ক্যারিয়ার আড্ডা : অ্যাপারেল সেক্টর

সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার অভ্যাস করতে হবে

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

কাজী আরফাত

 সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার অভ্যাস করতে হবে

ক্যারিয়ার আড্ডায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা- সমকাল

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে একটা যুদ্ধে নামতে হয়। আর তা হলো চাকরি নামক 'সোনার হরিণ' পাওয়ার যুদ্ধ। কেউ তা শিক্ষাজীবন শেষ করার সাথে সাথেই পায়। আর কারও অপেক্ষা করতে হয় একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত।

অন্যদিকে, পরিসংখ্যান বলছে দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি চাকরিজীবী তাদের ক্যারিয়ারে সন্তুষ্ট না। তার মানে, শুধু চাকরি পেলেই হয় না। তার সঙ্গে প্রয়োজন টেকসই চাকরির নিশ্চয়তা, বেতনের প্রবৃদ্ধি, প্রোমোশন, পর্যাপ্ত ছুটি এবং সবচেয়ে বড় বিষয় পরিশ্রম অনুযায়ী প্রাপ্য সম্মান পাওয়া। এসব বিষয় একসঙ্গে একই সুতোয় গাঁথা থাকলে তবেই তো পাওয়া যায় ক্যারিয়ারের সফলতা।

ক্যারিয়ারের শুরুটা একেক জনের একেক রকম হয়ে থাকে। তবে বেসরকারি সেক্টরে সব চাকরির জন্য প্রস্তুতির ধরন প্রায় একই। এই বিষয় নিয়ে আড্ডা হয়েছে ১০ জন তরুণ পেশাজীবী বা ইয়াং প্রফেশনালসের সাথে। তারা আলাদা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু বর্তমানে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে একসঙ্গে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, এমএএস ইন্টিমেটস বাংলাদেশ লিমিটেডে। পুরো আড্ডাজুড়ে প্রাইভেট এবং মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ারের নানা দিক এবং পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন আসিফুল ইসলাম (ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি), প্রিয়াংকা সিং বৃষ্টি (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), ইশরাত জাহান (প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি), সোহানা সুলতানা (প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি), দিল আফরোজ জেরিন (চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়), ফারহান সাদিক (আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়), মিঠুন শীল (সাদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ) এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সুমাইয়া শারমিন, খাদিজা সুমাইয়া ও মুমতারিন ঐশী। ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সুমাইয়া শারমিন, খাদিজা সুমাইয়া ও মুমতারিন ঐশী।

শুরুতে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়- অ্যাপারেল সেক্টরে কেন আসা হলো? প্রিয়াংকার উত্তর, 'বর্তমান বাংলাদেশে অত্যন্ত দ্রুত বর্ধমান একটা সেক্টর হচ্ছে অ্যাপারেল সেক্টর, যাকে আমরা পোশাক শিল্প হিসেবেও জানি। এই সেক্টরে কাজের পরিধি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে দক্ষ জনবলের। তাই এই সেক্টরে দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব বলে মনে করি। প্রিয়াংকার সাথে একমত হয়ে ফারহান বললেন, যারা ক্যারিয়ারে দ্রুত উন্নতি দেখতে চান তাদের জন্য অ্যাপারেল সেক্টর হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। এ ছাড়া পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে দেশে এবং দেশের বাইরে নানা ধরনের ট্রেনিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে।'

করপোরেট ওয়ার্ল্ডে চাকরির অভিজ্ঞতা কেমন? এই বিষয়ে জানতে চাইলে খাদিজা খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে উঠলেন- দারুণ অভিজ্ঞতা!। এই উচ্ছ্বাসের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'করপোরেট ওয়ার্ল্ডে কাজ করতে হলে অনেক ডায়নামিক হতে হয়, প্রতিটা দিন নিজেকে আপডেটেড রাখতে হয়, এই ব্যাপারটা একজন মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।' খাদিজার কথার রেশ ধরে ইশরাত বললেন, করপোরেট জগৎটা অনেক চ্যালেঞ্জিং, যারা কাজের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন, তাদের অবশ্যই এই সেক্টরে আসা উচিত, না হলে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমরা যে পরিবেশ পাড় করে আসি, করপোরেট জগৎটা তার থেকে অনেকটক ভিন্ন। এখানে কাজে অলসতা করার কোনো সুযোগ নেই।

করপোরেট ওয়ার্ল্ড কেন চ্যালেঞ্জিং- এই বিষয়ে সোহানা বলেন, 'শুধু করপোরেট ওয়ার্ল্ড নয়, বর্তমানে যে কোনো বেসরকারি চাকরিই চ্যালেঞ্জিং। এখানে কাজের প্রেসার প্রতিনিয়ত বাড়ে, কমে না। আপনি একটা দায়িত্ব শেষ না হতেই, অন্য একটা দায়িত্ব এসে উপস্থিত থাকে। তাই যে কোনো পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অভ্যাস থাকতে হবে।'

তবে এই চ্যালেঞ্জিংয়ের বিষয়টাকে আসিফ একটু অন্যভাবে দেখেন। তার মতে, কাজের প্রেসার বা চ্যালেঞ্জটাকে ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে। প্রতিদিন যদি কাজের ধরন একই রকম হয়, তবে সে কাজ করতে ভালো লাগে না, একঘেয়েমি চলে আসে। তাই আপনি আপনার কাজকে কতটুকু দায়িত্ব মনে করছেন, সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সেই সাথে আপনাকে নির্দিষ্ট গোল বা লক্ষ্য সেট করতে হবে। নিজেকে একজন সিইও এর জায়গায় ভাবতে হবে। একজন প্রতিষ্ঠানের প্রধান কোন ধরনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেন সেটা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। মিঠুনেরও প্রায় একই অভিমত। তার মতে, কাজের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে, ভালোবাসা থাকলে সেটা ক্যারিয়ারের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে।

শুধুই কি কাজ? কাজের ফাঁকে ফাঁকে আর কি থাকে? এই প্রশ্ন ছুড়তেই ঐশী বলে উঠলেন, 'অবশ্যই শুধু কাজ নয়। করপোরেট ওয়ার্ল্ডে কর্মীদের উজ্জীবিত রাখার জন্য নানা ধরনের রিক্রেয়েশনের ব্যবস্থা থাকে। এগুলো সত্যি অনেক আনন্দের। আমরা প্রায় সময় অফিসে নানা ধরনের ইভেন্ট আয়োজন করে থাকি। বিভিন্ন ছুটির ফাঁকে পিকনিক, দেশের বাইরে ট্যুরে যাওয়া, খেলাধুলা বিশেষ করে ক্রিকেটসহ আরও অনেক কিছু। এ ছাড়া করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বা সিএসআরের অংশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠানের বাইরে অনেকগুলো ইভেন্ট হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের সবাই কোনো না কোনোভাবে এসব কাজের সাথে যুক্ত থাকে।' ঐশীর সাথে যোগ করে মিঠুন বললেন, 'প্রতিষ্ঠানে সবার সাথে মিলেমিশে থাকার অভ্যাস করতে হবে। এখানে আপনি একা একা নিজের মতো থাকবেন, তা হবে না। অনেক প্রোগ্রাম হয়, ইভেন্ট হয় এবং অফিসের সবাই মিলে দায়িত্ব ভাগ করে ইভেন্টগুলো সম্পন্ন করে। এতে কাজের প্রেসার ভুলে থাকা যায় এবং কাজ করার নতুন উদ্যোম আসে।'

এমএএস বাংলাদেশে চাকরির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে জেরিন বলেন, 'এখানে চাকরির অভিজ্ঞতা দারুণ। সবাই অনেক কো-অপারেটিভ। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সবাই নিজ কাজের প্রতি অনেক দায়িত্বশীল। তাছাড়া এখানে শেখার পরিবেশ অনেক ভালো, যা একজন তরুণ পেশাজীবীকে সামনে যেতে অনেক উজ্জীবিত করে।

এই পর্যায়ে সবার কাছে জানতে চাইলাম, একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট করপোরেট সেক্টরে বা প্রাইভেট সেক্টরে যেতে চাইলে তার করণীয় কি? কেউ বলার আগে সুমাইয়া কথা বললেন এই বিষয়ে। তার মতে, প্রথমে অনেক বেশি পরিশ্রম করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে এবং একটা রুটিন জীবন মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। এরপরই আসে একটা ভালোমানের সিভি। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করার পর আমরা প্রায় সবাই চাকরি খুঁজি, কিন্তু আমরা অনেকেই ভালো করে সিভিটা তৈরি করি না বা করতে জানি না। এইটা কিন্তু একটা ভাইটাল ফ্যাক্ট, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে। কারণ আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সিভি আপনার হয়ে কথা বলবে। তাই যেনতেনভাবে কম্পিউটারের দোকান থেকে কপি-পেস্ট মার্কা সিভি বানানো বন্ধ করতে হবে। ইন্টারনেট থেকে ভালো মানের কিছু সিভি দেখে, নিজে নিজে সেভাবে সিভি বানানোর চেষ্টা করলে ভালো রেজাল্ট পাওয়া যাবে।

তবে কিছু বিষয়ে প্রায় সবাই একই পরামর্শ দিলেন। তাদের মতে, সুন্দর ক্যারিয়ারের জন্য আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী হওয়ার বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি অবশ্য কিছু স্কিল তৈরি করতে হবে, ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য যেসবের কোনো বিকল্প নেই। আর তা হলো ইংরেজি বলা ও লেখার দক্ষতা, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটে পারদর্শিতা, ভালো কমিউনিকেশন স্কিল ও উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হতে হবে।