পটিয়া পৌর সদরের ছবুর রোড এলাকা দিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল খলিলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় ও আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ ছাত্রী। এ সময় গুরুসম্পদ দাশ নামের এক যুবক তাদের উত্ত্যক্ত করে। ছাত্রীরা মিলে ধরে ফেলে ওই যুবককে। জুতাপেটা করে নিয়ে যায় পটিয়া থানায়। তারপর ভ্রাম্যমাণ আদালত গুরুসম্পদকে এক মাসের কারাদণ্ড দেন।
ওই ঘটনা ঘটেছিল ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্ব্বর সকাল ১০টায়। এখনও পটিয়ায় ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের কাছে সেই ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তারপর থেকে কমে গেছে ইভটিজারদের উৎপাতও। শুধু পথচলতি এরকম বাধা-বিপত্তি নয়, জীবনের চলার পথে সব বাধা ডিঙ্গিয়ে যেতে চায় পটিয়ার স্কুুলছাত্রীরা।
বাধা জয় করে জীবনের লক্ষ্যে পেঁৗছতে তাদের স্বপ্নের সারথি হয়েছে 'নিরাপদ স্কুল, নিরাপদ সমাজ' নামের একটি প্রকল্প। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) এই প্রকল্পটি পরিচালনা করছে তিন বছর ধরে।
পটিয়া উপজেলার নয়টি, চট্টগ্রাম নগরীতে সিটি করপোরেশন পরিচালিত পাঁচটি এবং সন্দ্বীপ উপজেলার ছয়টি বিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় মোট ৮০টি বিদ্যালয়ে চলছে এ কার্যক্রম। দাতা সংস্থা ইউএন ট্রাস্ট ফান্ড টু ইন্ড ভায়োল্যান্স এগেইনস্ট ওমেন (ইউএন ওমেন)-এর অর্থায়নে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে।
ইভটিজারদের প্রতিরোধের পটিয়ার সেই ঘটনায় সাহস জুগিয়েছিল এই প্রকল্পের শিক্ষা। পটিয়ার স্কুুলছাত্রীরা এখন কারাতেও শিখছে। তারা নিজেরাই ঠিক করছে কোন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেবে আর লেখাপড়া শেষ করে বেছে নেবে কোন পেশা। পাশাপাশি প্রতিবেশী মেয়েদেরও সচেতন করছে নারী অধিকার বিষয়ে।
পটিয়ার ভেল্লাপাড়া সৈয়দ আবদুন নূর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলে, 'আমার প্রতিবেশী তিনজন ছাত্রীকে এসএসসি পাসের পর বিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের পরিবার। এ ব্যাপারে আমার মায়ের কাছে তারা পরামর্শের জন্যে আসে। তখন আমি আর মা একসঙ্গে তাদের বোঝাই ১৮ বছর বয়সের নিচে কোনো মেয়ের বিয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ। ওই মেয়েরা এখন পড়ছে।'
জান্নাতুলের সহপাঠী মিজানুর রহমান বলে, 'এখন এলাকায় ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না। এরকম কোনো উদ্যোগ কেউ নিলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেয়।'
মিজানুর জানায়, এখন তাদের এলাকায় অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে স্কুলে গেলে বা স্কুলে যাওয়ার পথে পরস্পর কথা বললে তা 'নেতিবাচক' দৃষ্টিতে দেখা হতো। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। সবাই একসাথে স্কুলে যাই। পড়া নিয়ে আলোচনা করি। কেউ সহপাঠীদের উত্ত্যক্ত করলে আমরাই প্রতিবাদ করি।'
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে সায়মা একা বলে, 'আমরা বুঝেছি মেয়েদেরও সমতা দরকার। পরিবারেও বেশ কিছু পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। আগে জানতাম না শিক্ষাজীবনের ও ব্যক্তি জীবনের একটা লক্ষ্য থাকতে হয়। এখন আমরা লক্ষ্যও নির্ধারণ করছি।'
শিক্ষিকা ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, 'মেয়েদের কেউ পাইলট হতে চায়। কেউ ব্যবসায় শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে ব্যবসায়ী হতে চায়। ওরা বলে, সমান সুযোগ পেলে ছেলেরা যা পারে আমরাও তা পারব।'
সৈয়দ আবদুন নূর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশিদ বলেন, নবম শ্রেণির এক ছাত্রী তার সহপাঠীর সাথেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিল। বিদ্যালয়ের ছাদে প্রেমিকের সামনেই বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অন্য এক ছাত্রীই তাকে নিবৃত্ত করে, শিক্ষকদের কাছে খবর পেঁৗছায়। ছাত্রছাত্রীরা এখন অনেক সচেতন। জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে পারায় লেখাপড়ায়ও তারা ভালো করছে।'
পটিয়া সদরেই খলিলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার

পথে এখন আর কোনো ইভটিজারের অস্তিত্ব নেই। এক ধাপ এগিয়ে আত্মরক্ষায় এখন কারাতে শিখছে ছাত্রীরা। খলিলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, 'যখন কারাতে শেখানোর কথা বলি, তখন দেড়শ ছাত্রী আগ্রহী হয়ে আমার কাছে আসে। তাদের মধ্যে থেকে ৪৩ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।'
তিনি বলেন, কারাতে প্রশিক্ষণ ছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য মাইলফলক। কোনো বিপদ দেখলে তারা নিজেরাই প্রতিহত করতে শিখেছে। অভিভাবক ও অন্য মেয়েদেরও তারা সচেতন করছে। উপজেলার অন্য স্কুলও আমাদের মতো এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
অধিকার আদায়ে ছাত্রীরা আগের তুলনায় বেশি সোচ্চার জানিয়ে শামসুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, ছাত্রীরা এখন ভয় ও সংকোচহীন। শ্রেণিকক্ষে তারা স্বতৎস্ফূর্তর্ভাবে শিক্ষকদের কাছ থেকে পড়া বুঝে নিচ্ছে। কোনো ব্যক্তিগত সমস্যায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পরামর্শও নিচ্ছে।
খলিলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আফিয়া বেগম বলেন, অনেক সময় মেয়েরা লজ্জায় বা ভয়ে অনেক বিষয়ে ঘরেও আলাপ করে না। কিন্তু আমাদের সাথে তারা সেসব বিষয়ে আলাপ করছে। আমরাও পরামর্শ দিচ্ছি।
শুধু নিজেদের আত্মরক্ষা নয়, অন্য কেউ বিপদে পড়লে তাকেও সহযোগিতা করতে চায় ছাত্রীরা। নবম শ্রেণির সাদিয়া আক্তার বলে, আমাদের কেউ এখন আর টিজ করার সাহস পায় না। অন্য কোনো মেয়ে বিপদে পড়লেও আমরা এগিয়ে যাব। বিএনপিএসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে পটিয়ার পৌর মেয়র অধ্যাপক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, 'এটা ভালো উদ্যোগ। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অনেক সচেতন হয়েছে। নারী নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার ব্যক্তিত্ব। তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনেও এই প্রকল্প ভূমিকা রাখছে। মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে আমরা সবসময় তৎপর।

মন্তব্য করুন