সম্পদের হিসাব নিতে প্রয়োজনে যুক্ত করা হবে দুদককে

সেই সম্পদই বাড়াচ্ছে বিপদ

কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করতে অনেকে যাচ্ছে সেফহোমে

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সারোয়ার সুমন ও আবদুর রহমান

 সেই সম্পদই বাড়াচ্ছে বিপদ

টেকনাফের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী শাহজাহান মিয়ার বিলাসবহুল বাড়ি - সমকাল

কক্সবাজারে 'সেফহোমে' থাকা তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অনেকে এরই মধ্যে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। এদের অনেকে হয়ে গেছেন কোটিপতি। কিনেছেন জায়গা। বানিয়েছেন রাজপ্রাসাদও। সেফহোমে থাকা তালিকাভুক্ত এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদেরই এমন রাজপ্রাসাদ আছে অন্তত ৬০টি। সেফহোমের বাইরে পলাতক থাকা মাদক ব্যবসায়ীদেরও আছে ৪০টি অট্টালিকা। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এমন শতাধিক বাড়ির তালিকা করে পাঠিয়েছে ঢাকায়। তালিকাভুক্ত এসব সম্পদ কি জব্দ করা হবে? সেফহোমে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে কি সম্পদের হিসাব নেওয়া হবে? যারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের সম্পদ কি বাজেয়াপ্ত করা হবে- এমন নানা প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে। মাদক ব্যবসাকে নির্মূল করতে যা যা করার দরকার তার সবই করবেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার। ইয়াবার টাকায় গড়ে ওঠা সম্পদও রেখেছেন তারা নজরদারিতে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাহায্য নেওয়ার কথাও ভাবছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, 'মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি আমরা। মাদকের টাকায় যারা অঢেল সম্পদ গড়েছেন তারা কেউই এখন স্বস্তিতে নেই। মাদক নির্মূল করতে যত দিক থেকে চাপ প্রয়োগের দরকার আইনের মধ্যে থেকে আমরা তার সবই করব।' তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হবে কি-না, যারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে কি-না- এসব বিষয় কিছুদিনের মধ্যে স্পষ্ট হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনেরও সাহায্য নিতে পারে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, 'ইয়াবার টাকায় কক্সবাজারে শতাধিক রাজপ্রাসাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি রাজপ্রাসাদের মালিক এখন সেফহোমে আছেন। সেফহোমের বাইরে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আরও অন্তত ৪০টি অট্টালিকা আছে।' এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য এখন ঢাকায় পাঠিয়েছেন বলেও জানান তিনি। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, 'মাদকের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবাই আমাদের নজরে আছে। মাদক পাচার করে কে কোথায় কী সম্পদ গড়েছে সেটির তথ্যও আছে আমাদের কাছে।' তিনি জানান, এবার এমন কিছু তারা করতে চান যাতে অন্যরা একটা দৃষ্টান্ত পান। মাদকের টাকায় বানানো সম্পদের শেষ রক্ষা হবে না- নতুন এ বার্তাও দিতে চান তারা সবাইকে। এ জন্য কিছুদিন আগে মাদকের টাকায় তৈরি হওয়া ৬০টি অট্টালিকায় অভিযানও চালানো হয়েছে বলে জানান তিনি। এ সময় কে বা কারা অন্তত ১৫টি বাড়িতে ভাংচুরও চালায়।

সেফহোমে আছেন ছয় জনপ্রতিনিধিও

সেফহোমে কত জন আছেন- তার সংখ্যা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার। তবে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির তিন ভাই আবদুল আমিন, মো. সফিক, মো. ফয়সাল সেফহোমে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। অন্যদের মধ্যে আরও আছেন- তার ভাগিনা সাহেদুর রহমান নিপু, বদির বেয়াই শাহেদ কামাল। টেকনাফ সদরের এনামুল হক মেম্বার, ছৈয়দ হোসেন মেম্বার, শাহ আলম, আবদুর রহমান, মোজাম্মেল হক, জোবাইর হোসেন, নূরুল বশর, কামরুল হাসান রাসেল, জিয়াউর রহমান, নুরুল কবির, মারুফ বিন খলিল প্রকাশ বাবু, মো. ইউনুছ, ছৈয়দ আহমদ, রেজাউল করিম, নুরুল হুদা মেম্বার, দিদার মিয়া, জামাল হোসেন মেম্বারসহ অর্ধশতাধিক তালিকাভুক্ত ব্যক্তি। এদের মধ্যে নুরুল বশর কাউন্সিলর। আর নুরুল হুদা, রেজাউল করিম, জামাল হোসেন, এনামুল হক, সাবেক ছৈয়দ হোসেন ইউপি সদস্য হিসেবে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন।

সম্পদ রক্ষা করতেই সেফহোমে অনেকে

'সেফহোফে' থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ একরাম। তিনি টেকনাফের মৌলভীপাড়ায় রাস্তার পূর্বে পাশে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি বানিয়েছেন। মৌলভীপাড়ায় সবার শীর্ষে তার অবস্থান। এলাকায় সবাই তাকে 'বাবা' নামে চেনেন। একরামের আরেক ভাই আবদুর রহমানও তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। তারা দু'জনই টেকনাফের মৌলভীপাড়ার হাজী ফজল আহমদের ছেলে। এলাকাবাসী বলছে, সম্পদ রক্ষা করতে সে 'সেফহোমে' গেছে স্বেচ্ছায়। এর আগে তিনি মিয়ানমারে অবস্থান করে ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছিলেন। ইয়াবা ব্যবসা করে সাত বছরে কোটিপতি হয়েছেন মোহাম্মদ একরাম। এ সময় তিনি নামে-বেনামে শহরে দুটি ভবন, জমি, ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারসহ বিপুল পরিমাণ জায়গা-জমি সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।