নোয়াখালীর আলোচিত ১০ হত্যার ঘটনায় মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত ১৪ থেকে ২১ মার্চ ৩ শিক্ষার্থীসহ ১০ জনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় কয়েকজন আসামি গ্রেফতার হলেও প্রধান অভিযুক্তদের হদিস পায়নি পুলিশ।
নোয়াখালী জেলা সদর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার নব জ্যোতি খীসা বলেন, 'হাতিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আহত দুই আসামি সোহেল ও আশিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। মামলাটি নিয়ে পুলিশ নিবিড়ভাবে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। অন্য ঘটনাগুলোর ব্যাপারেও পুলিশ সচেতন।'
গত ২১ মার্চ দুপুরে একটি পুকুরে কুকুর গোসল করানোকে কেন্দ্র করে ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ও পৌরসভার অনন্তপুর গ্রামে তিন যুবককে গুলি করা হয়। অনন্তপুর গ্রামের হাজী কুদরত উল্যাহর ছেলে সাজু ও সৌরভের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এতে ঘটনাস্থলেই নোয়াখালী জেলার ছাত্রলীগ কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মাইজদী গ্রামের মৃত নুর আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম ওয়াসিম মারা যান। তার বাড়ী মাইজদী গ্রামে। গুলিবিদ্ধ ফজলে রাব্বী রাজিব (২২) ও জামসেদুল হক ইয়াছিন (২৩) আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ মার্চ সাইফুল ইসলাম ওয়াসিম ও পরদির রাজিব ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় ২২ মার্চ নিহত রাজিবের মা কামরুন্নাহার ছবি বাদী হয়ে সাজুকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ এ ঘটনায় দুই নারী ও মামলার সর্বশেষ আসামি রাব্বীকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনার আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ খুনের মামলার মূল আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি। মামলাটি বর্তমানে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ থানার এসআই জসিম উদ্দিন জানান।
গত ১৪ মার্চ সকালে সোনাইমুড়ী উপজেলার চাষীরহাট ইউনিয়নের নতুন বাজারের পাশে হিজবুত তাওহীদ নামের একটি সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে স্থানীয়দের সংঘর্ষ হয়। এতে জামায়াত শিবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হিজবুত তাওহিদের দুই কর্মীকে জবাই শেষে আগুনে পুড়িয়ে এবং একজনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ সময় হিজবুত তাওহীদের নেতাকর্মীদের আটটি বসতঘর ও ২০-২৫টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়। নিহতরা হলেন হিজবুত তাওহীদের কর্মী সোলেমান খোকন (৩৫), ইব্রাহীম রুবেল (২৮) ও স্থানীয় গ্রামবাসী আওয়ামী লীগ কর্মী মজিবুল হক (৫০)। এ ঘটনায় সোনাইমুড়ী থানা পুলিশের এসআই সাইদ মিয়া বাদী হয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির ও স্থানীয় চাষীরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হানিফ মোল্লাকে প্রধান আসামি করে এবং কয়েক হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। একই ঘটনায় সোনাইমুড়ী উপজেলার হেফাজত ইসলামের সভাপতি নুরুল আলমকে প্রধান এবং চাষীরহাট ইউপি চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা হানিফ মোল্লাকে দ্বিতীয় আসামি করে অপর মামলাটি দায়ের করেন হিজবুত তাওহীদের নিহত কর্মী ইব্রাহীম রুবেলের স্ত্রী হাজেরা আক্তার। পুলিশ ঘটনার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এই দুই মামলার মূল আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
১৮ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে হাতিয়া উপজেলার চেয়ারম্যানঘাট এলাকায় আর আর এফ (রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স) পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা করে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসী ও পুলিশ ছয়জনকে ধরে গণপিটুনি দেয়। এতে চারজন নিহত ও দুজন আহত হন। নিহতরা হলেন জয়পুরহাট পৌরসভার বাসিন্দা এ আর মোস্তফা কামালের ছেলে আবু বকর ছিদ্দিক (২৮), গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাঠালবাড়ি গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে সাইফুল ইসলাম সুজন (২৭), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রহিমাপুর গ্রামের মৃত দেলোয়ার হোসেনের ছেলে আকবর আলী

সাবি্বর ও লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার নুরানী হাজীর হাট এলাকার নুরুল আমিনের ছেলে আবদুল করিম।
এই ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। ডাকাত সন্দেহে আটক করার পর ছয় ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানো হয়নি। শুধু কোমরে রশি দিয়ে বাঁধা ছিল তারা। রাত ১১টায় জেনারেটরের আলো চলে গেলে আটককৃত ব্যক্তিরা পুলিশের ওপর হামলা করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আসামি ধরার ব্যাপারে পুলিশের গড়িমসির অভিযোগ অস্বীকার করে সোনাইমুড়ী থানার ওসি কাজী হানিফুল ইসলাম ও বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি গোলাম ফারুক হাতিয়া থানার ওসি এটিএম আরিচুল হক বলেন, হত্যা মামলার আসামিদের ধরতে পুলিশ মাঠে রয়েছে। এছাড়া পুলিশি তদন্তও অব্যাহত রয়েছে।
বেগমগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সিকদার মো. হাছান ইমাম বলেন, আসামিরা এলাকাছাড়া হওয়ায় তাদের ধরতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে শিগগিরই খুনিরা পুলিশের হাতে ধরা পড়বে।

মন্তব্য করুন