নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালে যানবাহন আটকে থাকছে দীর্ঘ সময়। হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কারণে চতুর্মুখী মোড়ে কোনো দিক ফাঁকা, আবার কোনো দিকে দেখা যায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল লাইটের পরিবর্তে পুলিশের মর্জিমাফিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন মোড়ে এই হ-য-ব-র-ল অবস্থার প্রভাব প্রধান সড়ক ছাড়িয়ে পড়ছে উপসড়কগুলোতেও। ফলে যানজট তীব্র হচ্ছে। যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে যন্ত্রণা-দুর্ভোগ। রমজানে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইফতারের আগে নগরীর বেশিরভাগ মোড়ে ভয়াবহ যানজট হচ্ছে।
অবশ্য যানজটের জন্য ফ্লাইওভার নির্মাণ, ওয়াসা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সড়ক খোঁড়াখুঁড়িও দায়ী বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। অবৈধ পার্কিং, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণেও মোড়ে যানবাহনের চাপ দেখা যায়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ও খাতুনগঞ্জকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনও যানজটের বড় কারণ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী নগরীতে সবচেয়ে বেশি যানজট হয় ষোলশহর দুই নম্বর গেট, প্রবর্তক মোড়, জিইসি মোড়, ওয়াসা, বাদামতলী, আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, নিউমার্কেট, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, তিনপুলের মাথা, সল্টগোলা ক্রসিং, ইপিজেড মোড়, সিমেন্ট ক্রসিং এলাকাসহ ২০টি প্রধান মোড়ে। এ ছাড়া বন্দর থেকে পোর্ট কানেকটিং সড়কেও তীব্র যানজট হয়।
এমন বাস্তবতায় ট্রাফিক পুলিশ কখনও রশি টানিয়ে, কখনও সড়কে ব্লক বসিয়ে কিংবা স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল লাইটের পরিবর্তে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে সড়কে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছে। 'অচল' ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেও ঈদুল ফিতরের আগে নগরবাসীকে স্বস্তিতে চলাফেরার সুযোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।
হালিশহরের বাসিন্দা মোবাইল ফোন কোম্পানির কর্মকর্তা মঞ্জুর মিশু আলম সমকালকে বলেন, 'বিশ্বরোডের মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের কারণে সড়কে নিয়মিত যানজট হয়। ট্রাফিত পুলিশ সদস্যরা বড় বড় লরি রাস্তায় দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র দেখার নাম করে চাঁদাবাজি করে। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় আমাদের। অফিসে যেতে প্রায়ই দেরি হয়।' নগরীর বালুচড়া এলাকার ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, 'মুরাদপুর-ষোলশহর পার হয়ে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে প্রায়ই ট্রাফিক বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। ট্রাফিক পুলিশ অযাচিতভাবে মোড়ের একটি অংশকে তাড়াতাড়ি পার করে দেয়। আরেক অংশকে সিগন্যালে আটকে রাখে অনেকক্ষণ। সকালে বাচ্চাকে স্কুলে নেওয়া এবং আনার কাজ করতেই অর্ধেক দিন পার হয়ে যায়। অনেক সময় গাড়ি সড়কে রেখে হেঁটে বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়।' আবাসন ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বলেন, 'গাড়ি নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় যাওয়া যেন এক ধরনের শাস্তি।' ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অনিময় তুলে ধরে আরেক ব্যবসায়ী নঈম উদ্দিন বলেন, 'ইপিজেড এবং খাতুনগঞ্জ এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গাড়ি নিয়ে যাওয়া মানে হাতে ২ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় নিয়ে বের হওয়া। আগ্রাবাদ ও চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় পাগলা যানজট লেগেই থাকে।'
সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের হওয়া মালবাহী লরিগুলো বন্দরের বাইরের সড়কে সারি সারি করে দাঁড়িয়ে রাখা হয়। অথচ এটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ইপিজেডসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র সড়ক। এমন সড়কে কাভার্ড ভ্যান দাঁড় করিয়ে রাখা হলেও ট্রাফিক পুলিশ নির্বিকার থাকে। ফলে দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। মাসুদ আলম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, 'সন্ধ্যা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ইপিজেড এলাকার যানজটের কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অনেক যাত্রী ফ্লাইট মিস করেন। এটা দেখার যেন কেউই নেই।' এ ছাড়া নগরীর বেশিরভাগ মোড়ের চিত্রও অভিন্ন। দেখা যায় ট্রাফিক সদস্যরা সনাতনী পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে গলদঘর্ম হচ্ছেন। আর ট্রাফিক সার্জেন্টরা রাস্তার একপাশে বসে অলস সময় কাটান।'
নগরীর ১২৪টি মোড়ের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি মোড়ে ডিজিটাল সিগন্যালিং আছে। তবে সেগুলোও ব্যবহার করা হয় না। পুরনো কৌশলে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খান ট্রাফিক কর্মকর্তারাও। নগরীর অলঙ্কার মোড়ের ট্রাফিক পরিদর্শক হাফিজ আক্তার সমকালকে বলেন, 'গাড়ি চালকরা সচেতন হলে আমাদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও ভালো হতো। কিন্তু চালকরা খুবই বেপরোয়া। আর ছোট গাড়িগুলো ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য বেশি

করায় মোড়ে জট এড়ানো কষ্টকর হয়ে পড়ে।'
সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বন্দরের বাইরে পণ্যবাহী গাড়িগুলোর পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় বন্দরকেন্দ্রিক সব গাড়িই আশপাশের এলাকার সড়ক দখল করে রাখা হয়। এসব গাড়ি টার্মিনালে রাখা না গেলে ওই এলাকার যানজট বাস্তবে কমানো সম্ভব নয়। বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উন্নয়ন প্রকল্প ফ্লাইওভার, সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সড়ক খোঁড়াখুঁড়িও যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন ট্রাফিক কর্মকর্তারা। তারা জানান, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে এটা ঠিক। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে কাজ করা সম্ভব হলে যানজট নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়। এখন মুরাদপুর থেকে ইস্পাহানি মোড় পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। ফলে ওই এলাকায় যানজট বেড়েছে। এ চাপ গিয়ে পড়েছে আশপাশের উপসড়কগুলোতেও। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগে তো এ সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ-উল-হাসান বলেন, 'নগরীর বেশিরভাগ সড়কে অবৈধ পার্কিং করা হয়। এ কারণে চলাচলের রাস্তা ছোট হয়ে পড়ে। এটা যানজটের অন্যতম কারণ। ঈদ সামনে রেখে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হবে, যাতে গাড়ি যত্রতত্র দাঁড় করানো বন্ধ করা যায়। মোড়ে গাড়ি না দাঁড়ালে যানজট কম হয়। এ ছাড়া বড় মার্কেট, বিপণিবিতানসহ গুরুত্বপূর্ণর্ এলাকায় কোনো অবস্থায় অবৈধ পার্কিংয়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।'

মন্তব্য করুন