দীঘিনালায় ন্যাড়া পাহাড়ে সেনাবাহিনীর বনায়ন

জাতীয় পুরস্কার লাভ

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৮      

জাহাঙ্গীর আলম রাজু, দীঘিনালা

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় শান্তি-সম্প্রীতি স্থাপন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে সেনাবাহিনী। দীঘিনালা সেনানীবাসের অ্যাডহক ফরমেশন রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টারের আওতাধীন প্রায় ৫৪ একর পরিত্যক্ত ন্যাড়া পাহাড়ে ফলদ, বনজ, ঔষধি এবং সৌন্দর্যবর্ধনকারী নানা প্রজাতির গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন বনায়ন সৃষ্টির জন্য সেনাবাহিনীকে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করেছে সরকার।

শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, বিশাল আয়তনের এই বনভূমি ঘিরে কৃত্রিম জলাশয়, পাখির অভয়ারণ্য ও বিশ্রামাগার তৈরির মাধ্যমে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অ্যাডহক ফরমেশন রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টারের পরিশ্রমী সেনা সদস্যরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি-সম্প্রীতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর অসংখ্য দৃষ্টান্ত থাকলেও প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার অর্জন সেনাবাহিনীর জন্য নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা।

সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল আয়তনের ন্যাড়া পাহাড়ে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরি সহযোগিতায় দীঘিনালা সেনানীবাসের অ্যাডহক ফরমেশন রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টারের সেনা সদস্যরা দৃষ্টিনন্দন বনায়ন করেছেন। প্রায় ৫৪ একর পাহাড়জুড়ে শোভা পাচ্ছে মেহগনি, অর্জুন, কড়াই, আকাশমনি, ঝাউ, আম, লিচু, কাঁঠাল, হরীতকী, জলপাই, কাঠবাদাম, আমলকী, লটকন, কাজি পেয়ারা, নিম, জাম্বুরা, কমলা লেবু, সুপারি, নারিকেল, বরই, ডালিম, বাঁশ, সফেদা, কদম, লেবু, মালটা, বেলজিয়াম, চিকরাশি, বেল, একাশি, রেন্ডি কড়ই ও মিষ্টি তেঁতুলসহ নানা প্রজাতির প্রায় ২২ হাজার বৃক্ষের চারা। ২০১৭ সালে সেনানিবাসের আওতাধীন পরিত্যক্ত ন্যাড়া পাহাড় পরিস্কার করে এসব বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়েছে বলে সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ট্রেনিং সেন্টারের চারপাশে লাগানো হয়েছে হরেক রকম বাহারি বৃক্ষের চারা। বনভূমি ঘিরে রয়েছে পাখির অভয়ারণ্য, কৃত্রিম জলাশয় ও বিশ্রামাগার।

জানা যায়, জাতীয় বৃক্ষমেলায় অংশ নিয়ে বৃক্ষরোপণে সাফল্য অর্জন করায় দীঘিনালা সেনানিবাসের অ্যাডহক ফরমেশন রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টারের সেনাবাহিনীকে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করে সরকারের কৃষি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত ২৪ জুন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মাঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ মেলায় অংশগ্রহণকারী সেনা সদস্যদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বৃক্ষরোপণে প্রথমবারের মতো দীঘিনালার সেনা সদস্যদের জাতীয় পুরস্কার অর্জন পাহাড়ের অন্য সেনাছাউনিসহ সাধারণ মানুষের মাঝে বৃক্ষরোপণে উৎসাহ জোগাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক পলাশ বড়ূয়া বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করায় সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, 'প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা এবং সবুজের সমারোহ সৃষ্টিতে সেনাবাহিনীর বিশাল আয়তনের এই বনভূমি সহায়ক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি অন্য সেনাছাউনিসহ সাধারণ মানুষের মাঝে বৃক্ষরোপণের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করবে। তিনি আরও বলেন, ট্রেনিং সেন্টারের চিফ ইন্সট্রাক্টর (সিআই) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের উদ্যোগে বনভূমি ঘিরে পাখির যেসব অভয়ারণ্য এবং কৃত্রিম জলাশয় সৃষ্টি করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেন, দীঘিনালা সেনানীবাসের পরিত্যক্ত ন্যাড়া পাহাড়ে বনায়নের জন্য অ্যাডহক ফরমেশন রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টারের চিফ ইন্সট্রাক্টর (সিআই) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের আগ্রহ দেখে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা কারিগরি এবং মাঝে মধ্যে চারা দিয়ে সহযোগিতা করি। ২০১৭ সালে ট্রেনিং সেন্টারের সেনা সদস্যদের নিরলস পরিশ্রমে নানা প্রজাতির ২২ হাজার ১০০টি বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়। এর মধ্যে ২১ হাজার ৭৭৫টি চারা বেড়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে মিশ্র বনায়নে এটি একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।

এ বিষয়ে অ্যাডহক ফরমেশন রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টারের চিফ ইন্সট্রাক্টর (সিআই) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, 'আমি এই ট্রেনিং সেন্টারে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিত্যক্ত ন্যাড়া পাহাড়গুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় এ নিয়ে চিন্তা করছিলাম। বনায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ শুরু করি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা এবং ট্রেনিং সেন্টারের সেনা সদস্যদের নিরলস প্রচেষ্টায় আমার চিন্তা ও উদ্যোগ সফল হয়েছে।

বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয়টি সেনা সদস্যদের পরিশ্রমের ফসল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'পরিশ্রম হলেও এখন বেড়ে ওঠা গাছের চারাগুলো দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। তাছাড়া বিশাল আয়তনের এই বনভূমিকে দৃষ্টিনন্দন হিসেবে গড়ে তুলতে পাখির অভয়ারণ্য ও কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করা হয়েছে। আগামীতে আরও সুদূরপ্রসারী' পরিকল্পনা নিয়ে এই বনভূমিকে নান্দনিকভাবে সাজানো হবে।