সেলফে সাজানো থরে থরে বই। পাশে পড়ার টেবিলে বাচ্চাদের সুন্দর ছবি। আছে বাবুল আক্তার ও মিতুর সঙ্গে সন্তানদের ছবিও। পরিপাটি বেডরুমের বিছানাগুলোও। ড্রয়িং রুমে আলমারিতে সাজানো দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বই। পাশেই একটি টিভি, সোফাসেট। পুরো ফ্ল্যাটেই রুচির ছোঁয়া। কিন্তু যার হাতের ছোঁয়ায় সবকিছু এত পরিপাটি সেই তিনিই নেই। এক সপ্তাহ আগে গত রোববার দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাত ও গুলিতে বাসার সামনেই নিহত হন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু।
সেই দিন সকালও ছিল অন্য দিনের সকালের মতো। পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়ে বাবুল আক্তার সদ্য যোগদান করেছেন ঢাকায়। সেই সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা খুন করে মিতুকে। ভেঙে যায় একটি সোনায় মোড়ানো সংসার। স্বামী হন প্রিয়তমা স্ত্রী-হারা। সন্তানরা হারায় তাদের মাকে, বাবা হারায় মেয়েকে।
এসপি বাবুল আক্তার। বাংলাদেশ পুলিশের একজন নির্ভরতার প্রতীক। পেশাগত কারণেই ঝুঁকি তার

নিত্যসঙ্গী। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ায় হুমকি আসত মাঝে মধ্যেই, নানা মাধ্যমে। সেগুলোকে খুব একটা পাত্তা দেননি বাবুল আক্তার। তবে নিজের জীবনের পরোয়া না করলেও শঙ্কায় ছিলেন পরিবার নিয়ে। ঘনিষ্ঠজনদের প্রায়ই সে কথা বলতেন। ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছেন। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে যে গলদ ছিল সেটা বোঝা গেল গত ৫ জুন সকালে। যখন দুর্বৃত্তরা মিতুকে হত্যা করে সবার সামনে দিয়ে নিরাপদে চলে গেছে। এসপি হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর ঘটনার দু'দিন আগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন বাবুল আক্তার। পদোন্নতির আগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কথা ছিল একটু থিতু হয়েই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাবেন। কিন্তু তার আগেই দুর্বৃত্তের হামলায় তছনছ হয়ে গেল তার সাজানো সংসার।
ঘটনার দিন ইকুইটি সেন্ট্রিয়ামে বাবুল-মিতুর ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা গিয়েছিল শোকে পাথর বাবুল আক্তার তার দুই সন্তান মাহির ও তাবাসসুমকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। কারও সাথে কথা বলছিলেন না। যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। শুধুই তাকাচ্ছিলেন এদিক-ওদিক। মনের অজান্তেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন তার সহধর্মিণী মিতুকে। যে মিতু তার বাবার আদরের সংসার থেকে বাবুলের আটপৌরে সংসারে এসে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন দারুণভাবে। প্রিয়তম স্ত্রীর কথা মনে পড়লেই চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছিল অশ্রু। সেদিনই সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় চলে যান বাবুল আক্তার। ঝিনাইদহে স্ত্রীকে দাফনের পর এখন ঢাকায় খিলগাঁওয়ের বাসায় আছেন বাবুল আক্তার। আর চট্টগ্রামে তার সেই সাজনো ফ্ল্যাটটি এখন তালাবদ্ধ। এই চট্টগ্রামে দীর্ঘ আট বছর বিভিন্ন পদে ছিলেন বাবুল আক্তার। এই চট্টগ্রামেই তার দুই সন্তানের জন্ম। এই শহরের বাসিন্দাদের নিজের মানুষ মনে করতেন তিনি। কতবার যে দুর্বৃত্তদের ধরতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। যে চট্টগ্রামে এসে বাবুল আক্তার নানা অপরাধের রহস্য উন্মোচনে দুর্বার গতিতে এগিয়েছেন, যেখানে এসে পিতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন, সেখান থেকে চট্টগ্রামকে অন্তর থেকেই ভালোবাসতেন তিনি। দারুণ সন্তুষ্টি নিয়েই তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন পুলিশ সুপার পদে যোগ দিতে। এই শহরেই নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষকে এভাবে হারাবেন ভাবেননি কখনোই। এখন বাবুল আক্তারের চোখে কান্না, বুকভাঙা আহাজারি। চট্টগ্রামবাসী কামনা করেছে, বাবুল আক্তার যেন এ শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন। কারণ হাজারো মানুষ তার দিকেই তাকিয়ে থাকে বিপদমুক্তি আর পরিত্রাণের আশায়।
স্বজন ও সহকর্মীরা জানান, মাহমুদা খানম মিতুর বাবা ছিলেন পুলিশের পরিদর্শক। বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। বাবার ঘরে অত্যন্ত আদরে মানুষ হয়েছেন। কিন্তু বিয়ের পর বাবুল আক্তারের সংসারে এসেই মিতু বুঝতে পারেন মানুষের জীবন কতটা সাদামাটা হতে পারে। তবে কোনো আক্ষেপ ছিল না মিতুর। দ্রুত সেই আটপৌরে জীবনে নিজেকে মানিয়ে নেন। আপন করে নেন পরিবারের অন্যদের। অল্পতেই তুষ্ট থাকতেন তিনি। বাইরে কখনও তাকে অপ্রয়োজনীয় খরচ কিংবা বিলাসিতা করতে দেখেনি কেউ। বাবুল আক্তারের ফুফাতো ভাই মো. ওয়াহিদ সমকালকে বলেন, 'এই একজন মানুষের প্রস্থানে গোটা সংসারে এখন শোকের ছায়া। বাবুল-মিতুর ভালো বোঝাপড়ার সংসার এই যুগে যে কোনো দম্পতির কাছে ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু সন্ত্রাসীরা সব তছনছ করে দিল।'
এদিকে বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনায় পুরো চট্টগ্রামবাসী শোকে আচ্ছন্ন রয়েছে এক সপ্তাহ ধরে। ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে প্রায় প্রতিদিনই মানববন্ধন-প্রতিবাদ সমাবেশ করছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। তাৎক্ষণিকভাবে অনেকেই ফেসবুকে সমালোচনা, ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যেমন সহমর্মিতা দেখিয়েছেন, তেমনি বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছিল রোববার। আড্ডা আর আলাপচারিতায় ঝড় তুলছে এই ঘটনা।
সাংস্কৃতিক সংগঠক ডা. চন্দন দাশ বলেন, 'বাবুল আক্তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে জীবনবাজি রেখে একের পর এক সফল অপারেশন করেছেন। তারই পরিণতি হিসেবে তার স্ত্রী টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। আমরা রাজপথে মানববন্ধন করব সৎ-সাহসী পুলিশ অফিসারদের মনোবল অটুট রাখতে। তারা যাতে উপলব্ধি করতে পারে সাধারণ মানুষ তাদের পাশে আছে। থাকবে।' তিনি জানান, টার্গেট কিলিং বন্ধ করতে হলে সরকারকে আইনিভাবে টার্গেট কিলিং করতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত রোববার সকালে নগরীর ও আর নিজাম রোডের বাসা থেকে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে জিইসি মোড়ে যাওয়ার সময় জঙ্গি কায়দায় খুন হন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু। এই খুনের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিদেশি, হিন্দু, পুরোহিত, খ্রিস্টান যাজকদের হামলার মিল রয়েছে; সেসব ঘটনায় জঙ্গিরাই মূল সন্দেহভাজন। পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে কিছুদিন আগে ঢাকার পুলিশ সদর দফতরে যোগ দেওয়ার জন্য বাবুল আক্তার চট্টগ্রামে ছিলেন না।

মন্তব্য করুন