কর্ণফুলীতে উচ্ছেদ অভিযান

কঠিন হবে পতেঙ্গা মিশন

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সারোয়ার সুমন

কঠিন হবে পতেঙ্গা মিশন

নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা একটি ভবন ভেঙে ফেলা হচ্ছে। নগরীর মাঝিরঘাট আনুমাঝির ঘাট এলাকা থেকে তোলা ছবি - মো. রাশেদ

কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করতে গিয়ে উচ্ছেদকারী দলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে পতেঙ্গায়। জাহাজ তৈরি ও মেরামতের একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকায় নদীর এ পয়েন্টে মোকাবেলা করতে হতে পারে তাদের আইনি ঝামেলাও। ইনকনট্রেন্ড কনটেইনার ডিপো, আনোয়ারা অ্যাপারেলসসহ অর্ধশত প্রভাবশালীর অবৈধ স্থাপনা আছে পতেঙ্গায়। তাই জেলা প্রশাসনও তাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে সেভাবে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন বলেন, 'উচ্ছেদ অভিযানে বাধা এলে কখন কী করতে হবে সে ব্যাপারেও শীর্ষ পর্যায় থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে আমাদের। এবার কোনো অপশক্তি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।'

চট্টগ্রামের প্রাণখ্যাত কর্ণফুলীকে মিলেমিশে দখল করেছে রাঘববোয়ালরা। জেলা প্রশাসনের হিসাবে দুই হাজার ৩৭০ কোটি টাকা মূল্যের ১৫৮ একর ভূমিতে (প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা) থাকা অবৈধ এমন স্থাপনার সংখ্যা দুই হাজার ১৮১টি। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত সোমবার থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করছে জেলা প্রশাসন। গত ৫ দিনে সদরঘাট থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত তিন শতাধিক অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলেছে তারা। উদ্ধার করেছে ২০০ কোটি টাকা মূল্যের অন্তত ১৫ একর ভূমি।

উচ্ছেদ অভিযানে থাকা জেলা প্রশাসনের নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান মুক্ত বলেন, 'নদীর পাড়কে আমরা কয়েকটি পয়েন্টে ভাগ করেছি। প্রথম ধাপ হচ্ছে সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং মোড় পর্যন্ত। এই এলাকায় প্রায় ২০০ অবৈধ স্থাপনা আছে। সেগুলো উচ্ছেদ করতে পারলে ১০ একর ভূমি উদ্ধার হবে।' অভিযানে থাকা আরেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, 'প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষের পর ধাপে ধাপে আরও দুটি পয়েন্টে কাজ শুরু করব আমরা। সেগুলো হচ্ছে বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে পতেঙ্গা এবং সদরঘাট থেকে চাকতাই।'

জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ উচ্ছেদ অভিযানে সংযুক্ত করা হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিআইডব্লিউটিএকেও। উচ্ছেদ পরিচালনায় যুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের নিরাপত্তা নিশ্চিতে থাকছে চার শতাধিক আনসার, পুলিশ ও র‌্যাব। পাঁচটি এক্সক্যাভেটর, ১০টি ট্রাক ও চারটি বুলডোজার দিয়ে শতাধিক কর্মী নিয়ে একযোগে শুরু হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। এ জন্য অবৈধ স্থাপনাকে লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন।

এ প্রসঙ্গে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, 'স্বাধীনতার পর এই প্রথম সমন্বিতভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে কর্ণফুলীতে। এ নদী চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ। তাই যে কোনো মূল্যে এই নদীকে দখলমুক্ত করা হবে এবার। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের একটিও অক্ষত থাকা পর্যন্ত অভিযান চলবে। দখলদাররা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদের এবার শেষ রক্ষা হবে না।'

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরই চট্টগ্রামের প্রধান নদী কর্ণফুলীতে সমন্বিতভাবে উচ্ছেদের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হলো। অথচ চট্টগ্রামকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে মাস্টারপ্ল্যানের অগ্রাধিকার ছকেই ছিল কর্ণফুলী ও শাখা নদীগুলো দখলমুক্ত রাখার কথা। পাশাপাশি নগরীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে তিনটি নতুন খাল ও ৩০টি নতুন সেকেন্ডারি খাল খননেরও সুপারিশ ছিল মাস্টারপ্ল্যানে।

প্রথম দিনে দখলমুক্ত

হয় চার একর ভূমি

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, গত সোমবার সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাটে লাইটার জেটি এলাকায় অবস্থান নেয় উচ্ছেদকারী দল। বুলডোজার, পে-লোডার, অগ্নিনির্বাপক গাড়িসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম আগেই প্রস্তুত রাখা হয়। প্রথম দফায় লাইটারেজ জেটি এলাকায় 'সদরঘাট সাম্পান চালক সমবায় সমিতি' নামে একটি সংগঠনের অবৈধ কার্যালয় ও অবৈধভাবে গড়ে তোলা যাত্রী ছাউনি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি অবৈধ লোহার স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি কয়েকটি ছাপড়া ঘরও ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর অভিযান শুরু হয় পাশের কর্ণফুলী ঘাট এলাকায়। সেখানে নদীর পাড় দখল করে গড়ে তোলা কয়েকটি টিনের ছাপড়া ঘর ভেঙে দেওয়া হয়। এ সময় অনেককে নিজ উদ্যোগে আসবাবপত্র সরাতে দেখা যায়। দুপুর ১টার দিকে শুরু হয় আলোচিত শিল্পপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুর রশীদের মালিকানাধীন কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের অবৈধ স্থাপনা ভাঙার কার্যক্রম। উচ্ছেদ থেকে তিনতলা ভবনকে রক্ষা করতে তারা নিজ উদ্যোগে কিছু অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের তিনতলা ভবনের অবৈধ অংশও ভেঙে দেওয়া হয়।

নদীর তীর থেকে প্রায় ৮০ ফুট দূরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি তিনতলা ভবন। লোহার পাত দিয়ে এ ভবনের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে নতুন আরও কিছু স্থাপনা। উচ্ছেদের তোড়জোড় দেখে গ্যাস কাটার মেশিন দিয়ে আগেভাগেই লোহার পাতগুলো কেটে রেখেছিলেন কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের মালিক ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশিদ। তিন তলার মূল স্থাপনাকে রক্ষা করতে এ কৌশল নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। তিন তলার ভবনের যে অংশটি অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে তা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয় জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদকারী দল।

শুধু কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সই নয়; সোমবার উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম দিনেই ছোট-বড় এমন অর্ধশত স্থাপনা ভেঙে চার একর ভূমি উদ্ধার করেছে তারা।

দ্বিতীয় দিনে ৭০ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

চট্টগ্রামের লাইফ লাইন কর্ণফুলী নদী থেকে উচ্ছেদ অভিযানের দ্বিতীয় দিনে ৭০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর মাঝিরঘাট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদ অভিযানে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, কণর্ফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষ, বিআইডব্লিউটিএ ও র‌্যাব-পুলিশ-আনসার। উচ্ছেদ অভিযানের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে কর্ণফুলী নদীর মাঝিরঘাট এলাকা থেকে অভিযান শুরু করা হয়। অভিযানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৩০টি পাকা ঘর উচ্ছেদ করা হয়। এছাড়া অবৈধভাবে অবস্থান নেওয়া ৪০টি ঘর নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলেন বসবাসকারীরা। বিকেল ৫টা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়।

তৃতীয় দিনে অর্ধশত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

উচ্ছেদ অভিযানের তৃতীয় দিনে একটি দ্বিতল ভবনসহ অর্ধশত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। গত বুধবার সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর মাঝিরঘাট এলাকায় এ অভিযান পরিচালিত হয়। সহকারী কমিশনার তাহমিলুর রহমান সমকালকে জানান, উচ্ছেদ অভিযানের তৃতীয় দিনে বুধবার সকাল ৯টা থেকে কর্ণফুলী নদীর মাঝিরঘাট এলাকা থেকে অভিযান শুরু করা হয়। অভিযানে একটি দ্বিতল ভবনসহ অর্ধশত অবৈধ পাকা ঘর উচ্ছেদ করা হয়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়। সবার প্রচেষ্টায় অভিযান কার্যক্রম দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের সাথে সকল সংস্থা আন্তরিকতা দিয়ে অভিযান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অবৈধ দখলদার যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন কর্ণফুলীর তীর থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হবে।

চতুর্থ দিনে সাত একর জায়গা দখলমুক্ত

উচ্ছেদ অভিযানের চতুর্থ দিনে ৪০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। দখলমুক্ত করা হয়েছে প্রায় সাত একর জায়গা। গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর মাঝিরঘাট এলাকার আনু মাঝির ঘাট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা জানান, চতুর্থ দিনের মতো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবেলা করতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে অভিযান স্থানে।

এখনও পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। ঘটেনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় কেউ বাধা হলেই তার বিরুদ্ধে নেওয়া হবে আইনি ব্যবস্থা।