বহদ্দারহাট মোড় থেকে পটিয়ার শিকলবাহা ক্রসিং মোড়

নরক যন্ত্রণার ৮ কিলোমিটার

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৮      

আহমদ উল্লাহ

নরক যন্ত্রণার ৮ কিলোমিটার

নগরীর বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত শাহ আমানত সংযোগ সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। দুই পাশে সামান্য জায়গা গাড়ি চলাচলের জন্য রাখা হলেও বাকি অংশ বাস, ট্রাকের স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এতে করে প্রতিদিনই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যানবাহনগুলো বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ছে, ভয়াবহ যানজট হচ্ছে। মো. রাশেদ

রাস্তার মধ্যখানে দুই পাশে ঘেরাও দিয়ে চলছে উন্নয়নকাজ। বিশাল রাস্তার দুই পাশে চিপা একটা অংশ খালি রাখা হয়েছে যানবাহন চলাচলের জন্য। ওই চিপা দিয়ে একটার বেশি বাস-ট্রাক চলতে পারে না। ফলে এক কিলোমিটারের আগে যেখানে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার শুরু হয়েছে, সেখান থেকে যানবাহনের সারি রাহাত্তার পুল ফেলে কখনও কালামিয়া বাজার-রাজাখালী সেতু পর্যন্ত চলে যায়। ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোয় গাড়ি। অথচ ঘের দেওয়া অংশ বড় বড় বাস, ট্রাক, টেম্পোর স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এত বড় সড়কে গাড়ি চলাচলের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে সামান্য, অথচ ঘেরাও দেওয়া অংশ পরিণত হয়েছে ভ্রাম্যমাণ স্ট্যান্ডে। উন্নয়নকাজের জন্য বহদ্দারহাট মোড় থেকে শাহ আমানত কর্ণফুলী সেতু অংশের এই বেহাল অবস্থা।

আবার সেতুর দক্ষিণে শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত সড়কের অর্ধেকাংশ খোলা থাকলেও বাকি অংশে চলছে মাটি ও পিচ ঢালাই। সেখানেও চরম দুর্ভোগ সহ্য করে চলছে যানবাহন। বলতে গেলে কর্ণফুলী সেতুর দুই পাড়ে উন্নয়নকাজের চাপে সড়কের এখন নরক-দশা।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হানিফ পরিবহনের চালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, 'বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার পার হয়ে সড়কে নামতেই যানজটে আটকা পড়তে হয়। ওই সড়কে কোনো শৃঙ্খলা নেই। যেখানে-সেখানে নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কাজেও কোনো সমন্বয় নেই। ফলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। নগরী থেকে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং বান্দরবান ও কক্সবাজারমুখী যানবাহন ওই এলাকা পার হতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। সেতুর দুই পাড়ে চলছে কাজ। এর ফলে সেতুতে আসা-যাওয়ার সময় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।' ওই সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধেও অবহেলার অভিযোগ করেন চালকেরা।

বহদ্দারহাট মোড় থেকে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এবং শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণ পাড় থেকে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ক্রসিং মোড় পর্যন্ত আট কিলোমিটার সড়কে এখন নরক যন্ত্রণা। এ সড়কে ছয় লেন ও চার লেন সংযোগ সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে খুব ধীরগতিতে। এতে প্রতিদিন তীব্র যানজটে আটকা পড়ছে শত শত যানবাহন। দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে হাজার যাত্রী। কখনও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজটে অচল থাকছে পুরো এলাকা। বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত পৌঁছাতেই পার হয়ে যাচ্ছে এক থেকে দুই ঘণ্টা। ভাঙাচোরা ও গর্তে ভরা এবড়ো-থেবড়ো সড়কে হেলেদুলে চলছে যানবাহন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, পুরো সড়কের মাঝে মাঝে কিছু অংশে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাটের কাজ যে অংশে শেষ হয়েছে সেখানে অ্যাসপল্ট প্লান্টের কাজ শেষ করা হয়েছে। আবার অনেক অংশে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়নি। কাজ চলছে শামুকগতিতে। উন্নয়নকাজের জন্য সড়কের প্রায় পুরোটাই ঘেরাও দিয়ে রাখা হয়েছে। দুই পাশের দুটি খুবই সরু পথে যানবাহন চলাচল করছে। আবার সেই পথেও আছে নানা জঞ্জাল। ফলে যানজট লেগেই আছে।

রাহাত্তার পুল অংশে বিকল্প সড়কটি এত সরু যে সেখানে বড় যানবাহন চলতে গিয়ে নির্মাণকাজের জন্য দেওয়া ঘেরার সঙ্গে আটকে যাচ্ছে। আবার ওই সড়কে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণসামগ্রী। একই অবস্থা রাজখালী এলাকাতেও। যানবাহন চলাচলের জন্য দু'পাশে ছেড়ে দেওয়া অংশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে আটকে যাচ্ছে যানবাহন।

সড়ক ও জনপদ বিভাগের এ প্রকল্পের ম্যানেজার তোফায়েল মিয়া বলেন, 'সেতুর দক্ষিণ পাড়ে এখন ১১০০ মিটার সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। টানা বর্ষণ ও ঈদের কারণে কাজের গতি কম ছিল। ফলে একটু সময় লাগবে।' তিনি বলেন, সেতুর দক্ষিণ পাড়ে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে অপর অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারবে। দক্ষিণ পাড়ে অ্যাসপল্ট প্লান্টের কাজ শেষ হয়েছে। বহদ্দারহাট থেকে সেতু পর্যন্ত শহরের অংশে ৫ কিলোমিটারের কাজ এখনও বেশি হয়নি। তার জন্য কিছু সময় মানুষকে কষ্ট করতে হবে।

এদিকে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যাত্রী দুর্ভোগ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। যত্রতত্র পার্কিং, সড়কজুড়ে অবৈধ যানবাহনের ছড়াছড়ি, সীমাহীন যানজট, তদারকির অভাব এসব কারণে এই ব্যস্ততম মহাসড়কে যাত্রী দুর্ভোগ অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। নগরীর বহদ্দারহাট থেকে হজরত শাহ্‌ আমানত সেতু পর্যন্ত সংযোগ সড়ক ছয় লেন ও সেতু থেকে আনোয়ারা ক্রসিং পর্যন্ত সেতু সংযোগ সড়কটি চার লেনের কাজ বর্তমানে দৃশ্যমান হয়ে উঠলেও পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং বিআরটিএ ছাড়াও সংশ্নিষ্ট থানা ও উপজেলা প্রশাসন থাকলেও সড়কের দুই পাশে যত্রতত্র পার্কিং, সড়কের সোল্ডার দখল করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এবং রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের গ্যারেজ ও অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে।

প্রকল্প ম্যানেজার সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী তোফায়েল মিয়া সমকালকে আরও জানান, 'ইতিমধ্যে পুরো প্রকল্পের (বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী সেতুর দক্ষিণ পাড়ের শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার সড়কে) কাজ শেষ হয়েছে ৬০ ভাগ। মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে ৭৫ ভাগ। পুরো প্রকল্পের সবগুলো (৮টি কালভার্টের কাজ) কালভার্টের কাজ শেষ হয়েছে। ৪টি ব্রিজের সাব স্ট্রাকচারের কাজও শেষ হয়েছে। এখন সুপার স্ট্রাকচারের কাজ শুরু হবে। রাহত্তারপুল এলাকায় ১নং ব্রিজের কাজ শেষ হয়েছে। আরও দুটি ব্রিজের কাজ চলছে।'

সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের ২৭০ কোটি টাকার মধ্যে ১০৭ কোটি টাকা দিয়েছে কুয়েত সরকার এবং অবশিষ্ট ১৬৩ কোটি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। কুয়েত ফান্ডের ১০৭ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। সরকারি বরাদ্দ ১৬৩ কোটি টাকা সহসা মিলবে বলে জানান প্রকৌশলী তোফায়েল মিয়া। প্রকল্পের মধ্যে আছে বহদ্দারহাট ইন্টারসেকশন থেকে  কর্ণফুলী সেতুর শহরের অংশে (বহদ্দারহাট থেকে সেতু পর্যন্ত) ৬ লাইনের ৫ কিলোমিটার এবং সেতুর দক্ষিণ পাড়ে ৪ লাইনের ৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ। এই প্রকল্পে শহরের অংশে ৪টি সেতু এবং সেতুর দক্ষিণ পাড়ে ৭টি ও শহরের অংশে ১টি কালভার্ট ও ৩টি আন্ডারপাস নির্মাণ। রাহাত্তারপুল, কালামিয়া বাজার ও চাক্তাই রাজাখালী ব্রিজ এলাকায় আন্ডারপাস তিনটি নির্মিত হবে। পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। প্রকল্পের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আকতার হোসেন লিমিটেড।

সাড়ে ৪ মিটার গভীরতার ৩.৬৫ মিটার প্রশস্ত আন্ডারপাস দু'টি দিয়ে উভয় প্রান্তের সার্ভিস রুটে যাতায়াতের সুযোগ থাকবে। ডেডিকেটেড ৪ লেন সড়ক দিয়ে বহদ্দারহাট থেকে সরাসরি শাহ আমানত সেতু এলাকা ছাড়া মাঝে অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। ফলে মাত্র ৫ মিনিটেই ৫ কিলোমিটার পথ পার হওয়া যাবে। আট কিলোমিটার এ সংযোগ সড়কটি সল্ফপ্রাসারিত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধিসহ মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে সাথে সংযোগ স্থাপন করবে। সড়কটি চট্টগ্রাসহ দেশের অন্য জেলার সাথে কক্সবাজারের যোগাযোগ আরও সহজ ও গতিশীল হবে। সড়কটি দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প নগরী স্থাপন ও উন্নয়নে সহায়ক হবে।