সেতুটির নাম পেকুয়া-মহেশখালী মৈত্রী সেতু। ১৫ বছর আগে মহেশখালীর মাতারবাড়ীর সঙ্গে পেকুয়া-বাঁশখালী হয়ে চট্টগ্রাম শহরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে উজানটিয়া খালে ৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। একই সময়ে একই খালে প্রায় পাঁচ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পেকুয়ার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কারিয়ারদিয়া-উজানটিয়ার মধ্যে 'মহামিলন সেতু'রও নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ১২ কোটি ব্যয়ে নির্মিতব্য সেতু দুটির পিলার দৃশ্যমান হওয়ার পর ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বিল তুলে নিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয় চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আলোচিত ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিন ও তার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান চকোরী কনস্ট্রাকশন ও শামীম এন্টারপ্রাইজ। যথাযথ পাইলিং না করায় ২০০৭ সালের বর্ষায় স্রোতের টানে দুটি সেতুরই পিলার হেলে যায়। গত ১৫ বছর ধরে সেতু দুটির নির্মাণকাজ বন্ধ। বর্তমান স্থানীয় সংসদ সদস্য জরুরি ভিত্তিতে সেতু দুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠালেও কোনো কাজ হয়নি।

সংশ্নিষ্টরা জানান, সেতু দুটি নির্মাণের পাশাপাশি দুই পাশে সংযোগ সড়ক তৈরিরও পরিকল্পনা ছিল। এতে মহেশখালীর সঙ্গে পেকুয়া হয়ে চট্টগ্রাম শহরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হতো। এটা হলে চট্টগ্রাম শহর থেকে সরাসরি মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হতো। পাশাপাশি মহেশখালী ও পেকুয়ার দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় সড়ক যোগাযোগে ব্যাপক উন্নতি হতো। শুধু এই দুটি সেতু নয়, চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮টি সেতু ও সড়ক নির্মাণের কাজ পেয়েছিল আলোচিত ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিন ও তার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান চকোরী কনস্ট্রাকশন ও শামীম এন্টারপ্রাইজ। প্রতিটি প্রকল্পেরই এক চতুর্থাংশ কাজ সম্পন্ন করে প্রায় ১৭ কোটি টাকা বিল তুলে নেয় সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ঘনিষ্ঠ এই ঠিকাদার। ওয়ান ইলেভেনের পর প্রকল্পগুলো শেষ না করেই পালিয়ে যান আলোচিত এই ঠিকাদার। এরপর নতুন করে দরপত্রের মাধ্যমে ছয়টি সড়ক ও সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হলেও পেকুয়া-মহেশখালী মৈত্রী সেতু ও 'মহামিলন সেতু'র নির্মাণকাজ গত ১৫ বছরেও শুরু হয়নি।

এ ব্যাপারে পেকুয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহেদ বলেন, 'সেতু দুটি নির্মিত হলেও উপকূলীয় এলাকার যোগাযোগে বিপ্লব ঘটত। তবে শুধু সেতু তৈরি করলে চলবে না, দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণও জরুরি। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও অসমাপ্ত সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত সমাপ্ত করতে চিঠি দিয়েছি।'

জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অধীনে উজানটিয়া খালে পেকুয়া উপজেলার সঙ্গে উজানটিয়া হয়ে মহেশখালী মাতারবাড়ীর সংযোগ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৫ সালে। ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে পেকুয়া-মহেশখালী মৈত্রী সেতু নামে এ সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজ পায় ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিনের চকোরী কনস্ট্রাকশন। এ সেতুর দৈর্ঘ্য ২০৪ মিটার আর প্রস্থ ৪ দশমিক ২৬ মিটার। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ছয় কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০০৬ সালের ২৯ মার্চ। কাজ শেষ করার সময় ছিল ২০০৭ সালের জুনে সরকারি হিসাবে কাজের অগ্রগতি ৫৫% হলেও বাস্তবে ২০-২৫ ভাগের বেশি কাজ হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অথচ জোট সরকারের আমলেই গিয়াস উদ্দিন বিল তুলেছেন তিন কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

একই সময়ে একই খালে প্রায় পাঁচ কোটি ৪৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা ব্যয়ে কারিয়ারদিয়া-উজানটিয়া সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। 'মহামিলন সেতু' নামের সেতুর দৈর্ঘ্য ১৮০ মিটার, প্রস্থ ৪ দশমিক ২৬ মিটার। ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিন বিল তুলেছেন দুই কোটি ৪০ লাখ। দুটি সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেতু দুটির নির্মাণকাজ ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ করার কথা ছিল। অথচ পিলার স্থাপন ছাড়া আর কোনো কাজ হয়নি।

সরেজমিন দেখা গেছে, ২০০৭ সালের বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে দুই সেতুর পিলার হেলে পড়ে। স্থানীয় লোকজন জানান, ঠিকাদার নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে কাজ করেছেন। এতে কেউ প্রতিবাদ করারও সাহস পেত না।

২০০৮ সালে দায়িত্ব পালন করা পেকুয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাহ আলম এ ব্যাপারে বলেন, 'ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিনকে সেতু দুটির কাজ শেষ করতে বারবার তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছিল। তাকে অতিরিক্ত সময়ও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও কাজ শেষ না করায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।' পিলার হেলে পড়ার সত্যতা স্বীকার করে তিনি জানান, নতুন করে পিলারের কাজ করিয়ে নেওয়ার কথা বললেও গত এক যুগেও তা করা হয়নি।

মধ্যম উজানটিয়ার বসিন্দা এয়ার মোহাম্মদ জানান, সেতু দুটি নির্মিত হলে পেকুয়া ও মহেশখালীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হতো উপকূলীয় এলাকা উজানটিয়ার। এখানকার উদপাদিত লবণ ও মাছ বাজারজাত করা সহজ হতো।

সুতাচোরা গ্রামের ছকিনা খাতুন, মধ্যম উজানটিয়ার নূর মোহাম্মদ জানান, বর্তমানে কারিয়ারদিয়া-উজানটিয়া সেতুর একটি পিলার পানিতে ডুবে গেছে। সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এই সেতুর নাম দিয়েছিলেন 'মহামিলন সেতু'। এই সেতু এখন আমাদের জন্য মহা দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে নৌকায় পারাপার অনেক ভালো ছিল।'

সাবেক ইউপি সদস্য তোফাজ্জল হোসেন জানান, এই দুই সেতুর নির্মাণ উপকরণ দিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতারা বাড়িঘর তৈরি করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন উপকূলীয় এলাকার লোকজনের সঙ্গে সেতুর নামে কেন এই প্রতারণা করা হলো?

গিয়াস উদ্দিনের বাটপারির ঠিকাদারি :জানা যায়, জোট সরকারের আমলে নেওয়া আট সড়ক ও সেতু প্রকল্পের পাঁচটি প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নিজ উপজেলা পেকুয়ায় ও দুটি পড়েছে চকরিয়ায়। জোট সরকারের শেষের দিকে ২০০৪-০৫ ও ২০০৬ অর্থবছরে এসব সেতু ও সড়কের (আট প্রকল্প) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসব প্রকল্পের বেশিরভাগ কাজ অসমাপ্ত থাকলেও বড় অঙ্কের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন এসব সড়ক ও সেতু এলাকাবাসীর জন্য সীমাহীন দুর্ভোগের কারণ ছিল।

পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া সড়ক প্রকল্পের মেকাডমের কাজ করে চার কোটি ৬০ লাখ টাকা বিল তুলে নেয় গিয়াস উদ্দিনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তিন কোটি ১৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকার ইলিশিয়া সেতুর প্রকল্প থেকে এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তিন কোটি ৬৯ লাখ চার হাজার টাকার কাটা ফাঁড়ি সেতু প্রকল্প থেকে দুই কাটি ৬৫ লাখ টাকা, দুই কোটি ৪২ লাখ ৯৭ হাজার টাকার ছিকলঘাটা-মানিকপুর সড়ক প্রকল্প থেকে ৩৩ লাখ টাকা, ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার চড়াপাড়া-বারবাকিয়া-টৈটং সড়ক প্রকল্প থেকে এক কোটি ৪৬ লাখ টাকা, দুকোটি ২৫ লাখ টাকার পেকুয়াবাজার-মৌলভীবাজার সড়ক প্রকল্প থেকে ৩১ লাখ টাকা বিল তুলে নিয়েছে গিয়াস উদ্দিনের প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে রাতারাতি বড় ঠিকাদার বনে যান গিয়াস উদ্দিন। এসময় শুধু চকরিয়া-পেকুয়াতেই কয়েক শত কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ ভাগিয়ে নেন। প্রতিমন্ত্রীর আর্শীবাদে জোট সরকারের আমলে গোপন দরপত্রের মাধ্যমে বেশিরভাগ উন্নয়নকাজ গিয়াস উদ্দিন ও তার ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠান পেতো।

জানা যায়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ২০০৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হওয়ার পর যৌথবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে এই আলোচিত ঠিকাদারের সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছিলেন।

এ ব্যাপারে ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিন তখন বলেন, জোট সরকারের আমলে চকরিয়া ও পেকুয়ায় ৩৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। এর মধ্যে তিনি মাত্র ১০-১২ কোটি টাকার কাজ পেয়েছিলেন। অথচ চকরিয়া-পেকুয়ার আট প্রকল্প থেকেই ১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার (গিয়াস উদ্দিনের হিসেব মতে) বিল তুলে নিয়েছেন বলে স্বীকার করেন। অবশ্য গোটা জেলায় ৩০-৩৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

চকরিয়া ও পেকুয়ার সড়ক ও জনপথ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঠিকাদার গিয়াসউদ্দিন আহমদ ও তার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানকে একদিকে অসমাপ্ত সেতু ও সড়কের কাজ শেষ করার জন্য গত দুই বছরে দফায় দফায় চিঠি দিয়ে তাগাদা দিয়েছে। অন্যদিকে চকরিয়া এলজিইডি গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের অসমাপ্ত একটি সেতুর কার্যাদেশ বাতিল করে আবার ওই প্রতিষ্ঠানকেই কাজ দিয়েছিল।

আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক :পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের অধীনে এ সড়কের আট কিলোমিটার অংশের (চকরিয়া-বদরখালী সড়কের ঈদমনি অংশ থেকে পেকুয়ার মেহেরনামা পর্যন্ত) কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে। ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিনের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। কাজ শেষ করার সময় ছিল ১৫ নভেম্বর ২০০৬। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে আত্মগোপনে যাওয়ার আগে গিয়াস উদ্দিন সড়কের মেকাডমের ৮০ ভাগ কাজ শেষ করেছিলেন। কার্পেটিং করেননি এক শতাংশও। অথচ জোট সরকারের শেষ দিকে তিনি বিল তুলেছেন চার কোটি ৬০ লাখ টাকা।

দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পেকুয়া বাজার-মৌলভী বাজার সড়ক, দুই কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চড়াপাড়া-বারবাকিয় টৈটং সড়ক ও দুই কোটি ৪২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয়ে চকরিয়ার ছিকনঘাটা মানিকপুর সুরাজপুর সড়কের কাজও অসমাপ্ত অবস্থায় তিন বছর ধরে ফেলে রেখেছিল গিয়াস উদ্দিন ও তার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান। পরে নতুন কার্যাদেশ দিয়ে নির্মাণকাজ শেষ করে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

মন্তব্য করুন