করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা

প্রস্তুত গাউসিয়া কমিটির সহস্র স্বেচ্ছাসেবক

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২০

সমকাল প্রতিবেদক

করোনার শুরু থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত সারাদেশে করোনা আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গে মারা যাওয়া ১ হাজার ৪৫০ জন ও চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৩৭ জনের দাফন ও সৎকার করেছে চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গাউছিয়া কমিটি। কয়েক হাজার রোগীকে অক্সিজেন ও অ্যাম্বুলেন্স সেবাও দিয়েছে সংগঠনটি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায়ও প্রস্তুত সংগঠনটির সহস্রাধিক স্বেচ্ছাসেবী।

'করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং আমাদের করণীয়' বিষয়ে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় পরিষদের এক মতবিনিময় সভা গত ১৬ নভেম্বর বহদ্দারহাট আরবি কনভেনশন হলে করোনাকালীন সেবাকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়।

গাউছিয়া কমিটি হলো চট্টগ্রাম আঞ্জুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের অধীন একটি ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন। চট্টগ্রামের বাইরে রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও, চানখাঁরপুল ও মোহাম্মদপুরে রয়েছে গাউছিয়া কমিটির শতাধিক সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল, তারাও ইতোমধ্যে কয়েকশ লাশ দাফন করেছে। সারাদেশে গাউছিয়া কমিটির মানবিক এই কার্যক্রম চলছে।

শুধু লাশের দাফন-কাফনেই সীমাবদ্ধ নেই গাউছিয়া কমিটির কর্মকাণ্ড। শ্বাসকষ্টে থাকা করোনা রোগীদের জন্য দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ, রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণও করছে গাউছিয়া কমিটি। ইতোমধ্যে সারাদেশে প্রায় এক লাখ অসহায় ও গরিব মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে এই সংগঠন। সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার বলেন, 'শীতের শুরুতে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির আলামত দেখছি আমরা। ইতোমধ্যে শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যাদের আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, জরুরি অক্সিজেন সেবা দিচ্ছি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় আমরা শতভাগ প্রস্তুত।'

রাত-দিন, রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে গাউছিয়া কমিটির সাড়ে তিন হাজার স্ব্বেচ্ছাসেবক ছুটছেন নগর-গ্রামে, দাফন ও সৎকার করছেন করোনায় আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গে মৃতদের লাশ। করোনায় মৃত বাবার লাশ যখন হাসপাতাল বা রাস্তায় রেখে চলে যাচ্ছিল সন্তান, লাশ বাড়ি নেওয়ার পর যখন কাছেও ঘেঁষেনি পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশী, তখনই সেখানে ছুটে গেছেন গাউছিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা। মৃতদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন ও সৎকার করছেন। রাত ২টায় চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় প্রবল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তার লাশ দাফন করেন চান্দগাঁও থানা শাখার স্বেচ্ছাসেবকরা। গতকাল শনিবারও ভাটিয়ারির সনাতন ধর্মাবলম্বী এক শ্বাসকষ্টের রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন স্বেচ্ছাসেবকরা।

গাউছিয়া কমিটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মোসাহেব উদ্দিন বখতিয়ার হলেন এই মানবিক উদ্যোগের স্বপ্নদ্রষ্টা। বখতিয়ার বলেন, 'এপ্রিলের শুরুতে করোনায় মৃতদের লাশ দাফনে পরিবার ও প্রতিবেশীদের অনীহার বিষয়টি সামনে আসার পর আমি আমাদের সংগঠনের কর্মীদের দিয়ে লাশ দাফনের পরিকল্পনা করি। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করে লাশ দাফনে সহযোগিতার কথা জানাই। সিভিল সার্জনের অনুমতি সাপেক্ষে আমরা দ্রুত সময়ে চট্টগ্রাম জেলায় ৭০০ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করি। অল্প সময়ে তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাশ দাফন ও সৎকারে দক্ষ করে তোলা হয়। ১৩ এপ্রিল করোনায় মৃত পটিয়ায় একজন শিশুর লাশ দাফনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আমাদের মানবসেবার এই মহাযজ্ঞ।'

বখতিয়ার বলেন, 'শুরুর দিকে কর্মীদের সাহস দিতে আমি আর আমাদের কমিটির চেয়ারম্যান পেয়ার মোহাম্মদ নিজেই জানাজার নামাজে ইমামতি করেছি, দাফন-কাফনে অংশ নিয়েছি। অনেক জায়গায় ইমামতি করার লোকও পাওয়া যায়নি। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরাই সবকিছু করেছেন।'

এতে মত প্রকাশ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ধাপ ইতোমধ্যেই শুরল্ফম্ন হয়ে গেছে। করোনা সংক্রমণ ও মুত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর ভীড় লক্ষ্য করার মত। এমতাবস্থায় গাউসিয়া কমিটির করোনাকালে চলমান সেবার অভিজ্ঞতা এবং করোনায় মৃতের গোসল কাফন-দাফন, শেষকৃত্য কাজে এবং মুমূর্ষু রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ, মৃত ও করোনারোগীদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবাসমূহ নিরবিচ্ছিন্নভাবে নিয়োজিত নির্ভীক স্বেচ্ছাসেবকদের সৎসাহসকে কাজে লাগিয়ে এই দুর্যোগে সব ধর্ম বর্ণের মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য কর্মপদ্ধতি আরো উন্নত করতে এবং আরো বেশি স্বেচ্ছসেবক ও কর্মীদের মাঠে নামাবার উপর গুরল্ফম্নত্ব আরোপ করা হয়। বিশেষত আক্রান্ত্মদের জন্য জরল্ফম্নরি অক্সিজেন সেবার সল্ফপ্রসারণ, অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা এবং মৃতের গোসল কাফন দাফন টিমের স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা আরো বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ এই সময়ে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং চিকিৎসা সহায়তার চলমান ধারায় আরো ব্যাপকতার পদক্ষেপ নেবার বিষয়টিও গুরল্ফম্নত্ব সহ আলোচিত হয়। সংগঠনের চেয়ারম্যান আলহাজ পেয়ার মোহাম্মদ কমিশনারের সভাপতিত্বে এবং করোনাকালের সেবা কর্মসূচির প্রধান সমন্বয়ক এডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ারের সঞ্চালনে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময়ে অংশ নেন সংগঠনের মহাসচিব শাহজাদ ইবনে দিদার, মাহবুব খাঁন, মাহবুব এলাহী সিকদার, এড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, অধ্যক্ষ আবু তালেব বেলাল, এরশাদ খতিবী, আলহাজ্ব আবদুলস্নাহ্‌, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সহ অন্যান্যরা।

সভায় এ পর্যন্ত্ম যাঁরা করোনাকালের সেবায় গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের পাশে ছিলেন তাঁদের শোকরিয়া আদায় করে বলা হয় খুব শীঘ্রই গাউসিয়া কমিটির এ সেবা কার্যক্রমে সহায়তাকারী শুভাকাঙ্ক্ষি ও স্বেচ্ছাসেবকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত্ম গৃহীত হয়। এসময় নেতৃবৃন্দ আগের মত গাউসিয়া কমিটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়।