রাঙ্গুনিয়া ব্লাড ব্যাংক গ্রুপে ১০ হাজার সদস্য

ফেসবুকে রক্ত চেয়ে জীবন বাঁচান ওরা

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

মাসুদ নাসির, রাঙ্গুনিয়া

ফেসবুকে রক্ত চেয়ে জীবন বাঁচান ওরা

রাঙ্গুনিয়া ব্লাড ব্যাংকের সদস্যরা বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার জন্য রক্ত সংগ্রহ করছেন সমকাল

'রক্তদাতারা এগিয়ে আসুন। সমস্যা তলপেটে অপারেশন, রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ, পরিমাণ এক ব্যাগ, স্থান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।'

২ ফেব্রুয়ারি সময় ও মুঠোফোন নম্বর দিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে রক্তের সন্ধান চান শহীদুল ইসলাম নামে রাঙ্গুনিয়া ব্লাড ব্যাংকের অ্যাডমিন (প্রশাসক)। তার দেওয়া পোস্টের নিচে প্রচুর কমেন্ট আসে। অল্প সময়ের মধ্যে রক্তদাতাদের কাছ থেকে সাড়া আসে। জোগাড় হয়ে যায় রক্ত। এই গ্রুপের ১০ তরুণ অ্যাডমিন ফেসবুকে এভাবে পোস্ট দিয়ে সাধারণ মানুষদের নিয়মিত রক্তদানে সহায়তা করে আসছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে 'রাঙ্গুনিয়া ব্লাড ব্যাংক' নামে গ্রুপটি চালান। এই গ্রুপে ১০ হাজার সদস্য রয়েছেন।

রাঙ্গুনিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের বাইরেও অনেকেই রক্তের সন্ধান চান এই গ্রুপের মাধ্যমে। একই নামে সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় দুস্থদের শীতবস্ত্র, ঈদবস্ত্র, শিক্ষাসামগ্রী ও ক্যান্সার রোগীদের আর্থিক সহায়তা। সামাজিক কাজ করার পাশাপাশি এই সংগঠনের ৬৫ জন তরুণ সদস্য নিয়মিত রক্ত দেন। যারা সব সময় সক্রিয় থাকেন এ ফেসবুক গ্রুপে। এলাকার কোথাও কোনো অসুস্থ রোগীর জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন হলে ছুটে যান এ সংগঠনের সদস্যরা। রাঙ্গুনিয়াসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতি মাসে রোগীকে ১৫ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেন তারা। এভাবে গত কয়েক বছরে অন্তত ৮০০ ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন সংগঠনটির সদস্যরা। রক্ত পেয়েছেন গর্ভবতী মা, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগী, ব্লাড ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী, কিডনি ডায়ালিসিস, রক্তস্বল্পতা ও দুর্ঘটনার শিকার মানুষ।

অ্যাডমিন হাবিবুর রহমান বলেন, '২০১৫ সাল থেকে আমরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন রক্তদাতা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থেকে কাজ করে আসছি। রক্ত দিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে ইলিয়াছ হায়দার, শহীদুল ইসলাম, ফয়সাল আসিফ, দিলশাদ হৃদয়সহ কয়েক তরুণ প্রথমে সংগঠিত হন। ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর রাঙ্গুনিয়া ব্লাড ব্যাংক নামে স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়।'

তিনি আরও বলেন, সংগঠনটি এখন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপের মাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড চালায়। সারাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এই যোগাযোগের মাধ্যমে নিয়মিত রক্তদান করে যাচ্ছেন সদস্যরা। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিংয়ের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করেন তারা।

সংগঠনের পক্ষ থেকে গত ৩ বছরে ৬৫টি রক্তদান কর্মসূচি, বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং, থ্যালাসেমিয়া সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিলি করা হয়। আগামী মাস থেকে রাঙ্গুনিয়ায় স্কুল ও কলেজে রক্তদানে উৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক সভা করবেন তারা।

সংগঠনের অন্য অ্যাডমিন শহীদুল ইসলাম বলেন, 'মানুষ যখন রক্তের জন্য খুব বিপদে পড়ে যান, তখন আমরা এগিয়ে যাই জীবন বাঁচাতে। কারও জীবন বাঁচাতে পারলে, কারও মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমাদের চেষ্টা সার্থক বলে মনে হয়। শুধু রক্তদান নয় সংগঠনের সদস্যরা বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করেন।' রক্ত পেয়ে উপকৃত রাজানগর ইউনিয়নের রাজারহাট এলাকার আহমদ কবির (২৬) বলেন, 'থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর রক্ত জোগাড় করতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। এখন আর কষ্ট হয় না। দুই বছর ধরে সংগঠনের সদস্যরা প্রতিমাসে আমাকে রক্ত দিয়ে যাচ্ছেন। রক্তের দরকার পড়লে তাদের মুঠোফোনে জানাই। তখন হাসপাতালে গিয়ে রক্ত দিয়ে আসেন সংগঠনের সদস্যরা।'

থ্যালাসেমিয়া রোগী চন্দ্রঘোনার মো. রাজু, পারুয়ার আমেনা বেগম ও সরফভাটার আবুল কাশেমকে গত দু'বছর ধরে সংগঠনের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে রক্ত দিয়ে আসছেন।

উপজেলার মরিয়ম নগরের বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, তার স্ত্রীর অপারেশনের জন্য তিন ব্যাগ রক্ত দেন এই সংগঠনের সদস্যরা। তাদের রক্ত না হলে স্ত্রীর জীবন বাঁচানো কঠিন হতো বলে তিনি জানান।

ব্যবসায়ী মাহাবুবুল আলম সিকদার বলেন, 'সংগঠনের সবাই তরুণ। কারও রক্তের প্রয়োজন হলে আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলি। তারা অনেকেই মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন।'

রাঙ্গুনিয়া সরকারি কলেজের ড. অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, 'সমাজের অনেক তরুণ খারাপ কাজে অযথা সময় নষ্ট করেন, বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। রাঙ্গুনিয়া ব্লাড ব্যাংকের সদস্যরা মানুষের জীবন বাঁচান- এটা অনেক বড় কাজ।'