখকদের টাকা পয়সা দেওয়া হবে না। লেখকরা যদি টাকা পয়সা না পায়, অত দায়িত্ব নিয়ে লিখতে চাইবে না।'
চট্টগ্রামে আয়োজিত বই মেলায় বাদাম বুট যত বিক্রি হয়, বই তত বিক্রি হয় না মন্তব্য করে ময়ুখ চৌধুরী বলেন, 'ক্ল্যাসিক্যালি বইমেলা হতে হবে। না হলে এটার ডিগনিটি থাকবে না। মেজাজটা থাকবে না। বইমেলার পরিবেশটাই আলাদা। পাঠকরা সারা বছরের সবগুলো বই একসঙ্গে পাবে। বিভিন্ন দোকানে না ঘুরে একটা বিশেষ সময়ের মধ্যে সবগুলো বই পাব, এবার আমি চয়েস করে নেব।'
তিনি বলেন,'মেলার আরেকটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বন্ধন তৈরি। পাঠকের সঙ্গে পাঠকের। লেখকের সঙ্গে পাঠকের। লেখকের সঙ্গে লেখকের।'
মেলা উপলক্ষে বই প্রকাশের মিছিল প্রসঙ্গে ময়ুখ চৌধুরী বলেন, 'বইয়ের মান খুবই নিচু। আপনি দেখবেন যে দৈনিক পত্রিকা যেসব বিষয় প্রাধান্য দেয়, সেই বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে এখন বই বেরুচ্ছে। সে বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে বই লেখা হচ্ছে বেশি। ওগুলো চলে। তার মানে সংবাদপত্র পাঠকরাই এখন এ সমস্ত প্রকাশনার পাঠক।'
তিনি বলেন, 'এ মেলায় সঙ্গীতের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস-এ নিয়ে কোনো বই কি বের হয়েছে? যেন সঙ্গীত সম্পর্কে তত্ত্ব আওড়ে লাভ কি। সঙ্গীততো এমনিতে পাচ্ছি। আনারস কোথা থেকে এলো, কিভাবে এলো জানার দরকার নেই। আনারস খাও। খেতে পাচ্ছি এতেই যথেষ্ট।'
তরুণ লেখকদের উদ্দেশ্যে ময়ুখ চৌধুরী বলেন, 'লিখতে গেলে পড়তে হবে। আমি কী লিখি, এ লাইনে আর কারা কারা লিখেছে তা জানতে হবে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই পড়তে হবে। রবীন্দ্রনাথ এ জন্য পড়তে হবে কারণ আমি রবীন্দ্রনাথের মতো লিখব না। অতএব কার মতো লিখব না ওটা আগে জানতে হবে। কিভাবে লিখব না সেটাও জানতে হবে।'
তরুণ লেখকদের টাকা দিয়ে বই প্রকাশ না করে ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন কবি ময়ুখ চৌধুরী। তিনি বলেন, 'উৎসাহ থাকা ভালো, তার চেয়ে ভালো হচ্ছে ধৈর্য থাকা। আমার লেখা যত কবিতা আছে তার দশ ভাগের মাত্র এক ভাগ ছাপিয়েছি। দুর্বল লেখা দিয়ে কেন বই বের করব? কোনো কবি প্রথম যখন বই বের করে তখন মনে করে এটা বিশ্বসাহিত্যের সেরা সংযোজন। ২০ বছর পর দেখা যাচ্ছে সে ওই বইটাকে আর অনুমোদন দিচ্ছে না।'